চান্স পেতে চাইলে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে


Published: 2018-06-07 13:42:06 BdST, Updated: 2018-11-18 00:22:58 BdST

মুহিত আহমেদ জামিল : উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরবর্তী কয়েকমাসকে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট বলা যায়। জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এই কয়েকমাস খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। খোলামেলা আর বড়সড় ক্যাম্পাস, গবেষণার সুযোগ, প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম, পড়াশোনার উন্নতমান, কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ ইত্যাদি কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে যথেষ্ট এগিয়ে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করা প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীর কাছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেন একেকটা স্বপ্নের নাম।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান না এমন শিক্ষার্থীর খোঁজ পাওয়া কঠিন। কিন্তু কয়েক লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীদের বিপরীতে সীমিত সংখ্যক আসনের কারণে চাইলেই সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে শিক্ষার্থীদের কঠিন এক ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। ভর্তি পরীক্ষা না বলে সেই পরীক্ষাটাকে ভর্তি যুদ্ধ বলাই অধিক শ্রেয়। লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়তে পারার সুযোগ অর্জন করাটাকে যুদ্ধ বললে মোটেই অত্যুক্তি হয় না। সামান্য একটু ভুলের জন্য এই যুদ্ধের ময়দান থেকে খালি হাতে ফেরাটা যেমন অস্বাভাবিক কিছু না। ঠিক তেমনি ভালো প্রস্তুতি আর ইউনিক কিছু টেকনিক অবলম্বন করে জয় ছিনিয়ে আনাটাও অসম্ভব কিছু নয়। ভর্তি যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে চাইলে একজন শিক্ষার্থীকে ঠিক কি কি উপায় অবলম্বন করতে হবে, সেইসব নিয়েই আমার এই পরামর্শমূলক লেখাটা।

১. লক্ষ্য ঠিক করতে হবে সবার আগে :
লক্ষ্য ঠিক করার ক্ষেত্রে নিজের পছন্দ, প্যাশন এবং ভালোলাগাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পছন্দের বিষয় ঠিক করার পর দেখতে হবে, কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই বিষয়টা পড়ার সুযোগ রয়েছে। পছন্দের বিষয় কিন্তু একটা না হয়ে বেশ কয়েকটাও হতে পারে। আমার মনে হয়, এটাই হওয়া উচিত। কারণ কয়েকটা বিকল্প হাতে থাকলে সফল হওয়ার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা খুব বেশি প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি পছন্দের বিষয়ে চান্স পেতে ব্যর্থ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। তাই হাতে কয়েকটা বিকল্প রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু এক্ষেত্রে আরেকটা বিষয়ও অবশ্য মনে রাখতে হবে, হাতে বেশি বিকল্প রাখতে গিয়ে যেন আবার ফোকাস হারানোর সমস্যাটা না হয়।

লক্ষ্য ঠিক করার ক্ষেত্রে অনেকের কাছে আবার নির্দিষ্ট একটা বিষয়ে পড়ার সুযোগের চেয়ে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব সেটাই মূখ্য বলে বিবেচিত হয়। লক্ষ্য যেভাবেই ঠিক করা হোক না কেন সবচেয়ে বড় কথাটা হলো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করতে হবে সবার আগে।

২. তৈরি করতে হবে সুন্দর একটা পরিকল্পনা :
শুধু লক্ষ্য ঠিক করলেইতো আর হবে না। সেই লক্ষ্যের ঠিকঠাক বাস্তবায়নের জন্য সুন্দর একটা পরিকল্পনাও তৈরি করতে হবে। কিভাবে পড়াশোনা হবে, কিভাবে প্রস্তুতি শেষ হবে, কোন কোন বিষয় পড়তে হবে, কোন কোন টপিকস পড়তে হবে, সবকিছু কিভাবে ম্যানেজ করা হবে ইত্যাদি বিষয়ের পরিকল্পনা। কথায় আছে না, "A goal without a plan is just a wish." সুতরাং বুঝতেই পারছো সুন্দর একটা পরিকল্পনা তৈরি করাটা কত জরুরি। এখন, সুন্দর একটা পরিকল্পনা তৈরি করার অন্যতম পূর্বশর্ত হল এই কয়েকমাস সময়ের জন্য সুন্দর একটা রুটিন তৈরি করে ফেলা। কখন কোন সাবজেক্ট পড়া হবে, কতক্ষণ পড়া হবে, বিরতি কতক্ষণের থাকবে, কোচিং ম্যানেজ হবে কিভাবে ইত্যাদি সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ঝটপট সুন্দর করে একটা রুটিন তৈরি করে ফেলো। রুটিনটা পারলে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখো অথবা হাতের নাগালে রাখো। এবার সেটা ধারাবাহিকভাবে ফলো করে যাও।

৩. জানতে হবে প্রশ্ন পদ্ধতি, মানবন্টন, এবং অন্যান্য ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ক তথ্যসমূহ :
সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কাঠামো সমান নয়। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ের একেক সিলেবাস। অতএব, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কি সিলেবাস, মানবন্টন কেমন, পরীক্ষার সময় কতটুকু, ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন রুলস এন্ড রেগুলেশন কিরকম ইত্যাদি বিষয়ের আদ্যোপান্ত জানতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট, গতবছরের সার্কুলার, গুগল, ফেসবুকের এডমিশন টেস্ট রিলেটেড বিভিন্ন পেজ এবং গ্রুপের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

৪. বিগত বছরের প্রশ্ন সম্বন্ধে ধারণা :
বিগত বছরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন সম্বন্ধে ভালো ধারণা থাকতে হবে। নিয়ম করে আগের বছরের প্রশ্নগুলো শুরু থেকে সলভ করলে একদিকে যেমন ভর্তি পরীক্ষায় কি ধরণের প্রশ্ন আসে, কোন টপিকস থেকে বেশি প্রশ্ন আসে সেটা জানা সম্ভব হয়, অন্যদিকে ঠিক তেমনি পরীক্ষার প্রস্তুতিটাও আরো ঝালাই হয়, প্রস্তুতির ফাঁক ফোকরগুলোও ধরা পড়ে। প্রশ্নব্যাংক কিনে বা অন্যকোন উপায়ে বিগত বছরগুলোর প্রশ্ন সংগ্রহ করতে পারো।

৫. পড়তে হবে সর্বোচ্চ মনযোগী হয়ে :
অমনোযোগী হয়ে পুরো সাতখন্ড রামায়ণ পড়ে যদি, সীতা কার বাপ? এমন প্রশ্ন করা লাগে তাহলে নিশ্চয়ই সেই পড়ার কোন মানে হয় না। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দিনরাত এক করে পড়া লাগবে এমন কথা নেই। যাই পড় না কেন, সর্বোচ্চ মনযোগী হয়ে পড়। যাতে পরীক্ষায় পড়ে যাওয়া টপিক রিলেটেড কোন প্রশ্ন আসলে সঠিক উত্তরটা দিয়ে আসতে পারো।

৬. নিজের মত করে পড় :
একেবারেই নিজের মত করে পড়। কোচিং সেন্টারের মেথড ফলো না করলে চান্স হবে না, অমুক তমুকের বলে দেওয়া মেথড কপি মারতে হবে এরকম কোন কথা নেই। কখন কি পড়বা, কিভাবে পড়বা, কতটুকু সময় ধরে পড়বা- এইসব তোমার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। এখানে নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখে একদম ভালো লাগার মত করে পড়াশোনা করতে হবে। তোমার কি ভুলত্রুটি আছে, কিভাবে সেটা সংশোধন করা যাবে, তুমি নিজেই সেটা সবচেয়ে ভালো জানো এবং তুমি নিজেই সেটা সবচেয়ে ভালোভাবে খুঁজে বের করতে পারবে।

৭. কোয়ালিটিকেই গুরুত্ব দাও বেশি :
কোয়ানটিটি নয় ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে কোয়ালিটিটাই শেষ পর্যন্ত ম্যাটার করে। ছাড়া ছাড়া ভাবে সব পড়ার চেয়ে ঠিকঠাক ভাবে সামান্য পড়াটাও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, বেশি পড়ার চেয়ে ভালোভাবে পড়ছো কিনা সেটার ব্যাপারে লক্ষ রাখো।

৮. মেইন বইয়ের কোন বিকল্প নাই :
ভর্তি পরীক্ষায় মেইন বইয়ের যেকোনো জায়গা থেকে প্রশ্ন আসতে পারে। এখানে সাজেশন ফলো করাটা নেহাত বোকামি। যেকেনো ভার্সিটিতেই চান্স পেতে হলে মেইন বই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ার কোনো বিকল্প নেই। অতএব, সবার আগে মেইন বই। তারপর অন্যকিছু।

৯. সাহায্য নিতে পারো ইন্টারনেটের :
শুধুমাত্র ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য জানতেই নয়, পাঠ্যবইয়ের যেকোনো টপিক ভালোভাবে জানতেও ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। বইয়ে অনেক সময় যেকোনো টপিক সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া থাকে। এক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে ডিটেইলস পড়ে নেওয়া যায়। বই পড়ার একগুঁয়েমি কাটাতেও ইন্টারনেটে সিলেবাস রিলেটেড বিভিন্ন আর্টিকেল পড়া যেতে পারে কিংবা টিউটোরিয়াল ভিডিও দেখা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সাবধান! ইন্টারনেট যেন বাড়তি সময় অপচয় করার মাধ্যম না হয়ে ওঠে।

১০. আত্মবিশ্বাসী হওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি :
পরীক্ষার্থী সংখ্যা বেশি, প্রস্তুতি কঠিন মনে হওয়া, দুয়েক জায়গায় ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি কারণে আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না। নিজের উপর, নিজের প্রস্তুতির উপর আস্তা রাখতে হবে। "শেষবেলায় চান্স আমার হবেই হবে" এরকম একটা মনোভাব থাকতে হবে।

১১. ব্যর্থতা মানেই শেষ না :
ভর্তি পরীক্ষাটা খুব বেশি প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার কারণে দুয়েক জায়গায় ব্যর্থ হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু না। দুয়েক জায়গায় ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক কিছু। হয়তো দেখা যেতে পারে ভালো রেজাল্ট, ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও নিজের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়নি। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়নি তো কি হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়তো আরো আছে সেগুলোতে ট্রাই করে যেতে হবে শেষ অবধি। প্রস্তুতি ঠিকঠাক হলে একটা না একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হবেই হবে। মোটকথা শেষ দেখার পূর্বে হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না কোনভাবেই।

১২. সুস্থ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি :
দেখা গেল এই কয়েকমাস অমানুষিক পরিশ্রম করতে করতে পরীক্ষার ঠিক আগে আগেই অসুস্থ হয়ে পড়লে। এর মানে কী দাঁড়াল? তোমার এই কয়েকমাসের সব প্রস্তুতি বৃথা গেল। তাছাড়া সামনের কয়েকটা মাস খুবই চ্যালেঞ্জের। এই সময়ে অসুস্থ হয়ে দুয়েকটা দিন নষ্ট হওয়া মানে অনেক ক্ষতি হয়ে যাওয়া কিন্তু। অতএব, সুস্থ থাকার ব্যাপারে বি কেয়ারফুল। এরজন্য প্রত্যেকদিন ব্যায়াম, মেডিটেশন করা যেতে পারে। ঘুম, খাওয়া দাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ইত্যাদি ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা এই ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে।

১৩. প্রাকটিস, প্রাকটিস এবং প্রাকটিস :
কথায় আছে না, "Practice makes a man perfect" কোন জিনিস মাত্র একবার পড়ে গেলেই হবে না। বারবার রিভিশন দিয়ে একেবারে ঝালাই করে নিতে হবে। ভর্তি পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো বেশ কনিফিউজিং টাইপের হয়। মনে হবে সবগুলো অপশনই সঠিক। এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে বেশি বেশি অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই।

১৪. বেশি বেশি করে মডেল টেস্ট দাও :
পরীক্ষার হলের মাত্র এক ঘন্টা সময়ই কিন্তু তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এতদিন কত ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে কিংবা তুমি খুব ভালো ছাত্র কিনা এসব কোন বিষয় না। শেষমেশ পরীক্ষার হলে তোমার পারফর্মেন্স কেমন হল সেটাই বড় কথা। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষার হলের অতিরিক্ত স্নায়ুবিক চাপ সামলাতে না পেরে হার মানে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে বাসায় বসে সময় ধরে বেশি বেশি করে মডেল টেস্ট পরীক্ষা দাও। একদম পরীক্ষার হলের পরিবেশ ঘরে তৈরি করে মডেল টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে যাও একের পর এক। এটা যে কি পরিমাণ উপকারি পরীক্ষার হলে গেলেই সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাবে।

লেখক : মুহিত আহমেদ জামিল
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ০৭ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।