'রাবির ইন্টারন্যাশনাল ডরমিটরি' নামে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট!


Published: 2021-10-25 17:54:00 BdST, Updated: 2021-12-02 21:21:58 BdST

উমর ফারুক, রাবি থেকে: বাংলা সিনেমায় জনপ্রিয় এক সংলাপ রয়েছে 'উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট ' ঠিক এমন চিত্রই দেখা মিলেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র আন্তর্জাতিক ডরমিটরিতে।

২০১০ সালে শুধুমাত্র ডরমিটরি নাম দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীতে ২০১১ সালে এটিকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এবং সর্বশেষ ২০১৩ সালে শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম ইন্টারন্যাশনাল ডরমিটরি নামে উন্নিত করা হয়।

জানা গেছে, বর্তমানে ডরমিটরিতে অবস্থান করেন বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬৬জন বিদেশী শিক্ষার্থী এবং ৩২ জন এমফিল ও পিএইচডি গবেষক। তবে ডরমিটরির নামের পাশে আন্তর্জাতিক লেখা থাকলেও নেই কোন আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা।

সরেজমিনে ডরমিটরিতে গিয়ে যে চিত্রের দেখা মিলে তা খুবই হতাশাজনক। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে রুমের দেয়ালগুলোর দিকে তাকালেই মনে হবে পুরোনো কোন ভবন। অনেক জায়গায় শ্যাওলা জমে গেছে ও চুন-শুরকি খসে- খসে পড়ছে। দেয়ালের রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বারান্দাগুলোতে ঝুলছে মাকড়সার জাল। ভবনের ভেতরে ফুলের বাগান থাকলেও সেখানেও দেখা মিলল ময়লার স্তুপ যেখান থেকে দূর্গন্ধ ছড়াছে এবং মশার বিস্তার ঘটছে। যা থেকে রোগ ব্যাধী ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।

ময়লার স্তুপ

 

ডরমিটরিটিতে ডাইনিংয়ে কাজ করে মাত্র ৩জন কর্মচারী, অফিসে ২ জন কর্মকর্তা, ১জন পিওন, গেস্ট রুমে নেই কোন গার্ড, ১জন সুইপার, ২জন রুমবয় রয়েছে। যাদের আবার অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টাররোলের অন্তর্ভুক্ত নয়।

এখানে গবেষকরা থাকলেও নেই কোন গবেষণা কাজের সহায়ক কোন সুযোগ-সুবিধা। নেই গ্রন্থাগার কিংবা সেমিনার লাইব্রেরি। তাছাড়া আবাসিক হলগুলোতে সেমিনার লাইব্রেরি, পত্রিকা পড়ার কক্ষ, বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা থাকলেও এসব সুবিধার কোনটাই দেখা মেলেনি এই ডরমিটরিতে। কক্ষগুলোতে নেই কোন আলমারী। কয়েকটি কক্ষে ভালো মানের খাট ও টেবিল থাকলেও অধিকাংশ কক্ষেই তা দেখা মেলেনি। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাসহ খেলাধুলার জন্য কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

যেখানে সেখানে পড়ে রয়েছে বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা

 

তাছাড়া ডাইনিংয়ে খাবারের মানের তুলনায় বেশী অর্থ নেয়া হচ্ছে বলে এমন অভিযোগ তুলে ধরে ডরমিটরিতে অবস্থান করা বিদেশী শিক্ষার্থী ও গবেষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

রাবিতে পড়তে আসা নেপালী শিক্ষার্থী নবীণ দাশ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, 'ডরমিটরিতে 'বিশুদ্ধ পানি,স্যানিটেশনের ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের সমস্যা হচ্ছে। এখানে কর্মচারীর অভাব রয়েছে। আমাদের রুমের বেডগুলো নিন্মমানের একটু উন্নত মানের বেড ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। তাছাড়া ভবনে কোন ইন্টারনেট সংযোগ নেই, সেইসাথে খাবারের মান খুব নিম্নমানের। এখানে পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়ার কক্ষ, সেমিনার লাইব্রেরিসহ খেলাধুলা করার ব্যবস্থা নেই এগুলো আমাদের খুব প্রয়োজন।'

গত ১৫ দিন ধরে ডরমিটরিতে অবস্থান করে নানা সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছেন এমফিল গবেষক আবদুল মজিদ অন্তর। তিনি অভিযোগ করে ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন,' আন্তর্জাতিক ডরমিটরিতে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা তার ছিটেফোঁটাও এখানে নেই। আবাসিক হলগুলোতে যে ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় সেগুলোও এখানে আমরা পাচ্ছি না। দীর্ঘ দিন ধরে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা চলে আসছে কেও কোন খোঁজ খবরও নেয়নি। যেহেতু আমি ডরমিটরিতে আসার পর এসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি তাই এগুলো সমাধানের জন্য প্রশাসনকে এসব অভিযোগ লিখিতভাবে জানিয়েছি। তারা যেন বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সমস্যা সমাধান করে এবং পুরো ডরমিটরিকে সংস্কার করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত করে।'

দেয়ালের রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে

 

নেপাল থেকে আসা রাবিতে অধ্যয়নরত আরেক শিক্ষার্থী সানি কুমার ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, আমাদের ডরমিটরিতে অনেক ধরনের সমস্যা রয়েছে। এগুলো যদি প্রশাসন থেকে দ্রুত সমাধান করে আমাদের জন্য অনেক ভালো হয়।'

সমস্যাগুলো তুলে ধরে সমাধানের জন্য আজ সকাল ১০টায় দায়িত্বপ্রাপ্ত অয়ার্ডেনের কাছে লিখিতভাবে দাবি জানিয়েছেন দেশী-বিদেশী শিক্ষার্থী ও গবেষকরা।

তাদের দাবিগুলো মধ্যে রয়েছে, ডরমিটরিতে উন্নতমানের লাইব্রেরি ও কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা, রুমে উন্নত মানের খাট টেবিল ও আলমারির ব্যবস্থা করা, আবাসিক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের গেস্টদের জন্য গেস্টরুম ভাড়া ৫০শতাংশ ছাড় দেয়া, রুমে ফ্যান লাইট,পানির ট্যাপ নষ্ট হলে ডরমিটরির উদ্যোগে মেরামত করা। সম্পূর্ণ ডরমিটরিকে সংস্কার করে আন্তর্জাতিক মানের উন্নিত করা।

এ বিষয়গুলো নিয়ে অয়ার্ডেন প্রফেসর ড. আশাদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, 'আমি দায়িত্বগ্রহনের পর থেকে যেসকল সমস্যা গুলো রয়েছে তা সমাধানের জন্য বিগত প্রশাসনের কাছে অবহিত করেছিলাম। সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর মেয়াদী মাস্টার প্লানেও অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কিন্তু ভিসির মেয়াদের শেষ দিকে এসে কোন কাজই হয়নি।

শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম ইন্টারন্যাশনাল ডরমিটরি

 

ইতিমধ্যে আমি নিজ উদ্যোগে সিকিউরিটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছি, কমন রুম করেছি। গেস্ট রুমে উন্নত মানের খাটের ব্যবস্থা করেছি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থার জন্য সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করেছি। এরমাঝে অনেক লিমিটেশন রয়েছে তবুও চেষ্টা করেছি কাজ করার।'

এসব অভিযোগের সমাধান পাননি বলে উল্টো প্রশাসনকে দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, 'ডরমিটরিতে সব থেকে বড় সমস্যা হলো লোকবলের অভাব। কয়েকজন লোক নিয়ে এখানে কাজ করছি। বিগত প্রশাসনের কাছে বারবার বলেও কোন কাজ হয়নি। আমাদের এখানে এ সমস্যা গুলো রয়েছে এটা অস্বীকার করবো না বা আন্তর্জাতিক নাম হলেও তেমন সুযোগ সুবিধা আমরা দিতে পারছিনা। আমার অনেক প্লান ছিলো তবে এসব করতে এর জন্য পরিকল্পনা ও বাজেট দরকার।'

দেয়ালগুলোর অনেক জায়গায় শ্যাওলা জমে গেছে ও চুন-শুরকি খসে- খসে পড়ছে

 

হলে নানা সংস্কারের কাজ চলমান থাকলেও ডরমিটরিতে কেন হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়ার্ডেন বলেন,' দেখুন আমি প্রাধ্যক্ষ পরিষদের অন্তর্ভুক্ত নই। সেখানে যে- যে সিদ্ধান্ত হয় তা শুধু আমাকে জানানো হয়। আমার দায়িত্ব হলো কি- কি ডরমিটরিতে প্রয়োজন তা প্রশাসনের কাছে অবহিত করা সেটা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের মত করে বাজেট দেবে। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার পর আমি ভিসির সাথে সৌজন্যে সাক্ষাত করলেও এগুলো বিষয় নিয়ে বলতে পারিনি। কয়েকদিন মাঝে প্রশাসনের সাথে এ সমস্যা গুলো নিয়ে কথা বলব।'

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি প্রফেসর সুলতান উল ইসলাম ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, 'আমি এ সমস্যা গুলো বিষয়ে কথা বলবো। এগুলো নোট করে রাখছি। এগুলো নিয়ে ওয়ার্ডেনের সাথে কথা বলে দেখতেছি। কিভাবে দ্রুত সময়ের মাঝে এ সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায় সে চেষ্টা আমরা করব।'

ঢাকা, ২৫ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//ওএফ//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।