করোনাকালে ঢাবির ৮ শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ, যেন আত্মহত্যার মিছিল!


Published: 2020-10-28 22:59:15 BdST, Updated: 2020-12-03 19:59:15 BdST

লাইভ প্রতিবেদক : করোনাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। প্রেম নিয়ে জটিলতা, বেকারত্ব, নি:সঙ্গতা, মানসিক চাপসহ নানা কারণে আত্মহত্যা করছেন শিক্ষার্থীরা। করোনাকালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। সর্বশেষ ২৬ অক্টোবর বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় আত্মহত্যা করেছেন ফারিহা তাবাসসুম রুম্পা নামে চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। আর সমাজে ধর্ষণ, আত্মহত্যার ন্যায় নানান অপরাধ বাড়ছে। তাদের মতে, লকডাউনে অধিকাংশ সময় বাড়িতে বসে সময় কাটালে এরকম সংকটের মধ্যে দিয়ে আমাদের যেতে হয়। এসব রোধে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় আত্মহত্যা করেন রুম্পা : পছন্দের ছেলেকে বাদ দিয়ে অন্যের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নেয়ায় সোমবার (২৬ অক্টোবর) আত্মহত্যা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ফারিহা তাবাসসুম রুম্পা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে পড়ুয়া রুম্পার গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানাধীন দীঘায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলের আবাসিক ছাত্রী তিনি।

রুম্পার একাধিক সহপাঠী জানান, ব্যক্তিগতভাবে রুম্পা একজন ছেলেকে পছন্দ করত। যা পরিবার মেনে নেয়নি। এর মধ্যেই বাবা-মা তার বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মূলত এ বিষয়টি নিয়েই পারিবারে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। পুরো বিষয়টি নিতে না পেরেই আত্মহত্যা করেছে রুম্পা।

চাকরি না পাওয়ায় তরুণ সেনের আত্মহত্যা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরুণ সেন গত ৮ এপ্রিল আত্মহত্যা করেন। তিনি দর্শন বিভাগে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন। সরকারি চাকরি না পাওয়ায় এবং চাকরির বয়স শেষ হওয়ায় আত্মহত্যা করেন তরুণ সেন। করোনাকালে তরুণ সেন বেকারত্ব এবং পারিবারিক অভাব অনটনে নিয়ে হতাশায় ছিলেন। তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্ম্যা করেন। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে।

ঢাবি ছাত্রী সুমাইয়ার আত্মহত্যা নিয়ে রহস্য : শ্বশুরবাড়ি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২২ জুন সকালে এই ঘটনা ঘটে। সুমাইয়া নাটোর সদরের হরিশপুর বাগানবাড়ি এলাকার মোস্তাক হোসাইনের স্ত্রী।

ওই ছাত্রীর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, সুমাইয়াকে হত্যা করা হয়েছে। আর শশুর বাড়ির লোকজনের দাবি, সে আত্মহত্যা করেছেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, সুমাইয়ার দেহে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের এ শিক্ষার্থী মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে ফলাফলের অপেক্ষমান ছিলেন। এসময়ের মধ্যে তিনি বিসিএস ও সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্বপ্নজয়ের আগেই তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

ফেইসবুকে ‘আল বিদা’ স্ট্যাটাস দিয়ে ইমাম হোসাইনের আত্মহত্যা : ১৭ আগস্ট নিজ বাড়িতে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইমাম হোসাইন নামের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি ‘আল-বিদা’ লিখে স্ট্যাটাস দেন ওই শিক্ষার্থী।

জানা গেছে, ইমাম হোসাইনের বাড়ি বরিশাল জেলার উজিরপুর থানায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। থাকতেন কবি জসীম উদদীন হলে।

বন্ধুরা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশনে ছিলেন। কি কারণে ডিপ্রেশনে ছিলেন জানতে চাইলে তারা জানান, প্রেমঘটিত সমস্যার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। মেয়ের বাবা তাকে একটু কটুকথা বলেছিলো। পাশাপাশি ওই মেয়েও আগের মতো তার সাথে সম্পর্ক রাখতো না। এই কারণে তার মাঝে ডিপ্রেশন চলে আসে। এ থেকেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

ভবন থেকে পড়ে সাবেক ছাত্র আসিফের আত্মহত্যা : গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কাঁঠালবাগানের একটি বাসার ৯ তলার বারান্দা থেকে পড়ে আসিফ ইমতিয়াজ খান জিসাদ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তবে ঢাবির ওই শিক্ষার্থীর পরিবার এবং বন্ধুদের দাবি, তাকে বারান্দা থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আসিফ ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৫-২০০৬ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন।

আসিফের বন্ধুরা জানান, আসিফ কখনোই আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আসিফের স্ত্রীর সাথে তার মাঝেমধ্যেই ঝগড়া হতো। সে এই কথা আমাদের সাথেও শেয়ার করেছে। আমাদের ধারণা ঘটনার সময়ও আসিফের সাথে তার স্ত্রীর ঝগড়া হয়েছিল। এ সময় তাকে কেউ ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছে। তবে আসিফের শশুরবাড়ির লোকজন দাবি করেছেন, আসিফ আত্মহত্যা করেছে।

চিরকুট লিখে আত্মহত্যা : কামরুল বাহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি অমর একুশে হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তার বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরাম থানার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উওর মোহাম্মদপুর গ্রামে। কামরুল জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ পেয়ে যোগদান করেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ফার্মগেটের একটি আবাসিক হোটেল থেকে ওই ছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে তিনি একটি চিরকুট লিখে রেখে গেছেন।

বিষন্নতা থেকে শুভজ্যোতির আত্মহত্যা : তীব্র বিষন্নতা ও মানসিক চাপ থেকেই আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শুভজ্যোতি মন্ডল (২২)। ১৪ অক্টোবর বিকেলে সংবাদ পেয়ে আদাবর মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ৪ নম্বর রোডের ১৪১ নম্বর বাড়ি থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শুভজ্যোতি ঢাবির চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন।

শুভজ্যোতির বোন তাপসী মণ্ডল বলেন, সে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। কিন্তু বাহ্যিকভাবে সেটা দেখা যেত না। আমি ঢাকা শহরের বেশ কয়েকজন ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে ট্রিটমেন্টও করেছি এবং প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধের ব্যবস্থা করেছি। শেষতক আমার ভাইকে বাঁচাতে পারলাম না।

পারিবারিক কলহে ঢাবির সাবেক ছাত্র জাকারিয়ার আত্মহনন : পারিবারিক কলহের জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক ছাত্র জাকারিয়া বিন হক শুভ আত্মহত্যা করেছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। শুভর শাশুড়ির দাবি, স্ত্রী নীরার সাথে সিগারেট খাওয়া নিয়ে কথাকাটির জেরে সে ফ্যানের সাথে ওড়না ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে তার স্ত্রী গিয়ে ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পেয়ে তা নামিয়ে ফেলে। পরে পুলিশে খবর দিলে লাশ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে পাঠানো হয়।

তবে শুভর পরিবারের দাবি, তাকে মেয়ের পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছেন। পরে নিহতের বড়বোন হাসিনা নাজনীন বিনতে হক বাদী হয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় শুভর স্ত্রী শেহনীলা নাজ ও শাশুড়ি আছমা বেগমসহ অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়।


ঢাকা, ২৮ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।