করোনায় কিভাবে সময় কাটাচ্ছে কুষ্টিয়ার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা?


Published: 2020-07-08 11:46:46 BdST, Updated: 2020-08-06 18:46:31 BdST

দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী সনাক্ত হয় ৮ মার্চ, এবং করোনা উপসর্গ নিয়ে প্রথম মারা যায় ১৮ মার্চ । তার কিছুদিন পর‌পর‌ই প্রায় ১৭ মার্চ থেকে করোনার প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের প্রায় সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করে । করোনার সংক্রমণ ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার ফলে প্রায় তিন-চার মাস ঘরবন্দি এ সকল শিক্ষার্থীরা । চলুন জেনে নেওয়া যাক, করোনার দিনগুলো কীভাবে তারা কাটাচ্ছে, তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের প্রত্যাশাগুলো জানালেন ক্যাম্পাসলাইভকে: আল আমিন ইসলাম নাসিম, ইবি, কুষ্টিয়া।

রুবেল হোসাইন, বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা, খোকসা, কুষ্টিয়া:

রুবেল হোসাইন

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে স্বচ্ছভাবে জানালেন, জীবনে ভাবিনি মহামারী নিজের সামনে থেকে দেখতে হবে। ক্যাম্পাস বন্ধ, তাই ক্যাম্পাসের স্মৃতি এখন সবসময়‌ই তাড়িয়ে বেড়ায়। সকালে নিয়মিত সালাত আদায় করছি এবং কুরআন, হাদীস পড়ছি। সময় পেলে, একটু একাডেমিক ও গল্পের বই পড়ছি। বিকেল হলে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলা হয়, গ্রামে ঘুরা ঘুরি কিছু করি।

এছাড়া গ্রামের অসচেতন ব্যাক্তিদের করোনা বিষয়ে সচেতন করি। গ্রামের মানুষের জন্য সংগঠন খোলা হয়েছে, সেখানে নিয়মিত কাজ করছি। যাইহোক অনেক দিন পর পিতা-মাতা ও ভাই-বোনের সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছি ঘরে থেকে, যার ফলশ্রুতিতে আমি খুবই আনন্দিত। তাদের সঙ্গে থাকলে মনে হয়, পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাকে ক্ষতি করতে পারবে না। যাহোক মহান আল্লাহ তা'আলা আমাদের এই ভয়াবহ করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত করবে শিঘ্রই, এই প্রত্যাশাই করছি‌।

আয়শা সিদ্দিকা, বিভাগ: বাংলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা: কুমারখালী, কুষ্টিয়া:

আয়শা সিদ্দিকা

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন, করোনার সংক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাথে যেন আতঙ্ক‌ও প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বাড়িতেই সবসময় কাটাচ্ছি, কেননা বাইরে যাওয়ার নেই কোনো সুযোগ, বিশেষ করে করোনার সময়ে। নিজে টুকটাক পড়াশোনা করছি। পাশাপাশি ছোট বোনকে পড়াশোনা করাচ্ছি। মায়ের ঘড়োয়া কাছে সহায়তা করছি। রান্না করছি মাঝেমধ্যে।

এছাড়া সিংহভাগ সময়‌ই ফোন ব্যবহারে নিমজ্জিত হচ্ছে। তবে ঘুমোচ্ছিও খুব। পাশাপাশি সময় পেলে বিভিন্ন উপন্যাসের ব‌ই পড়ছি। তবে এবার মন বেশি ভালো নেই, কেননা রাবি ৬৭ বছরে পদার্পণ করেছে এবং করোনার ফলে ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত উৎসবে সামিল হতে পারলাম না। করোনা যেন মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দ উল্লাস সব কেড়ে নিয়েছে। এছাড়া বাড়িতে থেকে অনেকাংশ সময় পাড় করছি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করে‌। আবার একাডেমিক ব‌ইও পড়ার চেষ্টা করছি মাঝেমধ্যে।

মিনহাজ মাহমুদ, বিভাগ: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা: কুমারখালী, কুষ্টিয়া:

মিনহাজ মাহমুদ

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন, বিশ্ব এখন করোনা মহামারীর কালো থাবলে বন্দী, অচল হয়ে পরা বিশ্ব এখন মৃত্যু পুরীতে পরিনত হয়েছে, মৃত্যুর মিছিল যেন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। তদাপুরি একজন পাবলিক বিশব্বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে এই সংকট কালীন সময় আমি আমার সময় কে যথাযথ কাজে লাগানোর চেস্টা করছি। এলাকার বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে নিজেকে সংযুক্ত রাখছি‌। নিন্মবিত্তদের সাহায্যে করছি বিভিন্ন দ্রব্যে সামগ্রী দিয়ে। তাদের মধ্যে সতেচনতা বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করছি। প্রতিদিন খবর দেখছি ও পড়ছি। পাশাপাশি নিজের সময়টা পরিবারের সাথে কাটাচ্ছি।

এছাড়া আমার পছন্দের বিভিন্ন উপন্যাসের বই পড়ছি। কঠিন ভর্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। তবে করোনা ভাইরাসের ফলে বেশিদিন ক্যাম্পাসে থাকার সুযোগ হয়ে উঠেনি। তবে এখন যেন ভীষণ মিস করছি, বড়ো ভাইদের ভালোবাসা, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গ, পাহাড়ী এলাকায় সবুজে ঘেরা ২১০০ একরের ক্যাম্পাস আর আমাদের প্রিয় শাটল ট্রেন।

ফারহান সেলিম, বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা: দৌলতপুর, কুষ্টিয়া:

ফারহান সেলিম

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন, করোনা ভাইরাসের কারনে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দিন আসে দিন যায়, শুধু যে অপেক্ষা আর অপেক্ষা প্রাণের ক্যাম্পাসে ফেরার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১০ দিনের ছুটিটা যে এতো দীর্ঘ হবে তা কোন মতেই ভাবতে পারছি না। এই মহামারীর মধ্যে পর্যাপ্ত সময় থাকা সত্বেও পড়াশোনায় মনেযোগী হতে পারছি না যার প্রধান কারন পড়ার অনুকূল পরিবেশ বাড়িতে না থাকা।

এই সময়ে আমি কিছু ছেলেমেয়ে পড়িয়ে তাদের একটু পড়াশোনার দিকে মনোযোগী গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এরপর নিজে অনলাইন ক্লাস করার পর সময় কাটাবার আসল যন্ত্র মোবাইল ফোনে গেমিং এ অংশগ্রহণ করি, বন্ধুদের সাথে। তবে এসব কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকলেও কেমন যেন শান্তি-দুরন্তপনা নেই। মিস করছি ক্যাম্পাস লাইফের বন্ধুদেরকে, কতদিন একসাথে বসে আড্ডা দেওয়া হয়না। শুধু একটা জিনিসের অপেক্ষায় থাকি কখন বিশ্ববিদ্যালয় খোলার নির্দেশনা আসবে আর প্রানের ক্যাম্পাসে পদচারণ করব।

মাহমুদ আলী জুবায়ের, বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা: কুমারখালী, কুষ্টিয়া:

মাহমুদ আলী জুবায়ের

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঢাকায় প্রথম তার তান্ডবলীলা ঘটায়। এমতাবস্থায় আমার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকাতে থাকায়, দ্রুত বাড়িতে চলে আসতে হয়। তবে করোনার প্রভাব যেন গ্রামেও বিস্তার শুরু করে দিয়েছে।

তাই প্রতিনিয়ত শঙ্কার সঙ্গে বাস করছি। বাড়িতেই থাকি বেশিরভাগ সময় এবং করোনার এই সময় আমি ভালো কিছু বই পড়ছি। মাঝে মাঝে কেরাম খেলছি বাড়ির সন্নিকটে। আপাতত একাডেমিক পড়াশোনা নিয়ে বেশি ভাবছি না। মাঝে মাঝে গান শুনছি। বাবাকে তার কাজে সাহায্য করছি। বন্ধুর সাতে আড্ডা দিচ্ছি। আমার বাগানে নতুন নতুন গাছ লাগাচ্ছি। বাগানে গাছের যন্ত নিচ্ছি। এভাবেই করোনার মাঝে আমার দিন গুলো অতিবাহিত করছি।


তানজীম রহমান রীতি, বিভাগ: সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা: কুষ্টিয়া সদর, কুষ্টিয়া:

তানজীম রহমান রীতি

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন, মাস হলো পুরোপুরি ঘরবন্দী জীবন পার করছি, এই করোনাভাইরাস এর কারনে। পুরোটা সময় যেহেতু বাসায় থাকতে হচ্ছে তার জন্য বাসার অভ্যন্তরীণ কাজ ছাড়া আর তেমন কিছুই করা হয়ে উঠে না।‌

মাঝেমধ্যে টুকিটাকি গল্পের বই পড়ছি। ঘুরাঘুরি তো নেই, এই সময়ে একটু ছাদে যাওয়া হয়। বাসার মধ্যে মা,বাবা,ছোট এদের সাথেই দিন কাটে। মাকে রান্নার কাজে টুকিটাকি সাহায্য করি। তবে বেশ কিছু রান্না শিখে ফেলেছি এই সময়ের মধ্যে।মাঝেমধ্যে গান শুনি। আর একাডেমিক পড়াশুনা তো সব হারাবার পথে। কিছুকিছু সময় বেশ বোরিং লাগে। তবে এই ফোন টাই সবচেয়ে বেশি সঙ্গ দিচ্ছে আমাকে। এভাবেই কাটছে আমার করোনাকাল।

সুদীপ্ত শাফি, বিভাগ: ইংরেজি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা: কুষ্টিয়া সদর, কুষ্টিয়া:

সুদীপ্ত শাফি

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন, বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের ফলে তীব্র সংকটে। বাংলাদেশসহ ২১০+ দেশ আজ এই মহামারিতে আক্রান্ত। এই অবস্থাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে এই মহামারি ভাইরাস এর প্রকোপ বাড়তে ই থাকে। মানুষেরা ঘর থেকে বের হতেও পারছে না। আমিও পরিবার নিয়ে চরম শঙ্কার মধ্যে আছি। একাকিত্বে দূর করার জন্য প্রতিদিন কিছু কিছু গল্পের বই পড়ছি। আপাতত পুরোপুরি সিলেবাস ভিত্তিক পড়াশোনা থেকে পুরোপুরি দূরে অবস্থান করছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে মাঝে মধ্যে যোযোগাযোগ করছি।

এছাড়া আমি অনলাইনে গাছ বিক্রির কিছু কাজ করতেছি। এতে করে আমারও সময় কাটছে, মানুষেরাও গাছ নিয়ে ভালো একটা সময় কাটাতে পারছে। পরিবেশ রক্ষার চিন্তাটা এ সময়ে বেশি। মাঝে মধ্যে বাসার আশেপাশে খেলা করি। গান শোনা, সিনেমা দেখা পরিবারের সাথে, পশুপাখি কে নিয়ে সময় দেয়া এগুলা করেই দিন পার করছি‌। মহান স্রস্টার কাছে একটাই প্রার্থনা আবার আমাদের সেই স্বাভাবিক জিবনে ফেরার সুযোগ দিক, এই আশা ব্যক্ত করছি।

তানজীম মোহাম্মদ, বিভাগ: হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঠিকানা: কুষ্টিয়া সদর, কুষ্টিয়া:

তানজীম মোহাম্মদ

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে খোলামেলা জানালেন, করোনা মহামারির এই সময়টা, শিক্ষার্থীদের দিয়েছে অফুরন্ত সময়। নিজেকে জানার, নিজেকে চেনার অবর্ণনীয় সুযোগ! এই সুযোগ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে কাজে লাগাচ্ছে এবং আমিও এর ব্যতিক্রম নই। মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে শুরু হয় প্রতিটি দিনের।

নির্দিষ্ট সময় করে শারীরিক পরিশ্রম তথা ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর ও মনকে সুস্থ রেখে সকালের নাস্তা সেড়ে টেলিভিশনের পর্দা! সংবাদ, বিশ্বের সমস্ত বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখি। এরপরে সময় মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অনলাইন ক্লাস! ক্লাস শেষে বন্ধুদের সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই খণিকের আড্ডা দিতে দিতে গড়িয়ে পড়ে দুপুর। গোসল, নামাজ, খাওয়া সেড়ে একটু ঘুমিয়ে দিব্যি দুপুর কাটিয়ে দিইৎ। মিষ্টি রোদের বিকেলে ছাঁদে ঘুড়ি উড়াতে ব্যাস্ত হই ছোট বড় সবাই! এ যেন কোয়ারান্টাইন দিনের সবচে আনন্দের!

কোনোদিন আবার পরিবারের সাথে ঘড়োয়া বিনোদনের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যা থেকে অনলাইন ক্লাসগুলো খাতা কলমে বাস্তবায়ন করি। এছাড়াও একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্যিকের সংকলন পড়া হয়। এভাবেই অর্ধ রাত্রি কেটে যায়। তারপর পরিমিত ঘুম দিয়ে সুস্থ মনে শুরু হয় আরেকটি শুভ্র নির্মল সকাল। সবমিলিয়ে হোম কোয়ারান্টাইন এভাবেই পাড়ি জমাচ্ছি!

পরিশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক মহামারি খ্যাত করোনা পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্ব আজ অচল! আমরা শিক্ষার্থীরা তবে বিচিত্র কিসে? বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে অচল হয়ে আছে প্রতিটি মানুষের জীবন। আগের মতো শিক্ষার্থীদের এখন আর ক্লাস নেই, নেই কোনো প্রাণচঞ্চলতা! কেননা, শিক্ষা, জ্ঞানার্জন, সময়মতো নিয়ম করে ক্লাস যেন শিক্ষার্থীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ!

ঢাকা, ০৮ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএআই//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।