ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সমীকরণ


Published: 2021-07-02 22:32:03 BdST, Updated: 2021-07-30 05:55:51 BdST

আশরাফ আলী ইমরান: একটি দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান, কলা-সাহিত্য, গবেষণা এবং সৃষ্টিশীল সব ভাবনার প্রবেশদ্বার একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা যেতে পারে। ৪২৭ অব্দে ভারতের বিহার রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ইতিহাসের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা। মরক্কোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ফেজ শহরে ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কারুয়েন বিশ্ববিদ্যালয়। গিনেস রেকর্ড বুকেও এটি এই পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত।পর্যায়ক্রমে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠে এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়ে মানুষকে নবযুগের পথ দেখায়। এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের ধর্মের প্রতি অন্ধভক্তি জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে দূরে রেখেছিলো বহু বছর।ইউরোপীয়রা এ উপমহাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিলো বিভিন্ন কলাকৌশলে যার ফল উপমহাদেশে রেনেসাঁস ঘটেছিলো।

যখন ইংরেজরা মুসলমানদের থেকে ক্ষমতা নিয়ে উপমহাদেশের রাজসিংহাসন দখল করে তখন তারা ডিভাইড এন্ড রুলস পলিসির মাধ্যমে হিন্দুদেরকে সুযোগ দেয় যার ফলে হিন্দুদের মধ্যে একটা শিক্ষিত শ্রেণী সৃষ্টি হয় এবং ভারতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতে সাহায্য করে ।তখন বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে অনেক সংস্কারক বিশেষ করে নবাব সলিমুল্লাহ বাংলায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তীব্র প্রয়োজন উপলব্ধি করেন যার ফলশ্রুতিতে অবশেষে ১৯২১সালের ১ জুলাই পূর্ববঙ্গের বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অগ্রসরতার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ববঙ্গে যতসব অন্যায়ের প্রতিবাদের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হয়েছিলো সবকিছুর নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিলো। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূ্র্ব পর্যন্ত সময়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্বাধীকার অধিকার আদায়ের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। দেশবিভাগের পরই পাকিস্তানীরা আমাদের ভাষার উপর নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠে স্বৈরচারী শাসকের বিঁষফোড়া। শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ উদ্যোগে মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের উৎপত্তি ও কর্মসূচি লক্ষ্য করা হয়।

ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্ততীতে স্বাধীনতা পর্যন্ত সব মুক্তির আন্দোলন এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর শিক্ষক - শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিলো অভাবনীয়। ২৫মার্চ ১৯৭১ সালের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর পৈশাচিক অপারেশন সার্চ লাইটের অন্যতম টার্গেট ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তান্ডবের শুরুতে ঢাবির অধিকাংশ হল রকেট হামলা করে গুঁড়িয়ে দেয়, শিক্ষক -শিক্ষার্থীকে নির্বিচারে হত্যা করে যততত্র ফেলে দেয়।এসবের অন্যতম কারণ ছিলো সব ধরণের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এবং আন্দোলনেের সূত্রপাতের ভূমিকা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবির্ভূত হওয়া।

যুদ্ধপরবর্তী দেশীয় সব ধরনের গোলযোগ এবং স্বৈরচারীতা প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সবারই বিদিত। নব্বইয়ের স্বৈরশাসকের সময় কিক ফর ডেমোক্রেসি ছিলো স্বৈরশাসকের বিদায়ের অশনিসংকেত। এসব কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সচেতনতা, অধিকার আদায়,অন্যায়ের প্রতিবাদ,গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় অবিচল ছিলো। দেশের ১৩জন রাষ্ট্রপতি,৭ জন প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের একমাত্র নোবেলবিজয়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ সবথেকে বেশি বিজ্ঞান একাডেমি এ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। বাঙালি জাতির জাতিসত্তার জাগরণ, বাংলাদেশের সৃষ্টি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক সূত্রে গাথা।শানিত কলমের জোরে রুশো, ভলতেয়ার, মনটেস্কো যেমন ফরাসী বিপ্লবের কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো ঠিক তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সৃষ্টিতে আবির্ভূত হয়েছিলো বৈকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঋণ বাঙালি অস্বীকার করতে পারবেনা কখনো। প্রাপ্তির চূড়া যেনো এভারেস্টকেও হার মানায়।

তবে শতবর্ষে কিছু অপ্রাপ্তি বিবেকে নাড়া দেয়। পূর্বের গৌরব রক্ষার্থে এসব অপ্রাপ্তি যেনো প্রাপ্তির সান্নিধ্য অর্জন করতে মরিয়া।যেই শতবছরের বটমূলে একটি দেশের জন্ম সেই শতবছরের বটমূলের অপ্রাপ্তি গুলো যেনো সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে মনে ধোঁয়াশার জন্ম দেয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই শতভাগ আবাসিক সুবিধা দেয়ার জন্য প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাতি লাভ করেছে। এখনও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামেই সর্বজনবিদিত।

কিন্তু শতবর্ষে আবাসিক সুবিধা উদ্বিগ্নের কারন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মেধা বিকাশের অন্যতম শর্ত পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা অনুকূল পরিবেশ।কিন্তু গনরুমের নিষ্ঠুরতায় হাজারো শিক্ষার্থীর আত্মিক মৃত্য ঘটে প্রথম বর্ষেই। গনরুমের ছারপোকার মতই আবাসিক প্রতিবন্ধকতা যেনো শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের কিংবা মুক্তিবুদ্ধি চর্চার মাঝে রক্তচোষার ভূমিকা পালন করে।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তিবুদ্ধি চর্চাকেন্দ্র এবং গবেষণার উপযুক্ত জায়গা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান অব্দি রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অপরাজনীতি চর্চার জন্য শতবর্ষী বিশ্ববিদ্যালয়টির মুক্তিবুদ্ধি চর্চায় ভূমিকা নগন্য। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে শুধু বিসিএস কিংবা চাকরির বইয়ের পাতা উল্টানো হয়।সীমিত সংখ্যাক আসনের জন্য অধিকাংশ শিক্ষার্থী লাইব্রেরী সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সারঞ্জাম এবং ল্যাবের সুবিধার অভাবে গবেষণা খাতকে পিছিয়ে রেখেছে। প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভর করে আছে।

শতবর্ষী এই বটমূলের প্রাপ্তির ছায়ায় পুরো জাতি। তবে শতবর্ষে অপ্রাপ্তি গুলো যেনো প্রশাসনের নিকট অধরা রয়ে না যায়।পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা, লাইব্রেরীর মানগত উন্নয়ন, গবেষণার সুবিধাকে প্রসারিত করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আধুনিকায়ন করা, অপরাজনীতি চর্চা বন্ধ করে মুক্তিবুদ্ধি চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা শতবর্ষের সময়ের দাবী। শতবর্ষে এ অপ্রাপ্তিগুলো যেনো প্রাপ্তির সাথে মিশাতে পারি হে শতবর্ষী বটমূল!

আশরাফ আলী ইমরান

 

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ০২ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।