গোঁড়ায় গলদ


Published: 2021-04-24 02:14:45 BdST, Updated: 2021-06-20 16:46:41 BdST

শারমিন সুলতানা নিশি: সভ্যতা যত অগ্রসর হয়েছে নারীদের ওপর বাঁধা বিরোধের পরিমান ও তত বেড়েছে নতুন আঙ্গিকে। দিনকেদিন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে নারীর বিচরনের পরিধি, যার অনেকগুলো শেকঁলের তালা আমরা খুলেছি কিছু তালা'র চাবি এখনো মুক্তির পথ দেখেনি। বেশিরভাগ নিয়মই আমাদের চাপিয়ে দেয়া শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার জন্য।

'সম্পদ' এর ধারণা মানুষের মাঝে আসার আগ পর্যন্ত নারীরা তাদের স্বাধীনমত পুরুষসঙ্গী সংখ্যা নির্ধারন করতে পারতো। যখন সম্পদের উত্তরাধিকার নির্বাচন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো ঠিক তখন থেকেই সেই বিষয়ের স্বচ্ছতা রাখার স্বার্থে নারীকে বলা হলো মনোগ্যামাস হতে। সমাজে আদর্শিক স্ট্যান্ডার্ড ধরে নেয়া হলো মনোগামীতাকে।

যখন নির্দিষ্ট একটা বিষয়কে আদর্শিক ধরে সমাজ পরিচালনা হয় তখন বাকী অনেকগুলো ইচ্ছা, আকাঙ্খা কে গলা টিপে মেরে অসামাজিক ট্যাগ লাগানো হয়।তাই এখন মিডিয়ায় যেসব নারীদের একের অধিক জীবনসঙ্গী দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তাদের গালাগালি দেয়াটা তাই সমাজ নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করছে।

এই যে নারীদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপ, জীবনের ব্যক্তিগত বা প্রফেশনাল সিদ্ধান্ত তাতে পুরুষদের থেকে সেন্সরশিপ পাওয়ার আকুলতা, যাতে তারা সন্মান নিয়ে বাচঁতে পারে, এই চিন্তাটার গোড়াতেই সবচেয়ে বড় সমস্যা। সুস্থ, সবল, শারীরিক মানসিক একইরকম বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র শারীরিক আলাদা রকম গঠনের জন্য একটা মানুষ আরেকটা মানুষের ওপর কর্তৃত্ব রাখার যে এক অসমক্ষমতার প্রতিনিয়ত অনুশীলন, এটার মূল খুঁজতে যেতে হবে এসব শেখার আবাসস্থলে।

পরিবার থেকে, বিদ্যালয় থেকে আমরা জীবনের প্রথম পাঠগুলো শিখি আর দুনিয়াকে চিনতে শিখি। ছোটবেলায় এরকম নীতিবাক্য আমরা সকলেই শুনেছি, "সমালোচনার মধ্য দিয়ে যে শিশু বড় হয়, সে বড় হয়ে অন্যের নিন্দা করতে শেখে"। বিষয়টা একদমই তাই।পরিবার থেকেই দেখি পরিবারের সব সিদ্ধান্তে দিনশেষে বাবাদের সিদ্ধান্তই সর্বশেষ রায়।মা যতই তার পেশায় দক্ষ হোন না কেনো,সে কতোটা গৃহকর্মে নিপুণা সে বিষয়টা তাকে বিচারের ক্ষেত্রে ধর্তব্য হবেই।

এইরকম ছোট ছোট বিষয়গুলো শিশুমন ছোট থেকে দেখেই উপলব্ধি করে। বুঝতে পারে অসমতার বিচরণ।এরপর আসি পাঠ্যবইয়ের দিকে,নারীদের রজঃচক্রের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত গার্হস্থ্য অর্থনীতি বইতে পাওয়া যায় ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণীর টেক্সট বইয়ে, অথচ এই বিষয়গুলিতো ছেলে মেয়ে উভয়েরই সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ের পৃষ্ঠায় জানার কথা।শারীরিক শিক্ষা টেক্সটবইয়ে বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তনের বিষয়ে লিখা 'নারীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শারীরিক পরিবর্তন' এইরকম অতিশায়িত শব্দচয়ন উর্বর মস্তিষ্ককে কয়েকধাপ বেশি ভাবাতে যথেষ্ট!

বেশিরভাগ পরিবারে ছোটবেলা থেকেই নারীদের তাদের শরীরকে মোটামুটি ইনভিসিবল বা অবয়ববিহীন যাতে মনেহয় এমন কাপড় চোপড় পড়তে বাধ্য করা হয়, কিন্তু কম জানার কারণে কিংবা জানতে চাওয়া ব্যাকুল আগ্রহে আমরা দেখতে পাই বোরকা কিংবা প্রবল পর্দা তাদের সে ক্ষুধার্ত চোখগুলো থেকে বাঁচাতে পারেনা।

যদি পরিবার থেকে, পাঠ্যবইয়ে এইরকম শারীরিক পরিবর্তন গুলোকে সাধারণ পরিবর্তন বলে চিত্রায়িত করা যেত, যদি স্তন, যোনীকেও নাক, চোখের মত অঙ্গ বলে বিবেচনা করা শেখানো যেত তাহলে হয়তোবা এমনটা উপচে পড়া আগ্রহের বিকটাকার অবস্থা আমরা দেখতাম না।

লেখক: শারমিন সুলতানা নিশি

 

আমরা অধিকারের কথা বলি, আবার আমরাই বলি, আমরা (পুরুষরা) তোমাদের অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছি, তোমাদের অধিকার দিচ্ছি, অথচ এটা বলিনা এসব তোমাদের আরো আগে পাওয়া উচিত ছিলো, আমরা অধিকার দেবার মত সুপিরিয়র কেউ না! দিনকে দিন নারীর প্রতি অসন্মান, অবিচার, অপরাধ বাড়ছে নানা আঙ্গিকে।

পুরুষের কর্তৃত্ব হারানোর ভয়, নারীর উন্নতি মেনে নেয়ার মত মানসিকতাবিহীন আধুনিকতা, নারী স্বাবলম্বীরাও দিনশেষে খোলসে আবৃত শুধু আপনাতেই ব্যস্ত। চারিদিকে শুধু বুলি আছে নেই কোন পরিবর্তন। সভা, সেমিনারে দিনের বেলায় যারা নারীবাদী বলে গলা ফাটায়, রাতে তারাই গিয়ে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলে পুরুষত্ব দেখায়।

লিঙ্গকে সংখ্যার বা ক্রম বিচারে প্রথম, দ্বিতীয় বিভাজন করে সেখানে সমতার আশা করা যায় না যেমন ঠিক তেমনই চিন্তার মধ্যেই উঁচু নিচু ভেদবিভাজন ভেবে সমাজ থেকে নারীর প্রতি অসন্মানের জায়গা গুলো ঘুচানো সম্ভব না, এভাবে সম্ভব না।আমাদের যেতে হবে গোঁড়ায়, নির্মূল করতে হবে সকল গোঁড়ামি।

লেখক:
তৃতীয় বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ২৩ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।