44331

করোনা পরবর্তী পৃথিবী কেমন হতে পারে?

করোনা পরবর্তী পৃথিবী কেমন হতে পারে?

2021-08-06 11:50:19

তারিক চয়ন: করোনাকালের এই পর্যায়ে এসে সবাই এখন বলছেন, গোটা মানবজাতির জন্য এখন প্রথম চ্যালেঞ্জ- করোনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজেকে টিকিয়ে রাখা। সেজন্য বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এই পরীক্ষায় উতরে গেলে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে করোনা পরবর্তী নতুন বাস্তবতার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়া। করোনা পরবর্তী বাস্তবতা সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেক কিছু বলা হয়েছে এবং সকলেই প্রায় একমত যে মানুষ আর আগের পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবে না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বাজার, অর্থনীতি, খাওয়াদাওয়া, যোগাযোগ, ভ্রমণ, চাকরিবাকরি, বিনিয়োগ, এমনকি ভোটদানের পদ্ধতিতেও আসতে পারে ব্যাপক পরিবর্তন।

বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ বিবেক ওয়াধওয়া করোনা মহামারীকে 'ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বাস করার জন্য একটি মহড়া' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামোযুক্ত দেশগুলো করোনা সংকট থেকে শক্তিশালীভাবে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। তাই প্রযুক্তি যে করোনা পরবর্তী বিশ্বে মানুষের জীবনের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাবে তা বলাবাহুল্য। বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- গত কয়েক মাস ধরে, ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ, তাদের টিম এবং সাধারণ মানুষ একটি ডিজিটাল-ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড এ কাজ করতে শিখেছে।

অনেক ব্যবসায়ীরাই আবিষ্কার করেছেন যে তাদের টিমের সদস্যরা বাড়িতে বসে কাজ করলে উৎপাদনশীলতা স্থিতিশীল থাকে, এমনকি অনেকক্ষেত্রে সেটা বৃদ্ধিও পায়।
বিশ্বজুড়ে মানুষ কেবল দূরে বসে কাজ করার সুযোগই উপভোগ করেনি বরং 'অনলাইন মার্কেটপ্লেস' এর সুবিধা এবং বিকল্পগুলোও গ্রহণ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীরাই পরস্পর মোবাইল ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ এ যোগাযোগ বজায় রাখছে। তারা জুম, গুগল হ্যাঙ্গআউট, টিম এর মাধ্যমে মিটিং সেরে নিচ্ছে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে দুশ্চিতার সবচেয়ে বড় কারণ যে হবে নাজুক অর্থনীতি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

টিকা এসেছে, মহামারিও হয়তো নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির যে মারাত্মক ক্ষতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে, তা কাটাতে হয়তো অনেক বছর লেগে যাবে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বাজার অর্থনীতির যে রমরমা অবস্থা বেশ কয়েক দশক ধরে দেখা গেছে, তার স্থলে এক ধরণের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনীতিতে সরকারি খাতের ব্যাপকতর অংশগ্রহণ করোনা পরবর্তী বিশ্বে দৃশ্যমান হবে। এদিকে করোনা এটাও শিক্ষা দিয়েছে যে, বিজ্ঞানকে পাঠক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানো প্রয়োজন। মোবাইল, ইন্টারনেট যে বিলাসিতা নয় বরং আধুনিক যুগে সকলের অধিকার তা দেখিয়ে দিয়েছে করোনা।

শিক্ষকেরা নিজেরাও শিখেছেন যে, শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষের অনমনীয় কাঠামোর মধ্যে বন্দী থাকতে পারে না। টেলিভিশন, রেডিও এবং ইন্টারনেটের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করেছে যে শিক্ষাদানের মাধ্যমটি নমনীয় এবং উপযোগী হতে হবে। লার্ন-ফ্রম-হোম মডেল অভিভাবকদের 'প্রক্সি শিক্ষাবিদ' এ পরিণত করেছে। অভিভাবকদের নিজেদেরও শিক্ষিত হবার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়েছে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে এসব সরাসরি প্রভাব ফেলবে। আমূল বদলে যেতে পারে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা।

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এবং ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এ প্রকাশিত লেখায় ইতিহাসবিদ ইয়োভাল নোয়া হারারি আশংকা প্রকাশ করেন যে, মহামারির সময় যেসব স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেগুলোই করোনা পরবর্তী বিশ্বে স্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে। আর ওই পথ ধরে উত্থান ঘটতে পারে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার, যেখানে চলবে জনগণের উপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি। অন্যদিকে, তার মতে বিশ্বায়নের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী 'একলা চলো' নীতি অনুসরণ করতে পারে অনেক রাষ্ট্র।

সম্প্রতি শান্তিতে নোবেল জয়ী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস একান্ত সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে বলেন, "আমাদেরকে বলা হচ্ছিল যে এটা একটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’। বিশ্বটা একটা গ্রামের মতো। আমরা সবাই থাকি এক জায়গায়। এতো কাছে এসে গেছি আমরা যে এটা একটা গ্রামের মতো, পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তাবোধ থাকবে। কিন্তু করোনা মহামারী এসে দেখিয়ে দিলো যে গ্রাম বলে আসলে কিছুই নেই। এখানে আসলে আছে কয়েকটা দ্বীপ। প্রত্যেক জাতি একেকটা দ্বীপের মতো আলাদা আলাদা হয়ে ভাসছে। এক দ্বীপ অন্য দ্বীপের সাথে সংযোগ রাখতে চায় না। প্রত্যেকে তার নিজ দ্বীপের মানুষকে রক্ষায় ব্যস্ত।

অন্য দ্বীপের মানুষ মরে গেলেও তার কিছু যায় আসে না। বিচ্ছিন্নতা পরিষ্কার হয়ে উঠলো। এটা আগে থেকেই ভেতরে ছিল, এখন সেটা প্রকাশ পেয়ে গেলো। করোনা আমাদের সংকীর্ণমনা, স্বার্থপর মনোভাব প্রকাশ করে দিলো। কাজেই বিশ্বায়ন বলে কোন জিনিস নেই৷ বিশ্বমোড়লরা শুধু আমাদের ‘বুঝ’ দিয়ে গেছে। তারা যার যার মানুষ রক্ষায় ব্যস্ত।" এ নিয়ে নোয়া হারারির ভবিষ্যতবাণী- করোনা পরবর্তী বিশ্বে দেশে দেশে কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থান হবে। প্রত্যেক রাষ্ট্র শুধু নিজেকেই রক্ষা করতে চাইবে, অন্যকে সাহায্য করার ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, করোনাকাল দীর্ঘস্থায়ী হলে বিমান ভ্রমণ অনেক ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে।আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্যবসায় ধস নামবে। যেগুলো ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ আবার মনে করেন, সেক্ষেত্রে মানুষের আচরণেও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটবে। মানুষে-মানুষে পারস্পরিক যোগাযোগ, আদানপ্রদান কমে যাবে। অন্যের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে মানুষের মনে যে ভয় তা কাটাতে বহু বছর লেগে যাবে। মানুষের এমন আচরণের কারণে নতুন ধরণের সেবা, শিল্প, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে নতুন অনেক কিছু গড়ে উঠবে।

ফোর্বস করোনাকাল নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন করেছে যেগুলোর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে করোনা পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে তার উত্তরঃ কেউ কি এখন ভাবেন যে ব্যবসায়িক কাজে ভ্রমণ অতীতের মতো একই গতিতে প্রসারিত হবে যখন আমরা জেনে গেছি যে, আমরা আমাদের 'সংযোগ' এর অনেক প্রয়োজনীয়তা দূর থেকে পূরণ করতে পারি? কোন নিয়োগকর্তা কি বিশ্বাস করেন যে তার সকল কর্মচারীরা শারীরিকভাবে পুরো সপ্তাহজুড়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবেন?

কোন রোগী কি ডাক্তার দেখাতে তার চেম্বারে বা হাসপাতালে যেতে চাইবেন যখন তিনি জেনে গেছেন যে নিজ বাড়িতে আরাম করে বসে থেকেও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করা যায়? দর্শক কি আগের মতো মুভি থিয়েটারে যেতে পছন্দ করবেন যখন তারা সেটার পরিবর্তে ঘরে বসেই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সীমাহীন বিনোদন উপভোগ করতে শিখে গেছেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর যদি "না" হয় তাহলে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল- আমরা নিজেরা এসব নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত কিনা? করোনা পরবর্তী বিশ্বে টিকে থাকার জন্য আমাদের নীতি কি ঠিক আছে নাকি আমরা এখনো সেটা নিয়ে ভাবিইনি? দুঃজনকভাবে উত্তরটি সবারই জানা, আর তা হলো "না"।

তবে, হতাশ হবার কিছুই নেই। থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের বার্ষিক আয়োজন ‘ট্রাস্ট কনফারেন্সে' প্রফেসর ইউনূস সবচেয়ে সংকটের মুহূর্তে সবচেয়ে সুন্দর ভাবনাগুলো বেরিয়ে আসে মন্তব্য করে বলেছিলেন, এই সংকট আমাদের জন্য সুন্দর, সবুজ ভবিষ্যতের পথ তৈরি করছে। করোনার আগের বিশ্বকে বৈশ্বিক উষ্ণতা, ধনী-গরীব বৈষম্যের বিশ্ব বলে অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘‘সে সময়ে আর ফিরে যাওয়ার দরকার নেই৷ কারণ সেটা ছিল এমন একটা ট্রেন যা আমাদের মৃত্যুর দিকেই নিয়ে যাচ্ছিলো ৷''

করোনা পরবর্তী নতুন পৃথিবী গড়তে তিনি ‘ওয়ার্ল্ড অফ থ্রি জিরোস' অর্থাৎ কার্বন নির্গমনের হার শূন্যে নামিয়ে আনা, সম্পদের বৈষম্য শূন্যে নামিয়ে আনা এবং বেকারত্বের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার উপর জোর দিয়ে বলেন, এগুলো বাস্তবায়ন করার এটাই সময়। সৌজন্যে মানবজমিন

০৬ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিআইটি

প্রধান সম্পাদক: আজহার মাহমুদ
যোগাযোগ: হাসেম ম্যানসন, লেভেল-১; ৪৮, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, তেজগাঁ, ঢাকা-১২১৫
মোবাইল: ০১৬৮২-৫৬১০২৮; ০১৬১১-০২৯৯৩৩
ইমেইল:[email protected]