কে ওই সাবরিনা, তার গন্তব্য কোথায়?ডা. মিলনের সঙ্গে ডা. সাবরিনার অন্যরকম সম্পর্ক!


Published: 2020-07-13 17:47:32 BdST, Updated: 2020-08-06 18:48:56 BdST

লাইভ প্রতিবেদক: আলোচিত-সমালোচিত নাম সাবরিনা। তিনি যেমন সুন্দরী তেমনই ধূর্ত। সহজেই মানুষকে বিশেষ করে পুরুষদের পটাতে পারতেন। তার সঙ্গে ছিলো সমাজের উচু স্তরের বেশ কিছু ব্যক্তির দহরম-মহরম। তিনি ভোগ বিলাশে বিশ্বাসী ছিলেন। এমনটি জানিয়েছেন তারই কর্মচারী ও সহকর্মীরা। বলেছেন উচু স্তরের আমলা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এমনকি একজন সাংবাদিক পরিচয় দানকারী উচু মানুষের সঙ্গেও ছিল তার ঘনিষ্টতা। কেবল ডা. মিলন নন। আরও নাম আসবে তদন্তে । জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে বহিষ্কৃত ডা. সাবরিনা আরিফকে ৩ দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত।

১৩ জুলাই সকালে তাকে আদালতে নেয়া হলে এই রায় দেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগকে অনিয়মের স্বর্গরাজ্য করে রেখেছেন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। আর ছায়া হয়ে পাশে থেকেছেন ‘ইউনিট প্রধান’ ডা. কামরুল হাসান মিলন।

সাবরিনার কর্মকাণ্ডের অনুসন্ধানে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে টানা তিন দিন সময় সংবাদ। সহকর্মী বা অধীনস্ত কেউই সরাসরি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে সাহস করেন না। তবে সবার ভেতরেই ক্ষোভ, রয়েছে অভিযোগের ফিরিস্তিও। অভিযোগ রয়েছে, সাবরিনা দিনের পর দিন কাজ না করেই নিতেন বেতন। ডা. মিলনের সুনজরে থাকায় অনুপস্থিত থাকার পরও নাম উঠে যেত হাজিরা খাতায়।

সেই মিলন....সাবরিনা

 

একজন স্টাফ জানান, ওনাকে একদিনও আমি দেখিনি। সাবরিনা-মিলনের ঘনিষ্ঠতায় চটে গিয়েছিলেন সাবরিনার স্বামী আরিফ চৌধুরীও। এ নিয়ে হাসপাতালের ভেতরেই মিলনের সঙ্গে বিবাদেও জড়ায় জেকেজি কর্নধার আরিফ। এ ঘটনায় জিডিও হয় থানায়। সাবরিনা বলেন, যদি এরকম কোনো সম্পর্ক হত, তাহলে তো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে মামলাই করত।

সেই সাবরিনা

 

কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসে সাপ, পদে না থেকেও কার্ডিয়াক সার্জারির বিভাগীয় প্রধানের কক্ষটি দীর্ঘদিন ধরে দখলে রেখেছেন ‘ইউনিট প্রধান’ কামরুল হাসান মিলন। নিজের নামের পাশেও লিখে রেখেছেন বিভাগীয় প্রধান। বাধ্য হয়ে বর্তমান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রামাপদ সরকার ছোট একটি কক্ষে নেমপ্লেট লাগিয়ে কোনোমতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে রাজিন হননি ডা. কামরুল হাসান মিলন। তিনি জানান, পরিচালক সাহেব বলেছেন, মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার আগে তাকে জানাতে। প্রশ্নের মুখোমুখি হৃদরোগ ইনস্টিটিউট প্রশাসনও। চোখের সামনে সবকিছু ঘটার পরও লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবে, বলছে হাসপাতাল প্রশাসন।

৩ দিনের রিমান্ডে সাবরিনা:

করোনার নমুনা পরীক্ষায় প্রতারণা মামলায় জেকেজি'র চেয়ারম্যান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে বহিষ্কৃত ডা. সাবরিনা আরিফের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সোমবার তাকে আদালতে হাজির করে চারদিনের রিমান্ডে চেয়েছিল পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে, রোববার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক অফিস জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে সাবরিনাকে বহিষ্কার করা হয়।

এক সময়কার সেলিব্রেটি???

 

ওই আদেশে বলা হয়, ডা. সাবরিনা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে।

সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সরকারের অনুমতি ব্যতীত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থাকা এবং অর্থ আত্মসাৎ সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপিল), বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সে জন্য ডা. সাবরিনাকে সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ১২ (১) বিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।  সোমবার দুপুরে আলোচিত চিকিৎসক সাবরিনাকে তেজগাঁও বিভাগীয় উপ-পুলিশ (ডিসি) কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

কে ওই সাবরিনা:

দেশজুড়েই এখন আলোচিত-সমালোচিত নাম ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। জেকেজির প্রতারণা কাণ্ডে উঠে এসেছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের এই চিকিৎসকের নাম। তিনি টকশো কিংবা স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনার নিয়মিত মুখ। দিতেন সুস্থ থাকার নানা ফর্মুলা। তিনি চিকিৎসক মহলে বেশ প্রভাবশালীও বটে। জোবেদা খাতুন স্বাস্থ্যসেবা (জেকেজি) প্রজেক্টের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরী।

প্রধান নির্বাহীর চতুর্থ স্ত্রী ডা. সাবরিনা। যদিও সাবরিনার দাবি, আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে তার এখন কোনো সম্পর্ক নেই। তবে হৃদরোগ হাসপাতালে তার কক্ষের সামনে গিয়ে দেখা যায় স্বামীর নামযুক্ত নেমপ্লেট ডা. সাবরিনা আরিফ। বেশ কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসাবিষয়ক মহলে ডা. সাবরিনা অনেক প্রভাব আছে। চিকিৎসকদের একটি প্রভাবশালী সংগঠনের এক প্রভাবশালী নেতার জুনিয়র বান্ধবী তিনি। সেই সুবাধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়েও ছিল তার প্রভাবের বিস্তৃত ডালপালা। আর এতসব কিছুকে কাজে লাগিয়ে এই করোনা মহামারির সময়ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন তিনি।

সাবরিনার ক্ষমতার ব্যবহার:

সাবরিনা

 

সাবরীনার ক্ষমতাবলে জোবেদা খাতুন স্বাস্থ্যসেবা (জেকেজি) প্রজেক্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাগিয়ে নেয় করোনার স্যাম্পল কালেকশনের সুযোগ। প্রথমে রাজধানীর তিতুমীর কলেজ মাঠে স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনের অনুমতি নেন ডা. সাবরিনা। পরে প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার অন্য এলাকা এবং অনেক জেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করছিল তার এই প্রতিষ্ঠান। জেকেজির মাঠকর্মীরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়া মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতেন। চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে জেকেজি করোনার নমুনা সংগ্রহ করলেও শুরু করে প্রতারণা।

করোনার নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করে ইচ্ছেমতো রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠে সাবরীনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। জেকেজির কয়েকজন কর্মী গ্রেপ্তারের পর পুলিশ ও সাংবাদিকদের বলেন, তারা রোগীদের জ্বর থাকলে তাদের করোনা পজিটিভ আর জ্বর না থাকলে নেগেটিভ রিপোর্ট দিত। এরই পরিপেক্ষিতে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগে গত ২৩ জুন জেকেজিতে অভিযান পরিচালনা করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। অভিযানের দিন প্রতারণার মূল হোতা ও জেকেজির প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন ডা. সাবরিনা ।

করোনার ভুয়া রিপোর্ট প্রদান:

করোনার এই মহামারির সময়ে যখন অনেক মানুষ মানবিক হয়ে উঠেছেন ঠিক তখন জীবন-মৃত্যু নিয়ে খেলা করেছেন সাবরীনার প্রতিষ্ঠান জেকেজি। নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করেই দিয়েছে ভুয়া রিপোর্ট। বাংলাদেশ ছাড়া করোনায় নুয়ে পড়া বিশ্বে এসব ঘটনাকে ভয়ংকর গল্প বলে খবর প্রকাশ করেছে। এসব গল্পের মতোই জীবন ডা. সাবরিনা ও আরিফ চৌধুরীর। তিনি আরিফ চৌধুরীর চতুর্থ স্ত্রী। আরিফের দুই স্ত্রী থাকেন রাশিয়া ও লন্ডনে। আরেক স্ত্রীর সঙ্গে আরিফের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তবে ছাড়াছাড়ির পরও সাবেক ওই স্ত্রী উচ্চমহলে আরিফের জন্য দেনদরবার করে যাচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।

ঢাকা, ১৩ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।