দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে ১০টি সুপারিশ করেছেন তারা: গণপরিবহন চালুর চিন্তা করছে সরকারগণপরিবহনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ


Published: 2021-05-01 08:47:27 BdST, Updated: 2021-10-16 20:49:28 BdST

লাইভ প্রতিবেদক: এবার নতুন করে সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বলেছেন বিপর্যয় থেকে বাঁচতে এখনই সাবধান হতে হবে। অন্যতায় প্রতিবেশী ভারতের মতো এদেশেরও একই অবস্থা হতে পারে। তাই সময় থাকতে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারের ঘোষিত লকডাউনে ৭০ শতাংশ সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে ঈদের আগমুহূর্তে গণপরিবহন খুলে দিলে সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে থাকবে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে কোনো সন্দেহ নেই। সেজন্য ঈদের আগমুহূর্তে জরুরি পরিবহন বাদে সমস্ত পরিবহন বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে এখনো পর্যন্ত লকডাউন কিংবা কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করার পদ্ধতিকে সবচেয়ে কার্যকর মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে লকডাউনের মতো একটি বিষয় দীর্ঘদিন চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কারণ এতে মানুষের জীব-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এর পাশাপাশি ১০ দফা সুপারিশও করেছেন তারা। এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, লকডাউনের পর জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখে সরকার ঈদকে সামনে রেখে গণপরিবহন চালুর ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করছে। শনিবার ওবায়দুল কাদের তার সরকারি বাস ভবন থেকে ভিডিও বার্তায় এ তথ্য জানান।

তবে অন্যদিকে লকডাউন সমর্থন করে সরকারের কাছ থেকে গণপরিবহন শ্রমিকদের জন্য ১০ টাকা কেজি চালের দাবি করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সহ-সভাপতি সাদিকুর রহমান হিরু। জানা গেছে, সারা দেশে গত ১৪ এপ্রিল প্রথম কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। ধাপে ধাপে লকডাউন ৫ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সরকার তিন দফায় লকডাউন বাড়ানোর কারণে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে তিন সপ্তাহে সর্বনিম্ন ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরআগে মৃত্যুর সংখ্যা দৈনিক একশো’র ঘুরে ছুঁয়েছিল। এ পর্যন্ত করোনায় দেশে মোট মৃত্যু হয়েছে ১১ হাজার ৪৫০ জনের। মৃত্যুর সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সংক্রমণের হার কমছে। এটাকে তারা সফলতা ভাবছেন।

এদিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেছেন, করোনা সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে নামেনি, এখনও সংক্রমণের হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি। সংক্রমণের হার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে প্রয়োজনে অফিসসহ সবকিছু বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন তিনি। একইসঙ্গে ড. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসে ধীরে ধীরে অফিস, আদালত, গণপরিবহন খুলে দেওয়া যায়।

ড. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, ‘গণপরিবহন বন্ধ রেখে জরুরি প্রয়োজনে সরকারি-বেসরকারি অনেক পরিবহন রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ গণপরিবহনে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া পরিবহনের অধিকাংশ শ্রমিক তরুণ। এসব শ্রমিক নিজেরা সংক্রমিত হয়ে পরিবারের বয়স্কদের সংক্রমিত করবে। গণপরিবহন শুধু শ্রমিকদের বিষয় নয়, এখানে যাত্রীরাও আছেন।’

আরেক বিশেষজ্ঞ হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘লকডাউনের কারণে করোনা শনাক্ত ও আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ২৩ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। যেখানে ৮ হাজারের কাছকাছি প্রতিদিন করোনা রোগী সনাক্ত করা হয়েছে সেখানে ৩ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসছে। এতে ধরা যায়, সরকারের ঘোষিত এই লকডাউনে ৭০ শতাংশ সুফলতা এসেছে।’

ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, ‘লকডাউনের সুফলতা ধরে রাখতে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতি ও প্রার্থনার জায়গায় জনসমাগম করা যাবে না। ঈদের আগমুহূর্তে শুধু গণপরিবহন নয়, প্রয়োজনে জরুরি পরিবহন বাদে সমস্ত পরিবহন বন্ধ করা উচিত। আর ঈদের পরে করোনা সংক্রমণ স্বাভাবিক হলে প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে পরিবহন খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সহ-সভাপতি সাদিকুর রহমান হিরু বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারের ঘোষিত লকডাউনের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মতামত নেওয়া হচ্ছে না, তবে আমরা লকডাউনের সিদ্ধান্তে সরকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সরকার পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ১০ টাকা কেজি চালের ব্যবস্থা করুক। শ্রমিকরা ১০ টাকা কেজি চাল কিনে খেয়ে বাঁচুক।’ তিনি সরকারকে সহায়তা করতেই এমনটা বলেছেন বলে দাবী তার।

মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে এখনো পর্যন্ত লকডাউন কিংবা কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করার পদ্ধতিকে সবচেয়ে কার্যকর মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে লকডাউনের মতো একটি বিষয় দীর্ঘদিন চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কারণ এতে মানুষের জীব-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লকডাউন তুলে নিলেও সংক্রমণ যাতে না বাড়ে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে ‘লকডাউন’ থেকে বেরিয়ে আসার কিছু কৌশল ঠিক করেছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি। এ সংক্রান্ত ১০টি সুপারিশ ইতোমধ্যে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এই কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে ১০টি সুপারিশ করেছেন তারা।

সুপারিশগুলো হলো-

১. অবশ্যই মুখে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। ঘর থেকে বের হবার সঙ্গে সঙ্গে যেন মুখে মাস্ক থাকে। যেখানে ভাইরাসের ঘনত্ব বেশি যেমন- গণপরিবহন, সুপার মার্কেট, বাজার, ব্যাংক, হসপিটাল- এসব জায়গায় কেউ মাস্ক ছাড়া যেতে পারবে না। মাস্ক না পরলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে।

২. অফিসে উপস্থিতি অর্ধেক করার প্রস্তাব করেছে জাতীয় পরামর্শক কমিটি। তবে উপস্থিতি এক-তৃতীয়াংশ হলে ভালো হয়। অফিসগুলোতে ভার্চুয়াল মিটিংকে উৎসাহ দিতে হবে। অফিসগুলোতে যেন দলবেঁধে খাওয়া-দাওয়া না চলে। সবাই যেন আলাদাভাবে তাদের খাওয়া সেরে নেয়।

৩. গণপরিবহন যেন তাদের সক্ষমতার ৫০ ভাগ যাত্রী বহন করে। এই নিয়ম দীর্ঘদিনের জন্য চালু থাকতে হবে। এছাড়া প্রাইভেট এবং তিনচাকার ট্যাক্সি একজন করে যাত্রী বহন করবে। তবে পরিবারের সদস্য হলে দুইজন বহন করতে পারে। অবশ্য রিকশা, মোটরসাইকেল এবং বাইসাইকেলে কোন সমস্যা নেই।

৪. খাবারের দোকান, মুদি দোকান, মার্কেট এবং শপিংমল দিনের লম্বা সময়ের জন্য খোলা রাখা। স্বল্প সময়ের জন্য খোলা রাখলে মানুষের চাপ বাড়ে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। বেশি সময় যাবত খোলা থাকলে মানুষের ভিড় কম হবে। কাঁচা বাজারগুলো উন্মুক্ত জায়গায় পরিচালনা করতে হবে। রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া যাবে না। হোম ডেলিভারি সার্ভিসকে উৎসাহ দিতে হবে।

৫. জনসমাবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মসজিদ, মন্দির এবং চার্চে যাতে ভিড় না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রার্থনায় সীমিত সংখ্যক মানুষ যেতে পারবে। এছাড়া রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও করাও হয় তাতে ১০জনের বেশি মানুষ থাকতে পারবে না।

৬. যারা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে। নিয়োগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের শারীরিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

৭. কলকারখানার প্রবেশ মুখে শ্রমিকদের জন্য স্যানিটাইজেশন ব্যবস্থা রাখতে রাখবে, যাতে করে তারা জীবাণুমুক্ত হয়ে কারখানায় প্রবেশ করতে পারে। কারখানার ভেতরে মাস্ক পরে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতে হবে।

৮. যতদিন পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি না হয় ততদিন পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে উৎসাহ দিতে হবে।

৯. বিনোদন এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত পর্যটন কেন্দ্র খোলা যাবে না।

১০. আইসোলেশন, কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ভ্যাকসিন কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে। সংক্রমণ রোধ করার জন্য এটা ভীষণ প্রয়োজন। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যারা আসবেন তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। টেস্ট করার সুবিধা বাড়াতে হবে। টেস্টিং সেন্টারগুলোতে যাতে ভিড় না হয় সেজন্য সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

জাতীয় পরামর্শক কমিটি যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং মনিটরিং জোরদার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অধ্যাপক শহীদুল্লাহ বলেন, এসব পদক্ষেপ না নিয়ে একসাথে সবকিছু খুলে দিলে আবারো সংক্রমণ বাড়তে পারে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অব্যাহত না রাখলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ লাগামছাড়া হয়ে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ঢাকা, ০১ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

 

 

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।