৪১ বছরে কী পেয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়?


Published: 2020-11-21 13:01:11 BdST, Updated: 2020-11-30 20:25:27 BdST

আজাহার ইসলাম, ইবি: ২২ নভেম্বর ১৯৭৯। স্বাধীন বাংলাদেশে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের বুক চিরে শান্তিডাঙ্গা ও দুলালপুর গ্রামে ১৭৫ একর জায়গা জুড়ে জন্ম নেয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি গাজীপুরের বোর্ড বাজারে ও পরে ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কুষ্টিয়ার পিটিআই এবং প্যারামেডিকেল ভবনে কার্যক্রম চলে। ১৯৯২ সালের পহেলা নভেম্বর গড়ে উঠে দুইটি ভবন। বিশ্ববিদ্যালয়টি পায় স্থায়ী ঠিকানা। শুরু হয় পথচলার নতুন এক অধ্যায়।

ইতোপূর্বে ইবিতে নারী শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হতোনা। পরে ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে প্রথমবারের মতো ছাত্রী ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষার্থী ভর্তির রেওয়াজ চালু হয়। দুই ভবন ও দুই অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগ আট জন শিক্ষক ও ৩শ’ শিক্ষার্থী নিয়ে পথচলা শুরু করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। আগামীকাল (রোববার) ৪২ তম বছরে পা রাখবে বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পেরিয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৮টি অনুষদের অধীনে চালু রয়েছে ৩৪টি বিভাগ। এছাড়া কিছু বিভাগ প্রস্তাবিত রয়েছে। যা বাস্তবায়ন হবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিভাগ সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৯টি।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৩৯৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষার্থী রয়েছেন ১৫ হাজার ৩৮৪ জন, যার মধ্যে ছাত্র ১০ হাজার ২৯১ এবং ছাত্রী ৫ হাজার ৯৩ জন। এছাড়া ৪৫৯ জন কর্মকর্তা, ১৭৭ জন সহায়ক কর্মচারী এবং ১৭৭ জন সাধারণ কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দেশি শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। শিক্ষা-গবেষণার পাশাপাশি খেলাধুলায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অসামান্য অবদান। দেশি অঙ্গন ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও খেলাধুলায় পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়টি। এছাড়া বিভিন্ন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় খেলায় বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্সটিটিউটের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী আদান-প্রদান করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়, কনফুসিয়াস ইন্সটিটিউট, জাপানের ওকাইআমা বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্কের ইস্তাম্বুল ফাউন্ডেশন ও আমেরিকার নর্থ ওয়েস্টার্ণ প্রিৎজাকার স্কুল অব ল সহ ৭টি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে বিশ্বয়নের পথে সম্প্রসারিত করেছেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ডিজিটাল লাইব্রেরি একসেস সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার বই ডিজিটাল লাইব্রেরির আওতায় আনা হয়েছে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা সহজেই কাঙ্ক্ষিত বই খুঁজে পাবেন। ৫ শ’ ৩৭ কোটি ৭ লক্ষ টাকার মেগাপ্রকল্পের আওতায় ক্যাম্পাসে ৯টি দশতলা ভবন ও ১টি কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার নির্মাণ, ১২টি ভবনের উর্দ্ধমুখী সম্প্রসারণ, গভীর নলকূপ স্থাপন, ২টি ৫০০ কেভি বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, সোলার প্যানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে চলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কাগজে-কলমে আবসিক উল্লেখ থাকলেও আবসন সঙ্কট কমেনি। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য হল রয়েছে মোট আটটি। যার মধ্যে ছাত্রহল ৫টি, ছাত্রীহল ৩টি। অনেক শিক্ষার্থীই আবাসিক সুযোগ না পাওয়ায় ক্যাম্পাস থেকে দূরে কুষ্টিয়া কিংবা ঝিনাইদহ শহরে অবস্থান করে। যাদের যাতাযাতের প্রধান মাধ্যম বাস।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে ৪৩টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস ১৬টি, এসি কোস্টার গাড়ি ৬টি, এ্যাম্বুলেন্স ২টি। তবে এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বাসসংখ্যা কম। বাস কম থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাস মালিক সমিতির কাছে বাস ভাড়া নিয়ে থাকেন। ভাড়া করা বাস অধিকাংশ ফিটনেসবিহীন। যার ফলে বারবার দূর্ঘটনার কবলে পড়ে শিক্ষার্থীরা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মাত্র ৪ টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার তীর্থ স্থান। জ্ঞানচর্চার পর্যাপ্ত ক্ষেত্র নেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিভাগ বাড়লেও বাড়েনি শ্রেণিকক্ষ ও পর্যাপ্ত ল্যাব। এছাড়া সুস্থ রাজনীতি চর্চার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ইকসু) শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-গবেষণায় অবদান রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইলের ভূমিকা অনেক। প্রতিষ্ঠার ৪১ বছরেও যা শিক্ষার্থীদের ভাগ্যে জুটেনি। প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল না থাকায় অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তাই কেউ কেউ বিশেষ বিভাগের শিক্ষকদের ই-মেইল ব্যবহার করে থাকেন।

এদিকে ৪২ তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ২১ দফা দাবি জানিয়েছে ছাত্র মৈত্রী ইবি শাখা। তাদের দাবিসমূহ হলো- পাঠক্রমের আধুনিকায়ন, সকল প্রকার বর্ধিত ফি প্রত্যাহার, গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধি, শিক্ষাবৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি, ক্যাম্পাসে শতভাগ উচ্চগতির ওয়াইফাই, প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল প্রদান, মেধার ভিত্তিতে হলে সিট বরাদ্দ এবং হলে পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হলে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন।

সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ, শিক্ষাত্তোর সার্টিফিকেট উত্তোলন পদ্ধতি সহজ ও আধুনিকায়ন করণ, প্রত্যয়নপত্র উত্তোলনে বিনামূল্যে প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ইকসু) গঠন ও নির্বাচন, বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ আবাসিক করণ, পরিবহন সমস্যার স্থায়ী সমাধান, অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি অপসারণ, কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া ও হলের ডাইনিংয়ে খাবার ও পরিবেশের মান বৃদ্ধি।

শিক্ষার্থীদের ব্যবহার্য টয়লেট সংস্কার, গণতান্ত্রিক সকল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ এবং ক্যাম্পাসে স্বাধীনতাবিরোধী ও মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করণ, সকল ধর্মাবলম্বীদের জন্য পৃথক উপাসনালয় নির্মাণ, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ১৫ কি.মি/ঘন্টা নির্ধারণ, বহিরাগতদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রমের বিকাশে পদক্ষেপ, শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তপূর্বক দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতকরণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পর থেকে মোট ১২ জন ভিসি দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৩ তম ভিসি প্রফেসর ড. শেখ আবদুস সালাম দায়িত্ব পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য শুধু সমুন্নত রাখাই নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আরও বেশি করে মনোনিবেশ করবেন।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাটতি তলিয়ে দেখে পরিপুষ্ট করার পথে এগিয়ে যেতে হবে। এছাড়া কিছু উন্নয়নমূলক প্রজেক্ট বাস্তবায়ন ও কয়েকটি নতুন হল তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নতুন হল তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি আবাসিক সমস্যা নিরসনে একধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশা রাখি। এসময় তিনি একুশ শতকের উপযোগী করে শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদরূপে গড়ে তোলা, স্বচ্ছতার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেন।

আজাহার ইসলাম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ঢাকা, ২১ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)/বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।