বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রত্যাশা


Published: 2021-05-01 16:26:40 BdST, Updated: 2021-05-08 04:59:37 BdST

জনগণের মৌলিক অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং দেশের চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৮ সালের ৩০শে এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে তৎকালীন আইপিজিএমআর-কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উন্নীত করার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম স্বতন্ত্র পাবলিক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন বলে জানান, অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

চিকিৎসা শিক্ষায় স্নাতকোত্তর কোর্সে অধ্যয়ন ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার প্রথম তিন তারকা শাহবাগ হোটেলের জায়গায় ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমআর) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্ন্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার দায়িত্ব প্রাপ্ত হলেও এই প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা ছিল না। ডিগ্রি প্রদান করতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আইপিজিএমআরসহ অনেকগুলো চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের এমবিবিএস ডিগ্রি প্রদান করতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আইপিজিএমআর এর প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. এম এ কাদেরীর সময় প্রথমে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) (ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্র্রার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। পরে পরিচালক (হাসপাতাল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। পাবলিক হেলথ ফ্যাকাল্টির ডিনের দায়িত্বও পালন করি। দীর্ঘদিন সিন্ডিকেট সদস্য ও একাডেমিক কাউন্সিলের দায়িত্ব পালন করি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করি এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলাম আমি।

২০১৫-২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। সর্বশেষ গত ২৯শে মার্চ প্রধানমন্ত্রী আমাকে আগামী তিন বছরের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। এমন এক কঠিন বিপর্যস্ত সময়ে আমি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি যে সময় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত। আমি যেন এই কঠিন সময়ে আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেশবাসীর কাছে এই দোয়া কামনা করি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আর ২ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক পুনর্বাসন ও উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামকে তৎকালীন আইপিজিএমআর-এর উন্নয়নের সার্বিক দায়িত্ব প্রদান করেন। দেশে চিকিৎসা শিক্ষায় উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা প্রবর্তন করে দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতে বঙ্গবন্ধু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

এদেশের মানুষের রক্তের প্রয়োজনে নিরাপদ রক্ত সরবরাহ ও নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য বঙ্গবন্ধু তৎকালীন আইপিজিএমআর-এ প্রথম ব্লাড ব্যাংক স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে এই ব্লাড ব্যাংকের উদ্বোধন করেন, আজো বঙ্গবন্ধুর হাতের ছোঁয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে বিদ্যমান। বঙ্গবন্ধুই প্রথম এদেশের চিকিৎসকদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে তাদের চাকরি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে তৎকালীন সময়ে দেশের ১৩টি সরকারি ও ৫টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং নিপসমসহ ৫টি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশের চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও সেবার মান উন্নয়নের যথেষ্ট ভূমিকা পালনে সক্ষম হচ্ছিল না। বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন দেশে একটি স্বতন্ত্র ও গবেষণা সমৃদ্ধ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও সকল মেডিক্যাল কলেজের স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছিল।

এখানে উল্লেখ্য যে, ’৬৯ এর ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দেয়া ১১ দফার মধ্যেও চিকিৎসকদের দাবির কথা উল্লেখ ছিল। বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ও আইপিজিএমআর শিক্ষক সমিতি একটি স্বতন্ত্র ও গবেষণা সমৃদ্ধ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। প্রত্যেকটি সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারায় নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ায় এদেশের চিকিৎসক সমাজ জনগণের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নে তাদের সকল প্রত্যাশা পূরণের ভরসাস্থলের সন্ধান পান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা এদেশের চিকিৎসক সমাজের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবি যেমন বাস্তবায়ন করেছেন, তেমনি এদেশের উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রযাত্রার সূচনা করেন। বাংলাদেশের প্রথম স্বতন্ত্র পাবলিক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অবদান চিকিৎসক সমাজ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে চিরদিন স্মরণ করবেন।

এ ছাড়াও তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মরহুম সালাহউদ্দিন ইউসুফ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম আমানুল্লাহ ও স্বাস্থ্য সচিব মোহাম্মদ আলীর অবদান উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য তৎকালীন বিএমএ মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু, অধ্যাপক ডা. কাজী শহিদুল আলম, ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, ডা. কামরুল হাসান খান, ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া, ডা. জাহিদ হোসেন (শিশু কার্ডিওলজি), প্রয়াত ডা. জাকারিয়া স্বপনসহ আরো অনেকের অবদানও চিকিৎসক সমাজ কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রাখবে।

এদেশের জনসাধারণের বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আবারো ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সেলেন্সে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের জন্য প্রধানমন্ত্রী বারডেম সংলগ্ন বেতার ভবনের জমি ও হাসপাতালের উত্তর পার্শ্বের ১২ বিঘা জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত করে দেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে ৫২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সহায়তা ও দিকনিদের্শনায় খুব দ্রুত নতুন কেবিন ব্লক সম্প্রসারণ, অনকোলজি ভবন, নতুন বহির্বিভাগ, আধুনিক আইসিইউ, ওটি কমপ্লেক্স, মেডিক্যাল কনভেনশন সেন্টার নির্মাণ সম্ভব হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেল গঠন করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা অল্প খরচে করা এবং আলাদা কেবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে চান্স প্রাপ্ত বেসরকারি ছাত্র-ছাত্রীদের মাসিক সম্মানী ১০ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কোরিয়া সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ৭০০ শয্যা বিশিষ্ট কোরিয়া মৈত্রী বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যা এ সরকারের আরো একটি সাফল্য।

গত ২৯শে মার্চ যোগদান করার পর থেকে এ পর্যন্ত আমি অনেক বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছি। তার মধ্যে অন্যতম হলো আইসিইউ বেডসংখ্যা বাড়ানোসহ বেতার ভবনে নতুন করে করোনা রোগীদের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি। আউটডোর-১ এবং আউটডোর-২ এর মাঝের রাস্তা রিকশা এবং সিএনজি মুক্তকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে গাড়ি পার্কিং মুক্তকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জোরদার ইত্যাদি। প্রশাসনিক কাজে গতি বাড়াতে কিছু প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন এনেছি। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য যা যা করা দরকার তা করবো। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের বুকে একটা রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবো এই হলো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ভিসি হিসেবে আমার অঙ্গীকার।

উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান, শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সংযুক্তির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশা সবার। সবাই মিলে যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত এই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সফল হবেই ইন্‌শাআল্লাহ। কার্টেসি: মানবজমিন

ঢাকা, ০১ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।