রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভাবনা!“বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেরই একটা অংশ মেজর সিনহা”


Published: 2020-08-21 19:07:43 BdST, Updated: 2020-11-27 22:19:44 BdST

রাশেদ রাজন, রাবি: গুম, বন্দুকযুদ্ধ কিংবা ক্রসফায়ার এই শব্দগুলোর সাথে এদেশের সর্বস্তরের মানুষ শুধু পরিচিত নয় খুবই শংকিত ও আতংকিতও বটে। পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যাকাণ্ডের পর পুনরায় সমালোচনায় আসে চলমান বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, ক্রসফায়ার কিংবা বন্দুকযুদ্ধের বিষয়গুলো।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য বলছে, গত দুই দশকে বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ৪০০২ জন। এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য জানিয়েছে শুধু এবছরেই ২০৭জন এই বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।

বিচার বহির্ভূত বেশিরভাগ হত্যাগুলো পুলিশ ও র‌্যাব করে থাকলেও সেনাবাহিনীসহ দেশের নিরাপত্তায় নিয়জিত প্রতিটি নিরাপত্তাবাহিনীই এধরণের হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। যে বিষয়টি একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের জনগনের কাছে কাম্য নয়। আর তাই পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যার বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের মন্তব্য তুলে ধরা হলো।

রাবির ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মাহমুদুল মিঠু ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, “স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরেও “আইন সবার জন্য সমান” এই কথার যথার্থতা প্রমাণে সরকার ব্যর্থ। একজন সাবেক মেজর ও চৌকস সেনা অফিসার মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে কতটা অসহায় আমরা। সুবিচার আমরা পেতাম, যদি সুশাসন থাকতো।

কিন্তু পুলিশকে অতীতের নির্বাচনে নগ্নভাবে ভোট চুরিতে ব্যবহার করার কারণে স্রোতের বিপরীতে থাকা সরকার এখন জনগণের সেবক খ্যাত বাংলাদেশ পুলিশের নিকট জিম্মি। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সাধারণ জনগণ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। সরকার চাইলেও অদৃশ্য গোপন আতাতের কারণে এসব ধামাচাপা দিয়ে মেগা বাজেট, প্রকল্প, লোক দেখানো উন্নয়নের গালগল্প শুনিয়ে টিকে থাকতে মরিয়া।

আজ শুধু সিনহা প্রথিতযশা পরিবারের সদস্য ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা হবার কারণেই আলোচিত, কিন্তু হাজারো সিনহা সাধারণ জনগণ হবার কারণে হারিয়ে গেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের বলির পাঠা হিসেবে। একজন ছাত্র ও নাগরিক হিসেবে, প্রতিটি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিচার চাই।”

রাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থী প্রসেনজিত কুমার ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, “মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে এখন সবাই নিশ্চিত এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ড। এই হত্যাকাণ্ড একজন মানুষ হিসেবে আমাকেও ভাবিয়েছে। কিছুদিন ধরে দেখছি বিভিন্নজন বিভিন্ন ভাবে এই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছেন। এই জিনিসটা আমাকেও ভাবাচ্ছে। এর আগেও অনেক হত্যাকাণ্ডকে এভাবে বৈধতা দেয়া হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের পর আমার চাওয়া!

১. জাতীয় কমিটি করে পুলিশের বিরুদ্ধে গণ অভিযোগ নেয়া হোক।

২. পুলিশের ওয়েবসাইটে তাদের সকল কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব এবং আয়কর হিসাব প্রকাশ করা হোক।

৩. মেজর সিনহা সহ পুলিশের হাতে বিনা বিচারে যত হত্যাকান্ড হয়েছে তার তদন্ত করা হোক।

৪. মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের সাথে যারা জড়িত সবাইকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হোক।”

রাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শাকিলা খাতুন ক্যাম্পাসলাইভকে জানিয়েছেন, “শুধু খুন নয় ধর্ষণ বলেন অথবা দুর্নীতি এবিষয়গুলো নিয়ে যে নিউজগুলো দেখি এর সাথে জড়িতদের কি কখনো বিচার হয়েছে? আমি কখনো দেখিনি। এই কারণেই ক্রসফায়ার, খুন, গুম, হত্যা, ধর্ষণ এবং দুর্নীতি ঘটতেই আছে। বিচার বহির্ভূতভাবে অনেক মানুষ খুন হয়েছে, অনেক খুন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ সোচ্চার ছিল তাদেরও বিচার হয়নি।

মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ড এর ব্যতিক্রম কিছু না। দীর্ঘ দিন ধরে যে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমগ্র দেশে আছে তারই একটা অংশ হলো মেজর সিনহা। মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এটা প্রমাণ হয় যে, যে যত বড়ই হোক না কেন, সে প্রশাসনের যত বড় যায়গায় থাকুক, যেখানেই থাকুক, ব্যক্তিগত অবস্থানই বলেন কিংবা সামষ্টিক কোন অবস্থানই বলেন, সে যে বিচার হীনতার সংস্কৃতির কবলে পড়বে না তার কোন নিশ্চয়তা নাই।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি উপায় সেটি হচ্ছে ছোট কিংবা বড় যে অপরাধই হোক না কেন অপরাধিকে বিচারের আওয়তায় নিয়ে আসতে হবে।”

রাবি শাখা বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মহব্বত হোসেন মিলন ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, “মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা না। রাষ্ট্রবাহিনী কর্তৃক চলমান বিচার বহির্ভূত হত্যকান্ডেরই একটা অংশ।

মেজর সিনহাকে ক্রসফায়ারের ঘটনাটাতে আমরা দেখলাম এই হত্যার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা স্রেফ তাদের ক্ষমতার দাপটই প্রদর্শন করেছে। সিনহা আসলে অপরাধি কিনা আমরা কেউ জানি না, সে যদি অপরাধিও হয় তবু তাকে ক্রসফায়ার করার অধিকার পুলিশকে দেওয়া হয়নি, বরং বিচারক তদন্ত সাপেক্ষে এর রায় দেবে।

কিন্তু আমরা দেখছি রাষ্ট্রবাহিনী নিয়মিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে নৈরাজ্য তৈরী করছে। যা ফৌজদারি অপরাধ। ফলে ছাত্র ফেডারেশন দাবি করে সিনহা হত্যাসহ সকল বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে।”

রাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মুর্শিদুল আমলম ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, “আমি মনে করি মেজর সিনহা ওসি প্রদীপ কিংবা সরকারের গোপন কোনো সেনসিটিভ বিষয় জানতেন, যেটি প্রকাশিত হলে সরকারের ইমেজ ক্ষুন্ন হতো এবং দেশের ভাবমূর্তি মানুষের কাছে উম্মচিত হতো। যার কারণে কর্তাব্যক্তিরা তাঁকে পরিকল্পিত ভাবেই হত্যা করেন। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এর বিচার দাবি করি।”

রাবি প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারন সম্পাদক ইমদাদুল হক সোহাগ মনে করেন, “যিনি স্বপ্ন দেখতেন এদেশকে নিয়ে, তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে, বিশ্বভ্রমণ করে অজানাকে জানবার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। ঘাতকের বুলেটে হত্যা করা হলো তরুণ, মেধাবী ও সর্বদা পজিটিভ চিন্তার একজন মানুষ অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদকে।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে দোষীদের কঠোর শাস্তির নিশ্চিত করার দাবি জানাই। মেজর সিনহা যেন হয় শেষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড।”

রাবি শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক সুলতান আহমেদ রাহি ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, “অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অনন্য নজির।

দেশে গত ১০ বছরে বিএনপির ৭৭২ জন নেতাকর্মী হত্যা ও ২০২ জন গুমের শিকার হয়েছেন সাথে পিলখানায় মেধাবী ও চৌকশ ৫৭ জন সেনা অফিসার সহ মোট ৭৪ জন কর্মকর্তা হত্যা যা এদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কবলে পড়ে নিহত হয়েছেন মেজর সিনহা।

৭৫‘এর রক্ষী বাহিনীর সাথে বর্তমান দলকানা প্রশাসনের কোনো অমিল নেই। তাই দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্বৈরাচার হঠিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই।

মেজর সিনহা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসএসএফ এর সদস্য ছিল যে পদের জন্য সবাই মুখিয়ে থাকেন তিনি কেন এই পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে গেলেন? অবসরে যাওয়ার ২ বছরের মাথায় কেন তাকে হত্যা করা হলো? এগুলো জনগণের সামনে উন্মোচন করতে হবে।”

ঢাকা, ২১ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।