মেজর সিনহার হত্যা নিয়ে মাদারীপুরের শিক্ষার্থীরা যা ভাবছেন


Published: 2020-08-20 18:48:05 BdST, Updated: 2020-11-27 23:00:52 BdST

কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যাকান্ডটি হবার পর বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যার বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে। তার হত্যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের চিন্তা ভাবনা নিয়ে তাদের সাথে কথা বলেছেন ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকমের কবি নজরুল সরকারি কলেজ (কেএনজিসি) প্রতিনিধি ইমরান হোসেন

মুকুল হোসেন তৃতীয় বর্ষ (সম্মান) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে সরাসরি বলেন, করোনার মহামারীতে পুলিশ বাহিনী সহ অন্যান্য বাহিনী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভুমিকা পালন করেছে, সেই ক্ষেত্রে তারা প্রশংসার দাবিদার। পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে মানুষের তথাকথিত ধারণারও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এসবের মাঝেই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো: রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবারও মানুষের আস্থায় আঘাত হেনেছে।

এই হত্যাকাণ্ডের বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যাবে যে, আইনের শাসনের দুর্বল অবস্থানের কারণেই এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখা গেছে যে, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ এর আগেও এই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি।

মুকুল হোসেন

 

আবার দেখা গেছে যে, সে কয়েকটি সহযোগিতামূলক সংস্থার সাথে জড়িত। আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি দেখেছিলাম, জাতীয় শ্রমিক লীগ টেকনাফ থানার ব্যানারে একটি মিছিলের ছবি। ব্যানারের বক্তব্য ‘ওসি প্রদীপ কুমারের বিকল্প নেই’। মধ্যযুগে আইন প্রয়োগ সম্পর্কে একটা রীতি চালু হয়েছিল তা হল, "মানুষ যদি কোনো অপরাধ করে তাহলে, তার পূর্বের কোনো ভালো কাজ সেই অপরাধের বিচারকে প্রভাবিত করলে বিচার সঠিক হবে না।"

প্রদীপ কুমার দাশ তার হয়তোবা সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থেকে অথবা অর্থ ব্যয়ে জনপ্রিয় হয়ে তার অপকর্ম চালিয়ে গিয়েছে। আর সেই অপকর্মের বিচার প্রভাবিত হয়েছে তার পূর্বের কোনো কর্ম দ্বারা। ২০১৮ সালেই দুদক প্রদীপ কুমারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিপরীতে দেখা যায় তার মৎস্য খামার থেকে বছরে আয় কোটি টাকা।

ডিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,"২২ মাসে ১৪৪টি কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছেন ২০৪ জন। 'ক্রসফায়ারে’র ভয় দেখিয়ে তিনি অবৈধ টাকা আয় করতেন।" এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি এর হাত থেকে হয়তো দ্রুত নিস্তার পাওয়া সম্ভব নয়, তবে আশা করি যথাযথ আইনের মাধ্যমে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সমাধান করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবদান রাখবে।

হাসান মিয়া চতুর্থ বর্ষ (সম্মান) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে স্বইচ্ছায় বলেন,
আমি মনে করি, মেজর সিনহা হত্যাকান্ডটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। ওসি প্রদীপ কুমার চেয়েছিলেন, ডাকাত সন্দেহে গ্রামবাসীর সাহায্যে গণপিটুনিতে হত্যা করবেন মেজর সিনহাকে, অন্যথায় তার চিরাচরিত প্রথা ক্রসফায়ারে দিবেন।

হাসান মিয়া

 

আমরা ওসি প্রদীপের অপকর্মের ব্যাপারে সবাই অবগত, তার কাছ থেকে নিস্তার পায় নি এলাকার কমিশনারও, অনেকেই চুপ করেছিলেন তার ভয়ে। এখনই উপযুক্ত সময় এদের মতো দেশদ্রোহীদের শাস্তি দেয়ার, যারা সরকারের টাকায় খেয়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব তৈরী করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এই হত্যাকান্ডের দ্রুত বিচার হওয়া উচিত এবং সরকার যে বলে অপরাধীকে তারা পদের মাধ্যমে নয় অপরাধী বলে চিনেন, তারই বাস্তবায়ন করা উচিত।

মোঃ খালিদ হাসান বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার হত্যার ঘটনা মূল রহস্যের অনেক কিছু এখন ও আমাদের কাছে ধোয়াসা। তবে যেটুকু ঘটনা সবার সামনে এসেছে তা থেকে খুব সামান্যই অনুধাবন করতে পারি আমরা।

আসলে প্রতিটি খারাপ ঘটনাই একটি দুর্ঘটনা কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার পরে এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে যে কারণ গুলো বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে ওই দুর্ঘটনার পিছনে মূল ঘটনা, যেগুলোর সমষ্টিতই হলো কোনো বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। কোন কোন দুর্ঘটনা অনিচ্ছাকৃত আবার কোনো কোনো দুর্ঘটনা পরিকল্পিত। তবে পরিকল্পিত কোন ঘটনা তৈরি হলে সেটাকে আর দুর্ঘটনা বলা যায়না।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের সাথে ওই দুই কর্মকর্তার ফাঁস হওয়া ফোনালাপে প্রদীপ কুমরাই যে গুলির নির্দেশদাতা তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।এখনও পর্যন্ত যেসব তথ্য বের হয়েছে তাতে স্পষ্ট এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। বিশেষ করে তিন পুলিশ কর্মকর্তার ফোনালাপে বিষয়টি এখন একেবারেই পরিস্কার। পুলিশের বর্ণনা মতে সিনহা গুলি করতে উদ্যত হয়েছেন।

কিন্তু তার আগেই পুলিশ তাকে পরপর চারটি গুলি করে।গুলিতে তিনি মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ার পরও তাকে সেখানে দীর্ঘসময়ে ফেলে রাখা হয়। তাকে বাঁচাতে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার মতো কোন মানবিক আচরণ পুলিশ দেখাতে পারেনি ।এতেই অনুধাবন করা যায় স্পটে থাকা পুলিশদের প্রকৃত চিন্তা। একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজরের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সাধারন জনতার নিরাপত্তার কথা আর কি বলার আছে।

হয়তো কত নিরপরাধ মানুষকে এভাবে বলি হতে হয়েছে এই নির্মম ক্রোধের কাছে ক্রসফায়ার নামক এক সিস্টেম এর মাধ্যমে। আমি এক্ষেত্রে শিপ্রা দেবনাথ কিংবা সিফাত এর ব্যাপারে কিছু বলতে চাচ্ছি না কেননা এ ব্যাপারে এখনও তদন্ত চলছে কাজেই কোনো এক পক্ষ এ কথা বলা ঠিক না হতে পারে তার ওখানে মাদক পাওয়া গিয়েছিল অথবা এটাও হতে পারে তা পরবর্তীতে লিয়াকত আলী ও এর সাথে জড়িত আরও কিছু সন্দেহ ভাজন পুলিশ এর সাজানো নাটক এই খুনের মোটিভ ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য।

মোঃ খালিদ হাসান

 

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার হত্যার পর পর ই বেরিয়ে আসছে টেকনাফ থানার ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার এর সকল কুকীর্তি এবং দায়িত্বশীল কিছু পুলিশ অফিসারদের তার ইন্ধনে ফুলেফেঁপে ওঠা মানুষের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের নজিরবিহীন চিত্র ।তবে আইনের গন্ডিতে থেকে এই অপরাধগুলো মানুষের সামনে উঠে আসার জন্য উৎসর্গঃ হতে হলো আমাদের অমূল্য রতন যা মোটেই আমাদের পক্ষে কাম্য ছিলনা।

যাদের হাতেই নিরাপত্তার' চাবিকাঠি তারাই যদি আজ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে মানুষ কার কাছে নিরাপত্তার খোঁজ করবে , নিরাপত্তা অধিকার দাবী করবে ।এখন একটা প্রবাদ উঠে আসছে, পুলিশের হাতে পড়ার চেয়ে ডাকাতের হাতে পরা ভালো কেননা ডাকাতের হাতে পড়লে নিজের অর্থ-সম্পদ খোয়া যায় কিন্তু পুলিশের হাতে করলে এর সাথে সাথে মান-সম্মান টুকরো খোয়া যায়।

‌তবে এটাই ঠিক অবশ্যই পুলিশ-জনতার বন্ধু ছিল আছে এবং থাকবে। এটা একটা মহৎ আত্মোৎসর্গের পেশা এবং সরকারের উচিত এই পেশায় কাউকে প্রবেশ করানোর আগে মেধা এবং শারীরিক যোগ্যতার পাশাপাশি ও জনমানবিকতার যোগ্যতা ও যেন পরীক্ষা করা হয়। আর অবশ্যই যেন বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ এর সুষ্ঠু প্রয়োগ এদেশে চর্চা হয় ।চঞ্চল্যকর খুনের প্রকৃত রহস্য জানতে এবং এর সঠিক বিচার দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন এদেশের ষোল কোটি মানুষ ।

নুসরাত জাহান চতুর্থ বর্ষ (সম্মান) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে চলেছে, প্রায় সব সরকারই "ক্রসফায়ার" এর নামে যে সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড তারই আরেকটা উদাহরণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির দেয়া উপাত্ত অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত কক্সবাজার উপজেলায় ২১৮ টি বন্দুকযুদ্ধ এবং ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে এবং টেকনাফ উপজেলায় এই ঘটনা ঘটেছে ১৪৪ টি।মাদক, দুর্নীতি, চোরাচালান বন্ধের নামে গত প্রায় দুই দশক ধরে এই ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে কিন্তু এভাবে মাদক, দুর্নীতি, চোরাচালান আদৌ নির্মুল হয়েছে কি?

বাংলাদেশের সংবিধান যেখানে মানুষের জীবনের সুরক্ষা দেয়ার কথা বলা হয়েছে সেখানে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড স্পষ্ট ভাবে সংবিধান পরিপন্থী কাজ।আজ একজন সেনাবাহিনীর অফিসার খুন হয়েছে বলে দেশ এত সরব কিন্তু প্রতিদিনই অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় হত্যার শিকার হচ্ছে বহু মানুষ সে খবর আমরা রাখিনা।

নুসরাত জাহান

 

এখন সময় এসেছে বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক গল্প দিয়ে নয়, সত্যকে সামনে এনে সিনহা সহ সকল বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কুশিলবদের শাস্তির আওতায় আনা।অপরাধী যত বড় অপরাধ করুক না কেন আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তার আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই দ্রুত সময়ের ভিতর সিনহা হত্যাকান্ডের বিচার হোক, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।

ঢাকা, ২০ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।