teletalk.com.bd
thecitybank.com
livecampus24@gmail.com ঢাকা | শুক্রবার, ৩রা ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১শে মাঘ ১৪২৯
teletalk.com.bd
thecitybank.com

একটি সাহসী কন্ঠের জীবনাবসান

প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বার ২০২২, ০৪:০১

একটি সাহসী কন্ঠের জীবনাবসান

আজহার মাহমুদ: আকবর আলী খান। একজন সজ্জন ব্যক্তির চিরঅবসান। একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষের বিদায়। মেধা আর মননের দিক থেকে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। অত্যন্ত সাদা-মাটা জীবন যাপনে ছিলেন অভ্যস্ত। তবে তার প্রশাসন ছিলো খুবই কঠোর। আইন, মানবতা, মানবাধিকার সবখানেই তিনি ছিলেন সোচ্ছার। সত্যবাদিতার জলন্ত উদাহরণ। তার কাছে যিনি যেতেন তিনি আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে যেতেন। কোন দুষ্টু লোক ঠাই পেতেন না। তাকে ঘিরে রয়েছে আমার একটি ছোট্র গল্প।

তখন আমি দৈনিক মানবজমিনে কাজ করি। প্রায়ই যেতাম মন্ত্রনালয়ে। স্বরাস্ট্র মন্ত্রনালয় বিট করতাম। একদিন আমাদের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ভাই তার কক্ষে ডেকে পাঠালেন আমাকে। আলাপচারিতায় বললেন আজহার আপনি একজনের ইন্টারভিউ করবেন। আমি বললাম কার? মতি ভাই তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় বললেন, আকবর আলী খান সাহেবের। তিনি তখন মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিব।

পরদিন থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে প্রতিদিন তার কক্ষে যেতে থাকি। কিন্তু কয়েকদিন ঘুরাফেরার পর সাফ জানিয়ে দিলেন তিনি কোন ইন্টারভিউ দিবেন না। তার পিএস (ডেপুটি সেক্রেটারী) আমাকে নিরাশ করেই একথা বললেন। আরো বললেন স্যার কোন সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে চান না। গুনে গুনে ৬ দিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে তার কক্ষে গিয়েছি। কিন্তু সাড়া মিলেনি। সাত দিনের মাথায় তার পিএস বললেন স্যার ইন্টারভিউ দেবেন না তবে আগামী রোববার সকাল ১০টায় আপনার সাথে সাক্ষাত দিতে রাজি হয়েছেন। আর সময় দিয়েছেন ১৫মিনিট। এর বেশী সময় দেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

আমি তো এখবর শুনে মহা খুশি। ঠিক রোববার সকাল ১০টার আগেই মন্ত্রীপরিষদ সচিবের কক্ষে অবস্থান নেই। যেতেই পিএস এসে বললেন ভাই স্যার তো অনেক আগেই এসেছেন। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন। টিক ঘড়িতে যখন ৯টা ৫৯ মিনিট তখন কলিং বেল বেজে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গেই পিএস সাহেব কক্ষে গিয়ে সংবাদ দিলেন স্যার ওই সাংবাদিক সাহেব এসেছেন। আমাকে তার কক্ষে যাবার জন্যে পিএস নিজেই হন্তদন্ত হয়ে এসে নিয়ে গেলেন।

যথারীতি পিএস সাহেব চলে গেলেন। আর খান সাহেব বলে দিলেন কেউ যেন ভেতরে না আসে। আমি আর আকবর আলী খান সাহেব বসা। সালাম বিনিময় শেষে জানতে চাইলেন আমার বিস্তারিত পরিচয়। আমি এতো জাদরেল মানুষের সামনে ভীতু কন্ঠেই পরিচয় দিয়ে দিলাম। তিনি জানালেন আপনার সময় ১৫ মিনিট। আর বললেন আমি কোন ইন্টারভিউ দেব না। এতে আমি স্বাচ্ছন্দবোধ করি না। আর এই পজিশনে বসে কথা বলাও মুস্কিল। এদিকে আমি ভাবতে লাগলাম কোন বিষয়ে কথা বলবো। সব ছাপিয়ে আমি বলতে শুরু করলাম স্যার ছাত্রজীবনের কিছু কথা বলেন।

এবার শুনুন তার গল্পটা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কে রাজাকার আর কে নয় তা নিয়ে রেষারেষি দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে ডেকে এ বিষয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিলে তিনি এর দায়িত্ব আকবর আলি খানকে হস্তান্তর করেন। রাজাকারদের জন্য তখন একটি আইন প্রচলিত থাকায় এবং সে আইনের অধীনে এ তদন্ত সম্ভব নয় বলে আকবর আলি খান নির্দেশানুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন পরিবেশন করে তার অসন্তোষের কথা উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে তার নোটসহ তদন্ত প্রতিবেদন তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে গেলে তিনি বিষয়টি অনুধাবন করেন। তিনি শিক্ষামন্ত্রীকে ডেকে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়ে বলার পরামর্শ দেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, যখনই যা আমার কাছে পছন্দ বা আইনসিদ্ধ মনে হয়নি আমি লিখিত নোট দিয়েছি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা বলছে যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা গৃহীত হতে বাধ্য।

এবার অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে তার শিক্ষাজীবন বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল জীবনের কথা শুরু করলেন। আর আমি ওই কথার সূত্রধরে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করতে থাকলাম। আমি তাকে বিশ্বদ্যিালয় জীবন থেকে বের করে পিএইচডির গল্পও করতে ছাড়িনি। মাঝে মধ্যে সেই পুরানো অভ্যাস প্রশ্নতো করছিই। তিনি খোশগল্পে মেতে উঠে জবাবও দিতে থাকলেন।

কিছু প্রশ্ন ছিলো রাস্ট্রীয়। একেবারে একান্ত। কিন্তু উপস্থাপন করেছি হাসতে হাসতে। স্বাভাবিকভাবে। ওই খবর প্রকাশ করার মতো নয়। সমস্যাও আছে। বেশ কিছু বিষয় ছিলো যা লেখা হয়নি কিন্তু জেনেছি। টাটকা খবর। তাজা খবর। এগুলো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সিনিয়র কয়জন মন্ত্রীই কেবল জানতেন। শীর্ঘ কয়জন রাজনৈতিক নেতাও জানতেন। সব খবর কি লেখা যায়। প্রচার করতেও মানা। এসব তথ্য-খবর প্রচারের বিষয়টি আজ নাইবা বললাম।

আমি কিন্তু নাছোর বান্দা হাল ছাড়িনি। এভাবে আমার গোপন মিশন ও ভিশনের সব প্রশ্নই শেষ করলাম। আর এক ঘন্টা পর স্যারকে (মজা করার উদ্দেশ্যে বললাম স্যার আমার আরেকটা কাজ আছে) তখন তিনি ঘড়ি দেখে আপসোস করে বললেন এটা কেমন হলো কথা তো শেষ হয়নি। আর আমি এজন্য কোন সাংবাদিককে ইন্টারভিউ দিতে চাই না। এভাবে এক ঘন্টা ২০ মিনিট সময় দিয়ে নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে এলাম। আসার পথে পিএস বললেন এটা কেমন করে সম্ভব। স্যার তো খুই কঠিন লোক! এতো সময় দিলেন আপনাকে!

মনে পড়ে তখন মানবজমিনের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন শহীদুল আযম ভাই। অফিসে গিয়ে ওই গল্পটা মতি ভাইকে বললাম। তিনি আমাকে দ্রুত লিখতে বললেন। আমি দ্রুত লিখে ডেস্কে দিয়ে দিলাম। সন্ধ্যার আগে মতি ভাই আবার তলব করলেন। বললেন সব তো আর লেখা যাবে না। কিছু রেখে দিলাম। চারদিকে হৈচৈ পড়ে যাবে। আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম তাই করেন। সেদিন প্রথম পাতায় লীড হলো। ততক্ষনে খবর হয়ে গেল সচিবালয়ে। আমাকে কল করলেন আজকের প্রয়াত প্রিয় মানুষটি (আকবর আলী খান)। আমি স্বাভাবিকভাবে সালাম দিতেই বললেন আজহার সাহেব আপনাকেতো আমি ইন্টারভিউ দেই নি। আপনি কি করলেন।

সেই পরম জ্ঞানী মানুষটিকে বললাম স্যার কোথাও কি বলা আছে আমাকে আপনি ইন্টার ভিউ দিয়েছেন। অথবা তিনি মানবজমিনকে বলেন? তিনি বললেন না। সে আরো অনেক কথা। সব শেষে বললেন অনেক বুদ্ধি করে আমার কাছ থেকে সব কথাই বের করলেন। তবে প্যাটার্নটা ভিন্ন। আবেদনটাতে খাটিয়েছেন উচু মানের কৌশল।

তিনি আর আজ নেই। যখনই দেখা হতো তিনি বলতেন আপনি খুবই কৌশলী। তো কেমন আছেন। স্যারকে বার বার বলতাম স্যার তুমি করে বলেন। এ সময় তিনি বলতেন ওকিছু নয়। তিনি আজ চলে গেলেন পৃথিবীর সকল মায়াজাল ছেড়ে। সকল সম্পর্ককে পাশ কাটিয়ে স্রস্টার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তার পরকালীন জীবনের সুখ্যাতি ও মহাশান্তির জগতে যেন স্রস্টা তাকে ঠাই দেন সেই প্রত্যাশা রইলো।

তার জস্ম ১৯৪৪ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ইতিহাস, কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি। পিএইচডি গবেষণাও অর্থনীতিতে। আমলা হিসেবে পেশাজীবনের প্রধান ধারার পাশাপাশি চলেছে শিক্ষকতাও। অবসর নিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে। এরপর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন, দায়িত্ব পালনের সময় প্রতিবন্ধকতার মুখে করেছেন পদত্যাগ। অবসরের পর তাঁর আবির্ভাব ঘটেছে পূর্ণকালীন লেখক হিসেবে। অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা, সাহিত্য—বিচিত্র বিষয়ে তাঁর গবেষণামূলক বই পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে একই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন। আকবর আলি খান চৌকস আমলা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অবসর নিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদসচিব হিসেবে। অবসরের পর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি।

আকবর আলি খান ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন। পরে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়ার আশঙ্কায় তিনজন উপদেষ্টার সঙ্গে তিনিও একযোগে পদত্যাগ করেন। আকবর আলি খান রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

আকবর আলি খান ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন হবিগঞ্জ মহুকুমার প্রশাসক (এসডিও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় তিনি সক্রিয়ভাবে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কাজও করেন। এতে ক্ষুব্ধ পাকিস্তান সরকারের আদালত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই তাঁকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন। বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদসচিব হিসেবে অবসরের পর আকবর আলি খান লেখালেখিতেই পূর্ণ মনোযোগ দেন। অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা, সাহিত্য বিচিত্র বিষয়ে তাঁর গবেষণামূলক বই পাঠকপ্রিয় হয়েছে। আকবর আলি খানের সর্বশেষ আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘পুরানো সেই দিনের কথা’।

আকবর আলি খানের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৭টি। এরমধ্যে অর্থনীতি বিষয়ে তার দুই বই ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ এবং ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’ পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। অর্থনীতির বইয়ের বাইরে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের এবং তার সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক বই লিখেছেন। জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, বাংলায় ইসলাম প্রচার এবং দেশকে নিয়ে বই লিখেছেন। 'পুরানো সেই দিনের কথা' তার সবশেষ আত্মজীবনী গ্রন্থ।

তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে 'ডিসকভারি অব বাংলাদেশ', 'দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ', 'অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি', 'চাবিকাঠির খোঁজে: নতুন আলোকে জীবনানন্দের বনলতা সেন', 'দুর্ভাবনা ও ভাবনা : রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে', 'বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ', 'ফ্রেন্ডলি ফায়ারস', 'হাম্পটি ডাম্পটি ডিসঅর্ডার অ্যান্ড আদার এসেস' ও 'গ্রেশাম'স ল সিন্ড্রম অ্যান্ড বিঅন্ড' পাঠকপ্রিয় হয়েছে।

ঢাকা, ০৯ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


আজকের সর্বশেষ