অন্তর্জালের ঈদ এবং বিক্ষিপ্ত অনুভূতি


Published: 2021-05-14 17:40:33 BdST, Updated: 2021-06-18 09:22:33 BdST

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল: মনটা ভাল নেই। আজ খুশির বার্তা সমেত ঈদুল ফিতর সারাদেশময় পালিত হচ্ছে। সবার ঘরেই নানা পদের বাহারি খাবার এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুখে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টা। যেখানটায় সামাজিকতা আবেগ ভালবাসার অনেকটুকু গরহাজির। করোনার ভয়াল থাবায় এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের লাগামহীন প্রসারতায় বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে কোথায় যেন শূন্যতা এবং হাহাকার। এমন ঈদ কি আমরা চেয়েছিলাম? যেখানটায় মমতাময়ী মায়ের মায়াবী অনুভূতি পরশ ও ভালোবাসা থেকে স্বাস্থ্যবিধি ও ব্যস্ততার অজুহাতে বঞ্চিত।

সত্যিই এমন ঈদে আনুষ্ঠানিকতা থাকলে ও অনুভব মনন ও আত্মিক কল্পনায় যেন কোন প্রভাব ফেলতে পারছে না।প্রযুক্তির প্রসারে সবকিছু হাতের নাগালে এবং স্পর্শে সংযুক্তি প্রাপ্তির সুযোগে ও মায়ের ভালোবাসা পড়শীর সাথে মেলামেশা আত্মীয়-স্বজনের সাথে মোলাকাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে সত্যি ই আজ নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে। ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। আমরা কি সামাজিক জীব? এ কিসের ঈদ? এ কেমন অনুভূতিহীন অনেক শুভেচ্ছা ও প্রতিক্রিয়া প্রাপ্তি? এ যাত্রায় এসব মানতে কষ্ট হয়।

পারিবারিক জীবনে একান্ত ই বাধ্য হয়ে বেশ কয়েকবার কর্মস্থলে ঈদ উদযাপনের সুযোগ এসেছে যা অনেকের মাঝে স্বস্তি ও সুখের আবহ তৈরি করলে ও প্রতিবারই নিজেকে খাপছাড়া বেমানান এবং নির্জীব লেগেছে যা প্রকাশে ও কষ্ট হয়। এ বছর জীবনে প্রথমবার ঈদুল আযহা সিলেটে পালনে অন্তত এ পণ করেছি সামনে যত ই অসুবিধা এবং প্রতিবন্ধকতা থাকুক না কেন আমার জন্মভূমি মা এবং পড়শীর মাঝেই এর যথার্থতা খুঁজবো।

এবারের ঈদ আমাদের কাছে অনেকটুকু ই ব্যাতিক্রম। যেখানটায় কুলাকুলি ঈদগাহে সাম্য ভ্রাতৃত্বের আলিঙ্গনকে পরিহার করে মুখবন্ধনী সমেত নিজেকে শারীরিকভাবে সুস্থ রেখে মানসিকভাবে রুগ্ন করে ফেলছি। যেখানটায় ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষের উপর হায়েনার থাবা, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের জন্য মানুষের প্রাণপণ প্রচেষ্টা, করুনার দ্বিতীয় ধাপে প্রতিবেশী ভারতের বাতাস যেখানে লাশের গন্ধে ভারী হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনায় না ফেরার দেশে চলে গেছে,অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মহীন মানুষের হারের উচ্চগতি এবং মানুষের কান্নায় সারা পৃথিবী অস্থির।এ রকম দৃশ্যপটে আর যাই হোক আনন্দ এবং স্বপ্নীল ঈদ যাপন অনেকটাই বিলাসিতার পয়গাম।

এমন বাস্তবতায় এবারের ঈদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা যা দেখছি তা মৃতপ্রায় বিবেককেও বোকা বানিয়ে ফেলছে। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় চিরায়ত রীতি। যা বিভিন্ন রূপে এবং ঢংয়ে মানবসমাজে দৃশ্যমান। নিজের ওয়ালে একাধিকবার শুভেচ্ছা দেওয়া পরিচিত-অপরিচিত সব মহলে বার্তা পৌঁছানোর বাহুলতা নান্দনিক প্রকাশভঙ্গিতে এর প্রসারতা ও ব্যাপকতা ঘটলে ও আন্তরিকতা এবং অনুভূতিতে যে ভাটা লেগেছে তা চোখে পড়ার মতো।

তবে হ্যাঁ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের আধুনিক জীবনে এক নতুন বাস্তবতা। গ্রামের চায়ের দোকানে মানুষ তথ্যের জন্য এখন আর পত্রিকার পাতা ঘাঁটাঘাঁটি করে না। তার বদলে এসেছে স্মার্টফোন ও আইফোননির্ভরতা। গণমাধ্যমে তথ্যের বিপণনের সাবেকি প্রথা এখন আর নেই। চারপাশে, দেশে-বিদেশে কী ঘটছে, সেগুলো ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, গুগলসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাচ্ছে সবাই।

আমাদের টাইমলাইন, নিউজফিড ভরে যায় প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় সংবাদ, ছবি ও ঘটনায়। ১৩-১৭ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্য ৭০ শতাংশের বেশি অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগ প্রোফাইল রয়েছে। তারা দিনে চার/পাঁচঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের দেশের বহুসংখ্যক মানুষই ফেসবুক ব্যবহার করেন। তারপরও ছাত্র-শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিশু-কিশোর, গৃহিণী, পেশাজীবী- কে নেই ফেসবুকে?

নিজের নামের সাথে বাহারী লকব লাগিয়ে একাধিক পোস্টার সেঁটে ও যখন দিনশেষে কমেন্টস ও লাইকের হাহাকার। যা কিনা স্পষ্টত ই দীনতার ইঙ্গিত বহন করছে।তারপর ও কি আত্মস্বীকৃত পন্ডিতজির এতটুকুন হুশ হচ্ছে? এসব কে ছাড়িয়ে চাটুকারিতা নিজের ক্ষমতার সংশ্লিষ্টতা উপরের হাতের দৌরাত্ম্য এসব বুঝাতে অনেকে বড় ভাই এবং নেতার পক্ষ হয়ে ও আমজনতার দরবারে ইদের শুভাশিস বিলাতে ব্যস্ত। একি দেখছি?অথচ শৈশবে একটা নতুন জামা একখানা ঈদ কার্ড এবং সীমিত মানুষের মাঝে অনুভূতি বিনিময়ে যে স্বর্গীয় সুখানুভূতি পেতাম তা কি এসবে দেখা যায়?

আর্থিক সক্ষমতা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর চাদরে আচ্ছাদিত নানামুখী সুযোগ-সুবিধার সম্প্রসারণ হেন কোনো সম্ভাবনা নেই যা এ শতকে মানব দুয়ারে কড়া নাড়েনি। যে সময়টায় ফোন করা এবং মেসেজের বিনিময় মূল্য হাতের নাগালের বাইরে ছিল, সেই ক্ষণে ও কিঞ্চিৎ অনুভূতি জীবিত ছিল।যা আজ শুকিয়ে যাওয়া বহতা নদীর মতো। আফসোস এমন দিন হয়তো ফিরে পাবোনা। চাইলেও সম্ভব না।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক মোহ ব্যস্ততা সুখের হাহাকার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে যোজন যোজন ফারাক আমাদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা অস্থিরতা হতাশা এবং চাপ দিনকে দিন ভারী করছে। এ কেমন জীবন? যে সমাজে শিক্ষিত সম্প্রদায় বড়ই স্বার্থপর এবং আবেগহীন। প্রয়োজনে সম্পর্ক গড়ে এবং বিপত্তি দেখলে সটকে পড়ে। এর সংক্রমণ থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। যা আমাকে ভাবায়। আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণ ও বটে। এ কারণে মাঝে মাঝে নিজেকে এ সমাজে বড্ড অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।

এবারের ঈদে আবেগহীন এত বেশি শুভেচ্ছা পেয়েছি যার উত্তরে কপি-পেস্টের আশ্রয় নিতে হয়েছে। যা বাহ্যিক উন্নতির সূচক হিসেবে বিবেচিত হলে ও নিজেকে তলাবিহীন ঝুড়ি মনে হচ্ছে। শুভাকাঙ্ক্ষী টাইমলাইনে এ বিষয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তাচ্ছিল্য এবং ক্লেদে সাথে বলেছেন এবার যে পরিমাণ শুভেচ্ছা পেয়েছি তা যদি কারেন্সিতে কনভার্ট করা যেত তাহলে হয়তো বাকিজীবন পায়ের উপর পা নাচিয়ে পার করে দেয়া যেত। মধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের মতো উভয় দিকের টান আমাদের মনে অস্তিত্বে মগজে ভালোবাসায় শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে।

আর যাই হোক এ থেকে চাইলে ও বের হওয়া যাবে না। কারণ আমাদের চাওয়ার যে সীমারেখা নেই। থামতে যে আমরা চাইনা। এ প্রপঞ্চ গুলো বাহ্যিক সুখ দিলে ও অন্তরাত্মায় বিশাল ঝড় তুফান অস্থিরতা তৈরি করছে। নিজের নামে বাহারি পোস্টার শেয়ার করে পন্ডিত ব্যক্তিরা যখন নিজের টাইমলাইনে শেয়ার দেয় তখন উপসংহার টানতে খুব সহজ হয়ে যায়।এ সমাজে পচঁন ধরেছে। এবং রন্দ্রে রন্দ্রে এর শাখা-প্রশাখার বিস্তৃতি ঘটছে।

সামাজিক জীব হিসেবে মূলে ফিরতেই হবে। যেখানে আপনার শেষ যাত্রায় যারা সঙ্গী হবে তাদের সান্নিধ্য ভালবাসা ও আন্তরিকতা পাওয়া যাবে। সহজীয়া পরশী আত্মীয়তার মাঝে অনুভূতির বিনিময় হবে। মায়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে ই তৃপ্তি ও স্বস্তির আয়েশ জাগবে। স্বার্থপর মানসিকতা পরিহার করে প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশার ফারাক কমিয়ে শিখড়ের সাথে সংযুক্ত থেকে পারব কি করে সুখানুভূতি অনুভব করতে? চাইনা আবেগহীন শুভেচ্ছা বিনিময় । প্রয়োজন সহানুভূতি সহানুভূতি এবং ভালোবাসা।

যেখানটায় বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে পরপারে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে পারি।গ্রামের অলিগলিতে হেঁটে সাধারণের ঘামের গন্ধে নিজের অস্তিত্ব খুঁজতে চাই। প্রজন্মের সাথে দাদা বাড়ি এবং নানা বাড়ি বেড়ানোর সুখানুভূতি আগ্রহ তৈরী করতে চাই। গ্রামের ধুলোয় কাঁদায় মেশার অকৃত্রিম শিক্ষণ কৌশল যাতে প্রজন্ম শিখতে পারে সেই মন চাই। প্রভূ আমাকে কম দেয়নি। যোগ্যতার চেয়ে প্রাপ্তি অঢেল। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়া আর কিছুর কি সুযোগ আছে? সম্মান খ্যাতি ভালোবাসা সান্নিধ্য আমাকে প্রায়শঃই আবেগ তাড়িত করে ফেলে। যার কারণে আবেগহীন শুভেচ্ছা আমাকে টানে না। চাই আবেগযুক্ত পড়শ মমতা ও ভালবাসা । যা প্রিয় ছাত্র ছাত্রী স্বজন প্রজন্ম সতীর্থ এবং মায়ের কাছে কেবল আশা করা যেতে পারে।

আমি তোমাতেই বাঁচতে চাই।সচল সতেজ ভালোবাসা এবং স্নিগ্ধতায় ভরপুর ঈদ চাই। শান্তির পৃথিবী চাই। সাম্য ভ্রাতৃত্ব ভেদাভেদ বিহীন সমাজ চাই। যে সমাজের নাগরিক হিসেবে বাকিটা জীবন শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে চাই। মায়ের ভালোবাসার পরশ নিয়ে সামনের দিনে বাঁচতে চাই। ব্যস্ততা জাগতিকতা আমায় ক্ষমা করো। আর যে পারছি না। সবার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে চাই।

লেখকঃ শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]

ঢাকা, ১৪ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।