''স্থানীয় নির্বাচনে শাসক দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব''


Published: 2021-01-16 10:56:56 BdST, Updated: 2021-03-08 20:51:42 BdST

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: ইদানিং যখনই কোন স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন হয়, তখনই আমরা দেখি শাসক দল আওয়ামী লীগের ভেতরকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সহিংস রূপ নেয়। এ পর্যায়ের পৌর নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঠানটুলী ওয়ার্ডে সিটি নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা বাড়ছে। ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগের কাউন্সিল প্রার্থী ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলিতে কর্মী আজগর আলী বাবুল নামে এক দলীয় নেতা নিহত হয়েছেন।

এ ঘটনায় কাউন্সিলর প্রার্থী মাছ কাদেরসহ ২৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এমনিভাবে ভোট চাইতে গিয়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত হোসেনের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা লিয়াকত হোসেন বল্টু (৫০) ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। বুধবার রাত ৯টার দিকে পৌর এলাকার কবিরপুরের ভূইমালী পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। বল্টু ১৩ নং উমেদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।

এমনিতেই আমাদের দেশে নানা ধরনের অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে। তার ওপর স্থানীয় পর্যায়ে এই রক্তাক্ত নির্বাচনী পরিবেশ আমাদের সবার জন্যই উদ্বেগের। এর থেকে মুক্তির উপায় কী দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ও অধিক গণতান্ত্রিক চর্চা? নাকি দলীয় প্রতীকের প্রথা থেকে বেরিয়ে আসা? কেন্দ্রে বা প্রান্তে দলের নানা স্তরের নেতাদের মধ্যে বিরোধ মেটাতে কোন দাওয়াই উপযুক্ত সেটা ভাবতে পারেন নেতৃত্ব

নির্বাচন নিয়ে বিরোধ আর বিদ্রোহ, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন এলেই দলের ভেতর অন্তর্কলহ। আজ অন্য কেন দল নয়, সবচেয়ে বেশি অসহায় শাসক দলের সাধারণ কর্মীরা। তারা আজ জীবন নিয়ে চিন্তিত এবং চরমভাবে বিভ্রান্ত। ক্ষমতাসীন দলের ভেতরকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে ভেস্তে যেতে বসেছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় পর্যায়ের এখন এই নির্বাচনে চলছে প্রচার প্রচারণা। কিন্তু ভোট উৎসব বলতে এক সময় গ্রামগঞ্জের মানুষ যা বুঝত তা আর নেই। নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের উপস্থিতি অনুধাবন করা যায় না। শাসক দল আওয়ামী লীগের গৃহ বিবাদে পরিস্থিতি এত জটিল হয়ে উঠছে যে, স্থানীয় পর্যায়ের এই নির্বাচন সফল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এক তরফা নির্বাচনে ভোট পড়েনা। যেটুকু হয়, সেখানেও ভোটারদের ভয়ভীতিহীন পরিবেশে ভোট দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য।

সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে আমরা পরিস্থিতি খুব একটা ভালো দেখতে পাচ্ছি না। দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ছায়া ফেলছে যেন সর্বত্র। নোয়াখালীতে দলের সাধারণ সম্পাদকের ভাই আব্দুল কাদের মির্জা যখন নিজ দলকেই আক্রমণ করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছেন তখন ঢাকায় দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে বাকযুদ্ধ করছেন, একে অন্যকে বড় দুর্নীতিবাজ প্রমাণের জন্য।

দলের সর্বস্তরে যে পরিস্থিতি বেশ সংঘাতময় তার প্রমাণ এই পৌর ভোট যুদ্ধ। বিভিন্ন জনপদে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে আওয়ামী লীগেরই আলাদা আলাদা গোষ্ঠী। চট্টগ্রাম আর ঝিনাইদহের শৈলকুপা তেমনই দ্বন্দ্বের সাক্ষী হয়ে থাকল।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

 

এসব হামলা প্রতি হামলা কেন তা আমরা জানি। নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, দলের মনোনয়ন পেলেই নিশ্চিত বিজয়, কারণ বিরোধী দলের অবস্থান নেই বললেই চলে। শাসক দলের টিকেট মানেই বিজয়। তাই দলের নমিনেশন চাই, না দিলে বিদ্রোহী প্রার্থী। অশ্লীল এক লোভ পেয়ে বসেছে। দখল চাই আর তার জন্য চাই মেয়র বা কাউন্সিলর পদ চাই। জায়গায় জায়গায় পুলিশ আছে, কিন্তু তাণ্ডব যা চলার কথা তা চলতেই থাকে। ভোটার হয়েও ভোট দিতে যাবেন না বড় একটি অংশ। কিন্তু তবুও এমন সংঘর্ষে নিজ নিজ বাড়ি বা এলাকায় অবস্থান করা সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন এমন পরিস্থিতিতে।

চট্টগ্রামসহ নানা জেলা উপজেলায় আওয়ামী লীগের অন্দরে কোন্দলের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে অশান্তি লেগেই থাকে। বড়দের মধ্যে দলাদলির প্রভাব পড়ছে দলের অঙ্গ সংগঠনেও। চট্টগ্রামে সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে কমপক্ষে ৩৪ জন বিদ্রোহী প্রার্থী আছে আওয়ামী লীগের। তেমনি অন্যান্য জেলার পৌর এলাকায়ও।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন যেন এক ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এই প্রতীক দেওয়া হচ্ছে শুধু মেয়র পদে। অথচ পৌরসভা বা যেকোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান চলে মেয়র ও কাউন্সিলরদের যৌথ নেতৃত্ব ও দায়িত্ব বন্টনের মাধ্যমে। একজন ব্যক্তি দলীয় প্রতীক নিয়ে নিজের বিজয় নিশ্চিত পুরো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মালিক বনে যাচ্ছেন। নির্বাচন যেমন হচ্ছে সংঘাতময়, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনায় এসব জনপ্রতিনিধির মধ্যে লেগে থাকছে বিবাদ আর সংঘাত।

দলীয় প্রতীক না থাকাই শ্রেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। আর এটি যদি বাস্তবতা হয়, তাহলে বাকি পদগুলোতেও নির্বাচন সেভাবেই হওয়া প্রযোজন হয়ে পড়েছে। কোনও নির্বাচন দলীয়ভাবে করতে হলে তা পুরোপুরি দলীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সংশোধিত যে আইনটি করেছে, তার অনেক সংশোধনী প্রয়োজন। মেয়র বা চেয়ারম্যানরা দলীয়, অথচ কাউন্সিলররা নির্দলীয়। এমন এক ব্যবস্থায় যিনি ক্ষমতাসীন দল থেকে মেয়র বা চেয়ারম্যান হবেন, তিনি আসলে কাউকে ভূমিকা রাখার কোনও সুযোগ দিবেন কিনা ভেবে দেখা দরকার।

এমনিতেই আমাদের দেশে নানা ধরনের অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে। তার ওপর স্থানীয় পর্যায়ে এই রক্তাক্ত নির্বাচনী পরিবেশ আমাদের সবার জন্যই উদ্বেগের। এর থেকে মুক্তির উপায় কী দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ও অধিক গণতান্ত্রিক চর্চা? নাকি দলীয় প্রতীকের প্রথা থেকে বেরিয়ে আসা? কেন্দ্রে বা প্রান্তে দলের নানা স্তরের নেতাদের মধ্যে বিরোধ মেটাতে কোন দাওয়াই উপযুক্ত সেটা ভাবতে পারেন নেতৃত্ব।

ঢাকা, ১৬ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।