অযৌক্তিক-যৌক্তিক: প্রসঙ্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের প্রচীন কয়েকটি বিভাগ


Published: 2019-11-04 15:13:28 BdST, Updated: 2019-11-13 20:18:49 BdST

ড. আবু তোফায়েল মো. সামসুজ্জোহা: বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পরাক্রমশালী ভারতের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জয়, মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যের সিনেট প্যানেল থেকে ৪ বছরের জন্য নিয়োগলাভের মতো জমকালো নানা সংবাদের ফাঁকে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বিভাগ থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্তাব্যক্তির একটি সাক্ষাৎকার আমার নজরে পড়েছে এবং এ সাক্ষাৎকারটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের অধীন সংস্কৃত, পালি, উর্দু ও ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এমনকি আরবী বিভাগ না থাকা বিষয়ে মন্তব্য করেছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি দাবী করেছেন যে, এ কয়েকটি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থাকার কোন প্রয়োজন নেই। আমার মতে, এক্ষেত্রে তিনি হয়তো নিজের ব্যক্তিগত অভিমত দিয়েছেন, যদিও তিনি দাবী করেছেন যে অনেক সিনিয়র অধ্যাপকও সে রকমই চান। এখন আমার প্রশ্ন হলো কিভাবে এ সকল বিভাগ প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে?

কারণ হিসেবে কর্তাব্যক্তি বলেছেন যে, ফারসি বিভাগের শিক্ষার্থীরা বাংলায় উত্তর লেখে, সংস্কৃতের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংস্কৃত জানে না এবং অন্যান্য ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ধরে নিলাম ওনার কথা ঠিক! কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো এভাবে যে ঐ সকল বিভাগগুলোর শিক্ষা-কার্যক্রম চলছে তা দেখ-ভালের দায়িত্ব কার? আমি যতটুকু জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি করার জন্য একজন প্রো-ভিসি দায়িত্বপ্রাপ্ত।

তাহলে কি ধরে নেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি তাঁর দায়িত্বপালনে অবহেলা করেছেন অথবা তিনি তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। আমরা কয়েকবছর পূর্বেও দেখেছি কোন বিভাগের ক্লাস ঠিকমতো না হলে অথবা বিভাগের পরীক্ষা দেরিতে শুরু হলে, অথবা কোন বিভাগের ফলাফল দেরিতে প্রকাশিত হলে প্রো-ভিসি মহোদয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক/শিক্ষকগণকে ডেকে পাঠাতেন এবং উল্লিখিত বিষয়ে জবাবদিহি চাইতেন যা প্রায় ৭/৮ বছর ধরে অনুপস্থিত।

আরেকটি বিষয় এখানে ভাবা দরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন বিভাগগুলো (বাংলা ও সংস্কৃত, আরবী ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফারসি ও উর্দু ভাষা বিভাগ) থেকে সৃষ্ট সংস্কৃত, পালি, উর্দু, ফার্সি ও আরবী বিভাগগুলো সমকালীন সময় থেকে বাংলাভাষী শিক্ষার্থীদের যেমন সংশ্লিষ্ট ভাষা শিক্ষা দিয়েছে একই সাথে সে সকল ভাষায় রচিত সাহিত্য থেকে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি পিপাসুদের মনের খোরাকের যোগান দিয়ে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে এখন কি এসব জ্ঞান বিতরণ বন্ধ হয়েছে, নাকি সেগুলো পাঠদানের মতো কোন যোগ্য শিক্ষক নেই? কলা অনুষদের শিক্ষক হিসেবে আমি যতদূর জানি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক শিক্ষক এখনও বর্তমান। আর যদি সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি এমন কোন শিক্ষকের উপস্থিতি একান্তই পেয়ে থাকেন তাহলে প্রশ্ন হলো ঐ সকল শিক্ষক কিভাবে নিয়োগ পেল, আর নিয়োগকর্তাই বা কে ছিলেন? তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, আমড়া গাছ রোপণ করে আমরা আম ফল চাচ্ছি কি-না? এ প্রশ্ন আমার মতো অনেকেরই আছে বলে প্রতিনিয়ত শুনে থাকি।

সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তির আরো একটি বক্তব্য আমার মনে ধরেছে, তা হলো শিক্ষার্থীরা একান্তই বাধ্য হয়ে ঐ সকল বিভাগে ভর্তি হয় এবং তাঁরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত। একটি হলে দীর্ঘদিন আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমার ব্যাক্তিগত অভিমত হচ্ছে আপনি যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেন যে, যদি তোমাকে আইন বিভাগে মাইগ্রেট করার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তুমি যাবে কি-না?

আমার বিশ্বাস সে শিক্ষার্থী উত্তর দেবে নিশ্চয়ই যাব। অন্যদিকে যদি বাংলা/দর্শন/ইতিহাস/ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মতো অন্যান্য সকল বিভাগের শিক্ষার্থীকেও একই প্রশ্ন যদি করা হয় তাহলে তাঁদের বেশিরভাগের উত্তরই প্রায় একইরকম হবে। অথবা আপনি যদি ভূগোল/জীববিজ্ঞান/উদ্ভিদবিজ্ঞান-এর মতো অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছেও একই বিষয়ে জানতে চান সে ক্ষেত্রেও উত্তর খুব বেশি হেরফের হবে না বলেই আমি মনে করি।

অন্যদিকে আইন বা ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা হলে তাঁরাও হয়তো অন্যকোন আকাঙ্খার কথা জানাবে। আসলে বিষয়টি হলো মানুষ যা চায় পাওয়ার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে তা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সকল শিক্ষার্থী ভর্তি হন তা তারা নিজেদের মেধার ভিত্তিতে ও স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে থাকেন এক্ষেত্রে কেউ তাঁকে জোর করে ভর্তি করিয়ে থাকেন না।

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। বিগত বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হারে ইতর প্রাণীর সন্তানদানের মতো করে প্রতিবছর শিক্ষার্থী বাড়ানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তির বক্তব্যে তা অনুপস্থিত কেন? একই সাথে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট-এ (যেখানে শুধু ভাষা শিক্ষা হওয়ার কথা) কেন বিভাগ খোলা হলো?

আপনি/আপনারা কেন সে সময় কোন শিক্ষার্থীবান্ধব ভূমিকা নেননি অথবা যদি যৌক্তিক কারণেই সেগুলোতে বিভাগ খোলা হয়ে থাকে তাহলে কলা অনুষদভুক্ত ঐ ৪/৫ টি বিভাগ চালু রাখার অযৌক্তিকতা কি তা ব্যাখ্যা করতে হবে। নতুবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভুল বার্তা যাবে।

আরেকটি বিষয় আমার মনে সবসময় ঘুরপাক খায় সেটি হলো, আমরা কি আমাদের চিন্তার জগৎ থেকে অনেক বেশি বাস্তববাদী হয়ে যাচ্ছি কি-না? কেননা আমরা যদি সাহিত্যচর্চা না করি, আমরা যদি দর্শন চিন্তায় নিজেদের ব্যপৃত না রাখি, আমরা যদি ইতিহাস ও ঐতিহ্য না জানি তাহলে আমরা কি আসলেই মানুষ থকবো?

আমার মনে হয় সেখানে মানুষরূপী রোবট পাওয়া যাবে যারা কম্পিউটারে কমান্ড করার মতো করে দায়িত্বপালন করবে। ফলে সমাজ হয়ে উঠবে আরো বেশি অমানবিক ও সর্বত্রই সামাজিক অরাজকতা বৃদ্ধি পাবে যা কোন রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।

প্রযুক্তির যাঁতাকলে পড়ে আজ আমরা আমাদের শিকড় থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাসকরি আমাদের এই ভোগবাদী সমাজের মধ্যে একজন মানুষকে ছেড়ে দিলে সে আর প্রকৃত মানুষ থাকবে না। তাই আমাদের, সমাজ ও রাষ্ট্রের এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ পালন করতে হবে। এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিতে হবে অগ্রণী ভূমিকা।

একটি মানবিক ও জ্ঞানসম্পন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিৎ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা। অন্যদিকে শিক্ষকগণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা করে এবং নিয়মিত প্রশাসনের দেখভালের মধ্যে রেখে বিভাগগুলোর ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবণ ঘটানো।

একই সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নিয়ে ইউরোপের মতো ফ্যাকাল্টি অব অরিয়েন্টাল স্টাডিজ নামে আলাদা ফ্যাকাল্টি করে বিভাগগুলোকে আধুনিকায়ন করলে আজকের মতো ঐ বিভাগগুলোকে আর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে না।

ড. আবু তোফায়েল মো. সামসুজ্জোহা
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ০৪ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।