বাঙালির মুক্তিবার্তা-২৬ মার্চ


Published: 2021-03-26 18:04:56 BdST, Updated: 2021-04-15 13:51:38 BdST

মো: মনিরুল ইসলাম: জাতীয় জীবনে কতকগুলো দিবস অত্যুজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করে। তার মধ্যে অন্যতম একটি দিবস হলো ২৬ মার্চ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস।এ বছরে আমরা তারই সুবর্ণ জয়ন্তীতে পদার্পন করছি। বিশেষ এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা বারংবার পর্যালোচনার দাবি রাখে । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর ডাকে দেশের আপামর জনসাধারণ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৭০ আসনে প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে ১৬২টি আসন পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাকিগুলো পশ্চিম পাকিস্তানে। আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একই সঙ্গে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে।

এর ফলে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখাগরিষ্ঠ দলের নেতা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

২৮ জানুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে জাতীয় পরিষদের বৈঠক আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। তিনদিন বৈঠকের পর আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহবান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দিয়ে দুই প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের প্রতি ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি জানান।

১৬ ফেব্রয়ারি বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে জনাব ভুট্টোর দাবির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘ভুট্টো সাহেবের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ক্ষমতা একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে হাস্তান্তর করতে হবে। ক্ষমতার মালিক এখন পূর্ব বাংলার জনগণ।’ ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দিলে সারা বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের জরুরি বৈঠকে ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ৩ মার্চ সারা বাংলায় হরতালি পালিত হবার পর বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ শেখ মুজিব এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।’ ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃঙ্খল মুক্তির আহবান জানিয়ে ঘোষণা করেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। ... রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’

পাকিস্তানী সামরিক জান্তার নিকট তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ইতোমধ্যে সমস্যা নিরসনের জন্য শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে কয়েকবার আলোচনা হয়। কিন্তু সব আলোচনাই ব্যর্থ হয়।

১৬ মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক শুরু হয়। আলোচনার জন্য জনাব ভুট্টোও ঢাকায় আসেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো আলোচনা হয়। ২৫ মার্চ আলোচনা ব্যর্থ হবার পর সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালীর জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা রাজধানী ঢাকায় বিপুল সংখ্যক জনসাধারণ, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ, ই. পি.আর কর্মকর্তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে। আর এটাকেই অপারেশন সার্চ লাইট বলা হয়। তখন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে তার নিজ বাসায় গ্রেপ্তার হবার আগমুহূর্তে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে একটা বার্তা প্রেরণ করেন। ঘোষণাটি ইংরেজিতে দিয়েছিলেন।

ঘোষণাটির বাংলা অর্থটি হুবহু তুলে ধরা হলো এখানে–
"এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।
আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান।
বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।"

মূলত ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ২৬ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্ৰামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম. এ. হান্নান ও ২৭ মার্চ ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রচার করেন। ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) বাঙালিদের গণহত্যা শুরু করার মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণায় আমাদের বাঙালি বীর সন্তানেরা উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মূলত এই স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয় এই ২৬ মার্চ থেকেই। এজন্যই আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর। তাই প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করে থাকি।

লেখক: মোঃ মনিরুল ইসলাম
প্রভাষক-সিএসই, টেক্সটাইল প্রকৌশল বিভাগ, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ২৬ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।