বাড়িওয়ালাদের স্বার্থেই সীমিত সময়ের জন্য বাসাভাড়ায় নমনীয় হওয়া উচিৎ


Published: 2020-08-10 18:05:57 BdST, Updated: 2020-09-30 20:15:41 BdST

মোঃ রাহাত খান: বেশ কিছুদিন থেকেই পত্রপত্রিকাতে একটি বিষয় খুবই মনঃকষ্টের কারন হিসেবে দেখা দিয়েছে। খবরটি হচ্ছে, অভাবের কারনে বা চাকুরী হারিয়ে ঢাকা ছারছে মানুষ। অনেক স্বপ্নর জাল বুনে এই যাদুর শহরে নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটি ছেরে এসেছিল এই মানুষগুলো কিন্তু আজ করোনার এই ভয়াল থাবায় যেমন জনজীবন বিপর্যস্ত ঠিক তেমনি হাজারো সপ্ন এখন থেমে যাচ্ছে অর্থাভাবে।

সকল সপ্ন-আশা কে পেছনে ফেলে চলে যেতে হচ্ছে আবারো সেই গ্রামের ঠিকানায় আর পেছনে ফেলে যেতে হচ্ছে তিলতিল করে গড়ে ওঠা ছোটবড় বিক্ষিপ্ত স্বপ্নগুলো। তবে একটা কথা কিন্তু সত্যি, যে আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। আর বিপত্তি হল আমরা জন্মগত ভাবে একটু বেশই আবাগী। আসলে আমরা যে অর্থ উপার্জন করি তা নিয়ে কিআমদের ভবিষ্যতের জন্য সত্যিই কোন কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে বা ছিল!

নাকি আমারা ভেবেই নিয়েছিলাম জীবন সবসময় একই গতিতে চলে বা চলবে। বিষয়টা হল, যারা ঢাকা ছাড়বেন বা ইতিমধ্যে ছেড়েছেন তাদের মধ্যে দুই শ্রেণীর মানুষ রয়েছে। এক শ্রেণী হচ্ছে তারা যারা দিন আনে দিন খায় গোছের অর্থাৎ একদমই নিম্নবিত্ত পরিবার। আর এই ধরনের পরিবার গুলোর জন্য আসলে উপার্জিত অর্থের উপরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা আমাদের এই দেশে কিছুটা দুরহই তবে আমি অসম্ভব বলছি না।

তবে আমার মূল চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু এই শ্রেণীর মানুষরা নয়। অপর যে শ্রেণীর মানুষগুলো যারাও ঢাকা ছাড়বেন বা ইতিমধ্যে ছেড়েছেন আর তারা হলেন নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত। যাদের উপার্জিত অর্থের উপরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কিছুটা হলেও সম্ভব ছিল, কিন্তু মাত্রাতিরক্ত উচ্চাভিলাষী চাহিদা এবং আয় ও ব্যায় অসামঞ্জসসতাই তাদের আজকের এই পরিনতি বলে মনে করি।

তার মানে এটা বলছি না যে আগে থকেই যদি মাত্রাতিরক্ত উচ্চাভিলাষী চাহিদা বা আয় ও ব্যায় সামঞ্জসসতার সঠিক পরিকল্পনা থাকতো তাহলে এই পরিস্থিতিতে ঢাকা ছাড়তে হতো না। তবে এটা বলতে চাচ্ছি যে ছাড়তে হলেও করোনা সংকটের মাত্র তিন মাসের মাথায়ই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হতো না হয়তো বা আরো কিছুদিন স্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করা যেত।

তবে কি হতো বা কি হলে কি হতে পারতো এখন এই বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করে আফসোস করা মটেই সমীচীন হবে না বরং পিছনের ভুল গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে কিভাবে সামনে আগানো যাবে বা ঘুরে দাঁড়ানো যাবে এখন সেটাই আলোচনার মুল বিষয়বস্তু হওয়া উচিৎ।

আমার আজকের মুল আলোচনা তাদের কি নিয়ে যাদের অনেকেরই ঠিক এমন কিছু ভুলের জন্য সামনে ভোগান্তি হতে পারে। ঠিক তেমন একটি শ্রেণী হচ্ছে ঢাকা সহ বিভিন্ন বিভাগীয় জেলা শহর এবং তার আশেপাশের বাড়িওয়ালারা। বাড়িভাড়া হল বিগত কয়েক বছরে উপরোক্ত অঞ্চলের বাড়িওয়ালাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা।

তবে একজন ব্যবসায় শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে এটা বলতে চাই যে কোন ব্যবসায়তেই যদি কাঙ্ক্ষিত পরিমান তাত্ত্বিক জ্ঞান না থাকে তাহলে আপদকালীন সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরন পাওয়া যায়না। আমারা যারা ব্যবসায় পড়াশুনা করি তারা আসলে ব্যবসা করার জন্য পড়ি না আর যারা ব্যবসা করি তাদের অনেকেরই ব্যবসায় এর তাত্ত্বিক জ্ঞান নেই। যদিয় এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত কিন্তু আশা করছি তারপরও অনেকাংশেই সত্যি।

মূল আলোচনার গভিরে যাবার আগে অর্থনীতির কিছু বেসিক বিষয় নিয়ে কথা বলব, আমি মোটামোটি সুনিশ্চিত যে পাঠকের অনেকেই আমার সাথে একমত পোষণ করবেন যে ব্যবসায়ীদের অনেকই ব্যবসায়ের এই কমন-সেন্স গুলো জানেন না বা জেনেও বুঝতে চান না। কিন্তু দীর্ঘ-মেয়াদে ব্যবসায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে পরবর্তীতে আফসোস করে। একটি উদাহরণ দিয়ে পুরো বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করছি।

অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগানের যেমন সুনিবিড় সম্পর্ক রয়েছে আর এই সম্পর্ককে প্রভাতিত করার জন্য সদা প্রস্তুত আছে দ্রব্য বা সেবার মান ও দাম। অর্থাৎ পণ্য বা সেবার মান ও দামের উপরই নির্ভর করছে পণ্য বা সেবাটির ব্যবসা কেমন জমে উঠবে।

এই তিনটি বিষয় এর উপরে আছে ব্যবসায়ের পরিবেশ। যেটার উপর ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ সাধারনত থাকে না বা খুবই কম থাকে। এই পরিবেশের প্রভাবের সবচেয়ে বাস্তব প্রমাণই হল পুরো বিশ্বর করোনা পরিস্থিতি। এখন আসুন নিচের টেবিল থেকে একটু অঙ্ক শিখি।

তাহলে উপরের টেবিল থেকে এটা বুঝা যাচ্ছে যে সাধারনত স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পণ্য বা সেবার দাম বাড়ার সাথে (মান এখানে অপরিবর্তিত)সাথে চাহিদার পরিমান কমে যেতে থাকে। উপরের টেবিল থেকে, সবচেয়ে বেশি পিছ প্রতি লাভ হবে ২০ টাকায় পণ্য বা সেবাটি বিক্রয় করলে কিন্তু নেট মুনাফায় (যেটা ব্যবসায়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য) চাহিদা কমার কারনে নেমে গিয়ে সেই পিছ প্রতি ১২ টাকা বিক্রির সমপরিমানই হবে।

অর্থাৎ মূল কথা যা দাঁড়াবে তা হল ১২ টাকাতে বিক্রি অথবা ২০ টাকাতে বিক্রি কার্যত একই বিষয়। আর সেজন্য ব্যবসায়ীর সবচেয়ে বেশি লাভজনক হবে যদি সে ১৬ টাকা করে পণ্য বা সেবাটি বিক্রয় করে। আসলে পরিতাপের বিষয় হল দেশের বেশীরভাগ ব্যবসায়ীরাই ব্যবসায় জ্ঞানের অভাবে বা প্রয়োগের অভাবে বড় লাভের (নেট মুনাফা) দিকে না তাকিয়ে ওই ছোট লাভের (পিছ প্রতি মুনাফা) দিকেই ঝোঁকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালারাও তেমন ভুলের দিকেই পা বাড়াচ্ছে না তো?

আসুন এখন আলোচনার ইতির দিকে যাওয়া যাক। যাদের মাথায় এত অঙ্ক বুঝে আসবেনা তাদের জন্যও তো সহজ ভাবে লিখাটি উপস্থাপন করে শেষ করতে হবে তাই না! প্রথমেই যেহেতু বলেছি আমার আজকের লেখার মূল জনগোষ্ঠী হল শহরের বাড়িওয়ালা ও তাদের বাড়ির সেবা ব্যবসা। তাহলে তাদেরকে এখন তিন শ্রেণীতে ভাগ করি।

১ম শ্রেণী যাদের ইউনিট প্রতি বাসা ভাড়া থেকে আয় হয় ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা বা তার ও বেশি, ২য় শ্রেণী যাদের ইউনিট প্রতি বাসা ভাড়া থেকে আয় হয় ৭,০০০/৮,০০০ টাকা থেকে ১৫,০০০ টাকা এর কম, ৩য় শ্রেণী যাদের ইউনিট প্রতি বাসা ভাড়া থেকে আয় হয় ৭,০০০ টাকারও কম। স্থান ভেদে বাসা ভাড়ার এই রেঞ্জ দিয়ে এটা বুঝাতে চাচ্ছি যে, ১ম শ্রেণীর বাসা গুলতে থাকে উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী পেশার মানুষ যাদের উপার্জন এখনো ভীতিকর অবস্থায় এসে পৌছায়নি।

অপরদিকে, ২য় শ্রেণীর বাসা গুলতে থাকে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং ৩য় শ্রেণীর বাসা গুলতে থাকে নিম্নবিত্ত শ্রেণী পেশার মানুষ যাদের উভয় শ্রেণিরই জীবন ও জীবিকা এখন বিপর্যস্ত। এই ২য় ও ৩য় শ্রেণীর বাড়িওয়ালারাই কিন্তু এখন আশু বিপদের সম্মুখীন ও সবচেয়ে বেশি ব্যবসায় ঝুকিতে রয়েছে, যেটা সৃষ্টিকর্তা না করুন এইভাবে মহামারী চলতে থাকে এক পর্যায়ে ১ম শ্রেণীর বাড়িওয়ালাদের উপরেও আসতে পারে।

তাহলে এখন বাড়িওয়ালাদের করনীয় কি? বাড়িওয়ালাদের এখন নিজেদের স্বার্থেই সীমিত সময়ের জন্য বাসাভাড়ায় নমনীয় হওয়া উচিৎ। এখন প্রায় ঢাকা সহ বিভিন্ন বিভাগীয় জেলা শহর এবং তার আশেপাশের এলাকায় প্রতিটি বাসাতেই কম বেশি TO-LET সাইনবোর্ড ঝুলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এর সংখ্যা কেমন রুপ নিবে সেটা সহজেই অনুমেয়। এহেন পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালাদেরই উচিৎ ভাড়াটিয়া দের আয়ের ব্যাপারে খোজ খবর নেয়া ও অঞ্চল ভেদে কিছু অংশ সাময়িক সময়ের জন্য ছার দেয়া। তাতে বাড়িওয়ালাদের দীর্ঘ মেয়াদে নিম্নলিখিত লাভ হবে।

* এক, মানবিকতার চর্চা হবে, যেটা ব্যবসায়ের ভাষায় বলে Strong Customer Relationship Building (ভোক্তার সাথে উত্তম সম্পর্ক তৈরি হবে)। যার ফলে ভাড়াটিয়াকে যদি একান্তই বাসা ছাড়তে হয় সে পরিচিতদের কে ওই বাসাতে ভাড়া থাকার সুপারিশ করবে ও নিজের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেলে আবার সেই বাসাতেই চলে আসবে।

* দুই, যাদের অবস্থা এখনো বাসা ছেড়ে দেবার মত না হলেও উপার্জনের একটা অংশ কমে যাওয়াতে গ্রামে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এই সীমিত সময়ের জন্য কিছু অংশ বাসা ভাড়া কমালে তারা ওই বাসাতে থেকে যাবে, যার ফলে শূন্য আয় এর থেকে কিছুটা হলেও বাড়িওয়ালা আয় করতে পারবে (কেননা এই পরিস্থিতিতে তাদের জন্য নতুন ভাড়াটিয়া পাওয়া টা বেশ কঠিনই হবে)।

* তিন, ব্যবসায় জ্ঞানের প্রকৃত চর্চা হবে। সবসময়ই একই ভাবে মুনাফা হয়না। আগেই বলেছি চাহিদা ও যোগানকে যেমন মান ও দাম প্রভাবিত করে। ঠিক সমস্ত ব্যবসায় প্রক্রিয়াকে আবার প্রভাবিত করে পরিবেশ (যেমন করোনা পরিস্থিতি)। আর সেজন্য কিছু কিছু সময় বাজারে টিকে থাকার জন্য স্বল্প মুনাফা এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ লোকসানেও পণ্য বা সেবা বিক্রয় করতে হয়।

এখন বাড়িওয়ালাদের দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার জন্য ব্যবসায়ের ভাষায় যেটাকে বলে Hedging Policy (ঝুঁকি কমানোর নীতি) কে গ্রহণ করতে হবে। আর সাময়িক সময়ের জন্য বাসা ভাড়া কমানোই হবে এখন বাড়িওয়ালাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কমানোর নীতি। কেননা ১০,০০০ টাকা লোকসান এর থেকে ৫,০০০ টাকা লোকসানই এখন ৫,০০০ টাকা মুনাফা হিসেবে বিবেচ্য হবে। মহান স্রষ্টা অতিদ্রুতই আমাদের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সৌভাগ্য দিন।

লেখক:
সহকারী অধ্যাপক ও ব্যাবসায় গবেষক
সিটি বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]

ঢাকা, ১০ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।