''যদি লাইগ্যা যায়''এমপিওভুক্তির খবরে রাতারাতি ভবন...


Published: 2019-10-27 21:58:00 BdST, Updated: 2019-11-17 10:24:44 BdST

লাইভ প্রতিবেদকঃ এমপিওভুক্তির খবরে একদিকে উল্লাস অন্যদিকে রাতারাতি ভবন নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। একটি বিশেষ মহল আশাহত হয়ে পড়েন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে। প্রতিষ্ঠানের জন্যে ভবন নির্মাণ, টেবিল চেয়ার বা সরঞ্জামাদী তৈরীও করেন নি তারা। অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই কোন শিক্ষার্থী। নেই কোনো অবকাঠামো। কিন্তু আবেদন করে রাখেন এমপিওভুক্তির। তাদের ভাষ্য ''যদি লাইগ্যা যায়''। আর এ বছর কোন সরেজমিন তদন্ত ছাড়াই হয়েছে এমপিওভুক্তি। কোন ভবন নির্মাণ না করেই স্কুল এমপিও ভূক্তির আবেদন করেন সংশ্লিস্ট অনেকেই।

আন্দোলনের খাতিরে পেয়েও গেছে অনুমোদন। কুড়িগ্রামে এবার একই ইউনিয়নের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একই মালিকের দুটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলেও একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই নেই। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা।

জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলা সদর ইউনিয়নে এক/দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই চারটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একই মালিকের দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার একটির পরিত্যক্ত ভবন, নেই কোনো শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দেখিয়ে এমপিওভুক্তের অভিযোগ উঠেছে।

জরাজীর্ণ আর পরিত্যক্ত ভবনটি দীর্ঘ ৪/৫ বছর ধরে হাটের গরু রাখাসহ বর্তমানে মাদকাসক্তদের অপকর্মের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। নেই দরজা-জানালা, কক্ষগুলোতে রয়েছে গরুসহ খড়কুটা, গোবর ও জুয়া খেলার সরঞ্জামাদি। কাগজ-কলমে এ প্রতিষ্ঠানের জায়গা হলেও এর অস্তিত্ব মেলে অন্যত্র। এমপিওর তালিকায় নাম আসার পরপরই রাতারাতি সোনাহাট ইউনিয়নের ঘুন্টির মোড় নামক স্থানে অন্য প্রতিষ্ঠান উপমা মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটের ব্যানার লাগানো হয়েছে।

টিনশেডের এ প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শিক্ষার্থী, বন্ধ পাঠদান কার্যক্রম। কাগজ-কলমে পরিচালনা হলেও পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তের তালিকায় কীভাবে গেল এ নিয়ে রয়েছে জনমনে প্রশ্ন। এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকায় আসায় বিষয়টি নিয়ে চলছে নানান আলোচনা ও সমালোচনা। অনেকেই পুনরায় তদন্তের দাবি তুলেছেন। সম্প্রতি ঘোষিত এমপিওভুক্তির তালিকায় অন্তর্ভূক্তির খবর পেয়ে রাতের আঁধারে একটি প্রতিষ্ঠানে সাইনবোর্ড স্থাপন, ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়েছে।

সাইন বোর্ড স্থাপন

পাশের হারসহ কোনো শর্তের মধ্যে না পড়লেও পঞ্চগড় জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা নিয়ে বিভিন্ন মহলে হচ্ছে নানা আলোচনা সমালোচনা। গত বুধবার রাত থেকে পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার ঝলইশালশিরি ইউনিয়নের নতুনহাট টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ নামের ওই প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু করে কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। রাতেই রাতারাতি ইট গেথে ভবনের ভিত্তি কাঠামো দাঁড় করানো হয়। টানিয়ে দেয়া হয় কলেজের নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নতুনহাট বাজারের অদূরেই হোসনাবাদ ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন একটি জমিতে ওই কলেজের সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক জোরেশোরে ইট দিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ করছেন।

ইটের গাঁথুনির পাশাপাশি টিউবওয়েল বসানোর কাজ করছেন কয়েকজন। কয়েকজন শ্রমিক বালু ফেলার কাজ করছেন। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নির্মাণ সামগ্রী। এ সময় কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী কাউকে পাওয়া যায়নি। কলেজের কার্যক্রম কোথা থেকে পরিচালনা করা হয় তা জানেনা স্থানীয়রা। খবর নিয়ে জানা যায় পঞ্চগড় বিসিকনগর টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দেলদার রহমান এই কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

স্থানীয়রা জানায়, নামে থাকলেও এখানে ওই কলেজের কোনো কার্যক্রম ছিলো না। কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো দেলদারের কলেজ থেকেই। ক্লাশও হতো তার কলেজেই। এই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তি তালিকায় কিভাবে গেলো সেটিই এখন স্থানীয়দের বড় প্রশ্ন। দেলদার রহমানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে ওই প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি বলে দাবি করেন। তিনি জানান, এই প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তার স্ত্রী শামীমা নাজনীন।

নির্মাণ কাজ

২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত। বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানে ২শ’ জন ছাত্রছাত্রী পড়ছে। শিক্ষক রয়েছে ৬ জন। চলতি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬০ জন। পাশ করে ৫৮ জন। কাগজে কলমে সব ঠিক রয়েছে বলে দাবি করেন দেলদার। রাতারাতি ভবন নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ঘর আমি যখন খুশি তখন উঠাবো।

সাংবাদিকরা ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও শিক্ষক শিক্ষার্থীদের তথ্য দেখতে ও জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তিনি বলেন, এর আগে টিনশেড ঘরে অধ্যায়ন কার্যক্রম চলতো। এছাড়া তার নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুনহাট টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় অধিবাসী জানান, প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি দেলদার রহমান পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থানে নামে বেনামে একাধিক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বিএম অধ্যক্ষ পরিষদের বড় নেতা তিনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তার অদৃশ্য শক্তিবলে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তির তালিকায় গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

খবর নিয়ে জানা গেছে পঞ্চগড় জেলায় এবার ৪ টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান উচ্চতর মাধ্যমিক বিএম এন্ড টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট, একই উপজেলার ভজনপুর নগর টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, নতুনহাট টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ ও দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজ।

শুধু নতুনহাট টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজেই নয় বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও খুব নাজুক। কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে নেই নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম। এদিকে, এমপিওভুক্তির তালিকায় উঠে আসা পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর সন্দেশ দীঘি বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা আরো করুণ।

বিদ্যালয়টির নামমাত্র একটি ভবন থাকলেও তাতে নেই কোনো বসার ব্যবস্থা। নেই কোনো শিক্ষা কার্যক্রম। এ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫ জন শিক্ষার্থী। ২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। বিদ্যালয়টিতে ২০১৬ সালে জেএসসি পরীক্ষায় ১০ জন অংশগ্রহণ করে ২ জন, ২০১৭ সালে ১৩ জন অংশগ্রহণ করে ৪জন ও ২০১৮ সালে ১৩ জন অংশ নিয়ে ৪ জন পাশ করেছে।

তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর আলহাজ ডালিম উদ্দিন মহিলা দাখিল মাদ্রাসার একই ধরণের অবস্থা হলেও ওই প্রতিষ্ঠানটিকেও এমপিওভূক্ত করা হয়েছে। সন্দেশ দীঘি বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইন্তাজুল হক বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের মোট আটজন শিক্ষক আছেন।

টিন শেড দিয়ে দাঁড় করানো ভবণ

 

এছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি আছেন চার জন। বিদ্যালয়েটি ভালভাবেই চলতো তবে সম্প্রতি ঝড়ের কারণে টিনশেঠ ঘরটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের মোট ছাত্রী সংখ্যা ১৭০ জন। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের বেতন ভাতা না থাকায় পড়াশোনায় কিছুটা ভাটা পড়েছিল বলে তিনি জানান। মোহাম্মদ আজম নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে মন্তব্য করেন, আমরা যেখানে এমপিভূক্তির সকল শর্ত পূরণ করা সত্যেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এমপিওভুক্ত হতে পারছি না।

সেখানে এই রকম ভুইফোঁড়, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান কিভাবে এমপিওভুক্তির তালিকায় নাম আসে সেটাই প্রশ্ন। তিনি বিষয়টি আরো তদন্ত করে এমপিওভুক্তি চূড়ান্ত করার দাবি জানান। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিমাংশু কুমার রায় সিংহ বলেন, এমপিওভুক্তির বিষয়ে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। আমাদের কাছে কোনো তথ্যও নেইনি। এমপি, সচিব ও মন্ত্রী উনারা কিভাবে এনপিওভুক্তির তালিকা দিয়েছেন তা তারাই ভাল বলতে পারবেন।

প্রসঙ্গত, দুই হাজার ৭৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৬৫০টি বিদ্যালয় ও কলেজ রয়েছে। এছাড়াও ভাড়া বাড়িতে অনেক প্রতিষ্ঠান চললেও সেগুলোও এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। যেমন- রাজধানীর ন্যাশনাল কলেজ, নরসিংদী আইডিয়াল কলেজ ও নরসিংদী বিজ্ঞান কলেজ।

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, নীতিমালার আলোকে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে। ফলে যারা যোগ্য, তারাই এমপিওভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া যেসব তথ্যের ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে, তা ভুল হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত কার্যকর হবে না বলেছেন তিনি।

ঢাকা, ২৭ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।