রমজানের শিক্ষা কাজে লাগাতে হবে সারা বছর


Published: 2021-05-11 13:59:20 BdST, Updated: 2021-06-18 09:35:16 BdST

রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের মাস রমজান। রমজান এসেছে 'রমজ' নামক শব্দ থেকে। 'রমজ’ শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া, দগ্ধ করা। রমজানের সিয়াম সাধনা মানুষের মনের কলুষ-কালিমা পুড়িয়ে নষ্ট করে দিয়ে মনকে নির্মল ও পবিত্র করে তোলে, পাপরাশিকে সম্পূর্ণরূপে দগ্ধ করে মানুষকে করে তোলে খাঁটি ও পুণ্যবান। রমজানে মুমিন হৃদয়ে ইবাদতের ঢেউ ওঠে। মুসলমানদের ঘরে ঘরে সুর উঠে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের। রমজান তরুণ ও যুব সমাজে ইবাদত- বন্দেগীর প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি করে।

তরুণ বয়স হেদায়েত লাভের উপযুক্ত সময়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ সাত শ্রেণীর মানুষকে কিয়ামতের দিন তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ হলো সে সব যুবক-যুবতী, যারা তার রবের ইবাদতের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে-(বুখারি)"। যুবকদের উদ্দেশ্যে আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘একজন বৃদ্ধের ইবাদতের চেয়ে আল্লাহ বেশি খুশি হন যেসব তরুণ-তরুণী যৌবন বয়সে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে।

আর কিছুদিন পরেই বিদায় নিবে রমজান। রমজান মাসে আমাদের মধ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, সেগুলো ধরে রাখতে হবে সামনের মাসগুলোতেও।গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণ ‘রমজানের শিক্ষা সারা বছর কিভাবে কাজে লাগাবেন' সে অনুভূতি তুলে ধরেছেন আমাদের ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম প্রতিনিধি আর এস মাহমুদ হাসান

"সারা বছরের ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহের মাস রমজান"

জান্নাতুন নাঈমা, কৃষি বিভাগ: মাসগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মাস রমজান, বারো মাসের সর্দার রমজান মাস। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহর কসম! মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম কোন মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনরা এ মাসে (সারা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনিমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।' (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৮৩৬৮)।

মাহে রমজানের রোজা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলার শিক্ষা দেয়। রোজা মানুষকে পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। সংযম সাধনার এ মাসে ক্ষুধা ও পিপাসার প্রকৃত অনুভূতির মাধ্যমে বিত্তবান-সচ্ছল রোজাদার মানুষ দরিদ্র ও অভাবী মানুষের না খেয়ে থাকার কষ্ট বুঝতে সক্ষম হন।

রোজা রাখার দ্বারা মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও আবেগের ওপর বিবেক পরিপূর্ণভাবে বিজয়ী হয়। এতে তাকওয়ার গুণাবলি অর্জিত হয়। রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষের নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা এবং আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও কুদরতের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। রোজার মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়, দূরদর্শনের ধারণা প্রবল হয়। আসবাব ও উপকরণের হাকিকত খুলে যায়, পাশবিকতা ও পশুত্ব অবদমিত হয়। ফেরেশতাদের নৈকট্য লাভ হয়। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের সুযোগ হয়। অন্তরে মানবিকতা ও সহমর্মিতার বন্যা বয়ে যায়। রোজা দেহ-আত্মার সুস্থতার কারণ।

জান্নাতুন নাঈমা

 

রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য আল্লাহভীতি অর্জন। আল্লাহভীতি কিংবা তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ন্যায়-নীতি, আদর্শ, নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গে গভীর জীবনবোধও সৃষ্টি হয়। এর কারণে সারা বছর দৈনন্দিন জীবনে আত্মার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, মিথ্যার ওপর সত্য, অন্যায়ের ওপর ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে এবং পশুত্বকে অতিক্রম করে মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করে। রমজান মাসে গুনাহের জন্য মানব যখন অনুতাপ ও অনুশোচনার সাথে ইস্তিগফার করবে, তখন লজ্জার কারণে অন্তরে আপনাআপনি কোমলতা সৃষ্টি হবে এবং আল্লাহর বড়ত্ব ও নিজের অপারগতা অনুভব হবে। এই অনুভূতি আত্মশুদ্ধির পথে অধিক কার্যকর কৌশল।

একজন প্রাকটিসিং মুসলিম হিসেবে, রমজান মাসকে বিগত রমজানের অসমাপ্ত কাজ গুলো সম্পন্ন করা ও তাকওয়া পূর্ণ জীবন যাপনের বরকত ও কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ মাস ধরে পালন করতে হবে। রোজাদার ব্যক্তি রোজা অবস্থায় কখনো মিথ্যা কথা, পাপ কাজ, চুরি, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, ধূমপান, মাদকদ্রব্য ও জুয়াখেলার মতো অনৈতিক ও অপকর্মে লিপ্ত হন না। খোদাভীরু লোকের মধ্যে এ সুদৃঢ় বিশ্বাসটুকু জন্মে থাকে যে আমি যা কিছু বলব ও চিন্তাভাবনা করব, এসবই আল্লাহ তাআলা জানেন, শোনেন ও দেখেন। আল্লাহর কাছে ভালো-মন্দ কাজের জবাবদিহি অবশ্যই করতে হবে। এভাবেই রমজান জীবন পরিবর্তন করে। পবিত্র মাহে রমজানের মূল উদ্দেশ্য হোক সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তাকওয়া, আত্তশুদ্ধি ও সহনশীলতা অর্জন করা।

"'তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি অর্জনই হোক রমজানের অন্যতম আত্মোপলব্ধি''

মোঃ মহসিন হুসাইন, ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগ: রমজান মাসের আগমনে মুসলিমগণ আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা বলেন-

قُلۡ بِفَضۡلِ اللّٰہِ وَ بِرَحۡمَتِہٖ فَبِذٰلِکَ فَلۡیَفۡرَحُوۡا ؕ ہُوَ خَیۡرٌ مِّمَّا یَجۡمَعُوۡنَ ﴿۵۸﴾

বল, ‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়’। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম। (সূরা- ইউনুস ৫৮)।

একজন মুসলিমের নিকট রমজান অনেক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ সমূহের মধ্যে অন্যতম হলো- এ মাসের সাথে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকনের সম্পর্ক রয়েছে, আর তা হলো সিয়াম পালন। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, 'মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য কিন্তু সিয়াম তার ব্যতিক্রম, তা শুধু আমার জন্যই এবং আমিই তার প্রতিদান দিব।'

রমজান হলো মহাপবিত্র কোরআন নাজিলের মাস। এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় শয়তানদের। এ মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদর যা সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। এ মাসে সৎকর্মের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়। এ মাস পাপ থেকে ক্ষমা লাভের মাস, জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস, ধৈর্য্য ও সবরের মাস। তাইতো প্রতি মুসলিমের নিকট রমজানের রয়েছে আত্মিক কদর ও ভালোবাসা।

মোঃ মহসিন হুসাইন

 

আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ﴿۱۸۳﴾ۙ

হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।(সূরা- বাকারা, ১৮৩)।

এ আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাকওয়া শক্তি অর্জন করার ব্যাপারে সিয়ামের একটা বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। কেননা, সিয়ামের মাধ্যমে প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে বিশেষ শক্তি অর্জিত হয়। রমজান মাসের অন্যতম আত্মোপলব্ধি হলো তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি অর্জন এবং শিক্ষা হলো আমরা যেন আল্লাহ কে ভয় করার মতো ভয় করি যাতে করে রমজান মাসের ন্যায় আমরা বছরের বাকি মাসগুলাও হারাম, গুনাহ ও সকল পাপ পঙ্কিলতার কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে পারি এবং সৎ ও সহজ সরল পথে, কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারি।

প্রাকটিসিং মুসলিমদের জন্য রমজান দ্বীন পালনে নতুনত্ব নিয়ে আসে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা তোমাদের ঈমানকে নবায়ন করো অর্থ্যাৎ নূতন ও সতেজ করো। ঈমানকে দৃঢ়, সতেজ ও নতুনভাবে সাজাতে রমজান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

একজন মুসলিমের জীবনপ্রণালী পরিবর্তনে রমজান টার্নিং পয়েন্ট অর্থ্যাৎ পরিবর্তনের সন্ধিকাল হিসাবে কাজ করে থাকে। রমজানের এক মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যদি তা বছরের বাকি মাসগুলোতে প্রয়োগ করা যায় তাহলে জীবন হয়ে উঠবে বরকতময় এবং পাওয়া যাবে মালিকের অশেষ নিয়ামত ও নৈকট্য লাভ। রমজানে আমরা তাকওয়া অবলম্বন করে যেন পরিপূর্ণ মুত্তাকী হতে পারি সেই তৌফিক আল্লাহ তায়া’লা দান করুন, আমিন।

"রমাদান, পবিত্রতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি হৃদয়ে"

সিরাজুম মনিরা, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ:
"গুনাহর সাগরে আকণ্ঠ ডুবে থাকা
চারিদিকে নিপীড়িত মজলুমের হাহাকার
গোধূলি বিকেল শেষে সাবানের এক ফালি চাঁদ পরিশ্রান্ত কাফেলার সারিবদ্ধ কাঁধ
খুশির জোয়ারে আজ উচ্ছ্বসিত প্রাণ
হৃদয়ে হৃদয়ে মুক্তির অবনাশী গান
আহলান সাহলান মাহে রমাদান"

পুরো বাংলাদেশে যখন নৈতিকতা বিসর্জনের চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, চারত্রিক অবক্ষয়ের এই চরম সময়ে যখন চারিদিকে খুন রাহাজানি, হানাহানি, ধর্ষন, পারিবারিক ভাঙ্গন ইত্যাদি এক মহামারী রূপ ধারণ করেছে তখন কি হতে পারে এ থেকে মুক্তির উপায়? হ্যাঁ এই আত্মশুদ্ধির মাস রমজানই হতে পারে কলুষিত সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার!

সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সকল মুসলমানের জন্য এক পবিত্র উপহার হচ্ছে এই রমজান। আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে মহান আল্লাহ আমাদের উপর সিয়াম সাধনা ফরজ করে দিয়েছেন। "হে মুমিনগণ তোমাদের উপর সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো।"

আগুন যেমন স্বর্ণকে নিখাদ করে দেয়, তেমনি রমজানের সিয়াম সাধনা একজন মানুষকে সবরের, ধৈর্যের, তাকওয়া ভীতির শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলে এক পবিত্র মানুষ। এ মাস কল্যান, রহমত ও বরকতের মাস। মানবহৃদয়ের সকল কলুষিতা দূর করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মাস। সিয়াম সাধনার ফলে একজন রোজাদার জৈবিক ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আকাঙ্ক্ষা নিবারণ করে, কিন্তু উপলব্ধি করে বিশাল এক প্রাপ্তি। আত্মশুদ্ধির বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে সে অর্জন করে আত্মিক প্রশান্তি। রমজান যেন গোটা সমাজে এক জান্নাতি সুবাস ছড়াতে থাকে, গোটা সমাজ অভ্যস্ত হয় এক পবিত্র অনুশীলনে, যা চলতে থাকে পুরো ত্রিশদিন। সমাজে অশ্লীলতা, রাহাজানি, হানাহানি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত থাকে।ধূমপানমুক্ত বিশুদ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় প্রাণ খুলে, সবখানে যেন এক জান্নাতী পরিবেশের আভাস পাই সবাই। রহমতের পেয়ালা হাতে অসংখ্য ফেরেশতারা ঘোষণা করে আহলান সাহলান মাহে রমজান।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "রমজান মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শিকল বন্দি করা হয়!" (মুসলিম)

রমজান আবির্ভাব হয় রহমত মাগফিরাত ও নাজাতের ধারা নিয়ে। মুমিন হৃদয় তখন মেতে ওঠে আত্নিক তৃপ্তিতে। পুরো রমজানের পবিত্র অনুশীলন একজন মানুষকে সাধারণ অভ্যাস পরিত্যাগ করে গড়ে তোলে এক অন্য ধারার মানুষ। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা নিজের নফসের গোলামি পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সারাদিন সিয়াম সাধনার ফলে একজন মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় তাকওয়া ভীতি, যা সে নিজের মধ্যে ধারণ করে নিজ আলোকিত হয় এবং তা সমাজকে আলোকিত করতে সাহায্য করে। আত্ননিয়ন্ত্রণ রোযার মূল উদ্দেশ্য। রমজানের বার্তা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এক আলোররেখা তৈরি করে, আত্মার পরিশুদ্ধির সাথে সাথে দেহ, মন,মগজকে করে তোলে পরিচ্ছন্ন। ব্যক্তিজীবন থেকে হিংসা- বিদ্বেষ ভুলিয়ে ভারসাম্যহীনতা দূর করে গড়ে তোলে এক ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ। রমজানের শিক্ষা মানুষকে করে তোলে এক নতুন মানুষ। এমত অবস্থায় আত্মশুদ্ধির উত্তম সময় রমজান ছাড়া আর কি হতে পারে?

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন "যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমজানের সিয়াম পালন করে তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়" (বুখারী)

সিরাজুম মনিরা

 

মানবজীবকে পবিত্র করে গড়ে তোলার এক কার্যকরী পন্থা হলো মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা মহান আল্লাহর রহমতের দ্বার উনমুক্ত করে দেয়। মানুষকে জান্নাত লাভের উপযুক্ত করে তোলে। সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় রমজান মুসলমানদের জন্য এক পবিত্র ট্রেনিং, যার ফলাফল জান্নাত লাভের সুবর্ণ সুযোগ। এই এক মাসের ট্রেনিং বাকি ১১ মাসকে করবে সমৃদ্ধ পরিশুদ্ধ। মাহে রমাজান শুধু একজন ব্যক্তির আত্মিক উন্নতি সাধন করেনা, বরং পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করে, নিঃশর্ত ও গঠনমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করে, সমাজের কাঙ্ক্ষিত আচরণ গঠনে সহায়তা করে, কুপ্রবৃত্তির দমন করে একজন মানুষকে পরিপূর্ণ খাঁটি মুমিন হওয়ার পথে নিয়ে যায়।

পবিত্র রমজান মাস হলো স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্কের এক পরিপূর্ণ অনুশীলন। এ মাস কোরআন নাযিলের মাস। এই মাস লাইলাতুল কদরের মাস। যে ব্যাক্তি নিজের নফসের গোলামী পরিত্যাগ করে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে প্রভুর দরবারে হাজির হতে পারবে তার ব্যাপারে আল-কোরআনের ঘোষণা- 'এদের জন্য রয়েছে তাদের রব আল্লাহর তরফ থেকে ক্ষমা ও জান্নাত। যে জান্নাত এর পাদদেশে প্রভাবিত হয় নহরসমূহ, যেখানে তারা চিরকাল থাকবে।' কতই না উত্তম নেককারদের পুরস্কার!

পবিত্র মাহে রমজানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আত্মশুদ্ধির নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে সারা বিশ্বের মুসলমানদের উচিত নৈতিকতার অধঃপতন থেকে নিজেদের রক্ষা করা। মেরুদণ্ডহীন নেতিয়ে পড়া চেতনাকে জাগ্রত করে এক সোনালী সমাজ গড়ে তোলা। সোনালী স্বপ্ন বাস্তবায়নে আজ থেকে পবিত্র মাসের শপথ হোক রমযানের পবিত্রতাই নিজেকে শুদ্ধ করি নৈতিকতার অধঃপতনের শিকল ভেঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ি, আল্লাহর রাসূলের পথ আঁকড়ে ধরি পবিত্রতায় সাজাই হৃদয় ভূমি।

"আত্মশুদ্ধির মাস রমজান"
সেলিম রেজা, রসায়ন বিভাগ: রমজান মাস মুসলমানদের সিয়াম সাধনার অন্যতম একটি মর্যাদাপূর্ণ শ্রেষ্ঠ মাস। কেননা এই মাসেই নাযিল হয়েছে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন।রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায় আত্মশুদ্ধি লাভ করে। বিরত থাকে সকল প্রকার পাপাচার, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে। কারন সিয়াম শব্দের অর্থই সকল প্রকার গুনাহ ও খারাপ কাজ থেকে নিজের নফসকে সংযত রাখা।

এই রমজানের বড় শিক্ষা, সিয়াম পালনের মাধ্যমে ধনী মানুষ গরিব দুঃখীদের অর্ধাহারে অনাহারে থাকার কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে এবং সেই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগিয়ে মানব সেবার মহান ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ করে। রমজান মাস অনেক ফজিলত পূর্ণ একটি মাস। এই মাসে কেউ এক একক দান করলে ৭০ গুন বেশি সওয়াব পায়। এই মাসের মধ্যে একটি দিন আছে যেটা হাজার বছরের চেয়েও অনেক উত্তম। যেই দিনটি হল "লাইলাতুল কদর"। এই দিনের রাতের ইবাদাত আল্লাহর কাছে অনেক গ্রহণযোগ্য এবং এই দিনের ইবাদাত আল্লাহর কাছে কবুল হলে তাকে নিষ্পাপ করে দেন।

সেলিম রেজা

 

তাই এই রমজানে মাসে সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান সকল মুসলিম ভাই বোনেরা বেশি বেশি ইবাদাত, দান করি এবং সকল প্রকার পাপাচার, অন্যায়, অশ্লীলতা থেকে নিজের নফসকে বিরত রেখে এক আল্লাহর আনুগত্য লাভ করি।

"দৈনন্দিন জীবনে আত্মশুদ্ধির মাস রমজান"

সাদিয়া আকতার মীম, আইন বিভাগ: রোজা মানুষকে ধৈর্য ও সহনশীল হতে শেখায়। একজন রোজাদারের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে আল্লাহর ভয়ে বিচলিত হয়ে, সব রকমের খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। অনাহারে থাকার কারণে সারা বছর ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাতর মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখে। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, 'হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্যে সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া বা আল্লাহ ভীরুতা অবলম্বন করতে পারো।'

রমজানে আমাদের মধ্যে আল্লাহর ভয়ের চেতনা জাগ্রত হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সব ধরনের নাফরমানি কাজ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়। অসহায় এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি সহনশীল হওয়া, আদর্শ চরিত্র গঠন করা এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে রমজান মাসের এই শিক্ষাকে আমরা সারাবছর কাজে লাগাতে পারি।

পানাহারের পাশাপাশি মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখা, শালীন জীবনযাপন করা, কথা ও কাজে বিনয়ী হওয়া, অপচয় রোধ করা, রমজানের এই শিক্ষাগুলোকে সারাবছর নিজেদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে টিকিয়ে রাখা অতীব জরুরি। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স:) ইরশাদ করেছেন, সিয়াম ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ কোনোদিন সিয়াম পালন করলে তার মুখ থেকে যেন অশ্লীল কথা বের না হয়। কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে অথবা ঝগড়ায় প্ররোচিত করতে চায় সে যেন বলে, আমি সিয়াম পালনকারী। (সহীহ বুখারী: ১৮৯৪, সহীহ মুসলিম: ১১৫১)

সাদিয়া আকতার মীম

 

মানুষের মধ্যে থাকা অন্যায়, হিংসা,বিদ্বেষ, ক্ষোভ, পরনিন্দা থেকে আত্মাকে কলুষ মুক্ত করার সুযোগ হয়, একটি মাস সিয়াম সাধনের মাধ্যমে। তাইতো এই মাসকে বলা হয় আত্মশুদ্ধির মাস।

আর কিছুদিন পরেই রমজান মাস বিদায় নিবে আমাদের থেকে। রমজান মাসে আমাদের মধ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, সেগুলো ধরে রাখতে হবে সামনের দিনগুলোতেও। যাকাত- ফিতরা দেওয়া, দান-সদকা করা, অসহায় দুঃস্থ মানুষের সহযোগিতাসহ সহমর্মিতার ধারা রমজান পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রাখতে হবে। পণ্যে ভেজাল দেওয়া, মাপে কম দেওয়া, কালোবাজারি, ঘুষ-দুর্নীতি সহ সকল অমানবিক কাজ থেকে বিরত থেকে নিজেদের জীবনে রমজানের শিক্ষাকে লালন করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন, যাতে রমজানের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আমরা সামনের দিনগুলোতে সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারি।

"রমজানের শিক্ষা সারাবছরের পাথেয়"

মাহমুদুল হাসান মৃদুল, ইতিহাস বিভাগ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব।" পূর্ণময়ী জীবন গঠন, আত্নসংস্কার, আত্নসংশোধনের বাস্তব অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছে রমজানের দিনগুলো। সিয়াম সাধনা মুসলিম মিল্লাতকে যাবতীয় পাপাচার, মিথ্যাচার, কামাচার প্রভৃতি অন্যায় অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকতে শিক্ষা দেয়।

"হে ঈমানদারগন তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো।" (আল- কোরআন)

মাহমুদুল হাসান মৃদুল

 

একজন মুসলিম অনেক প্রচেষ্টা ও শ্রম দিয়ে এ মাসে ইবাদত বন্দেগী করছে। এই আমলের প্রচেষ্টা ও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রমজানের পরেও ইবাদত বন্দেগী অব্যাহত থাকে সেই মানসিকতা আমাদের তৈরী করতে হবে। একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে রমজানে, সকলের কল্যাণ কামনা করে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উন্নতি সাধন করে, ইসলামি জীবন বুনিয়াদ করে নিজ লক্ষ্যে পৌঁছাতে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

মাহে রমজানের রোজা আমাদেরকে সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব, নিয়মানুবর্তিতা, মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়ে থাকে। ধনী, দরিদ্র, আমির ফকির যে, একই ভ্রাতৃত্বের অর্ন্তগত, একে অন্যের দায়িত্ব কত বড় তা আমরা রমজানেই পেয়ে থাকি। আত্মশুদ্ধির মাসের বিদায়ক্ষণে নিজেকে পবিত্র করে রমজানের এই সুমহান শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে, সমাজের অন্যায়, অসত্য, জুলুমবাজি ইত্যাদি রুখে দিতে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। রমজানের পরবর্তী মাসগুলোতে রোজার আলোকে জীবন পরিচালনা করতে পারার মধ্যে রয়েছে রোজাদারের সফলতা।

ঢাকা, ১১ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।