নর্থ সাউথ ভার্সিটির অপরাধ সিন্ডিকেট-১আলোচিত সেই তরিকুলের উত্থানের কিচ্ছা!


Published: 2020-05-19 20:37:18 BdST, Updated: 2020-08-11 12:34:41 BdST

মৃদুল ব্যানার্জি: তরিকুল ইসলাম মুমিন। দেশ জুড়ে আলোচিত-সমালোচিত একটি নাম। সাধরণ পরিবার থেকে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে এসেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠেন তিনি। স্বপ্ন দেখেন কোটি টাকা। দামী-গাড়ি ও বিশালবহুল চলাফেরা তাকে দিনের পর দিন অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। কখনও ছাত্রলীগ, কখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবার কখনও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রলীগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে চলতেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না হয়েও বছরের পর বছর ছিলেন ২টি হলে। চলতেন কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার সাথে। ঢাবি ক্যাম্পাসের সকলেই জানতো তরিকুল ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। কেন্দ্রীয় কমিটির কিছু না হয়েও পরিচয় দিয়ে বেড়াতন কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে। এর প্রতিবাদও করেছেন তৎকালীন অনেক নেতা-কর্মী। যদিও তার আশ্রয়দাতারা ক্যাম্পাস ছাড়ার পর পরেই তরিকুলও বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে দেন। জানা যায় তদবীর বাণিজ্য ছিল তরিকুলের মুখ্যম পেশা। ছাত্রলীগের কমিটিতে না থেকেও নেতাদের সঙ্গে চলাফেরা ও সেলফির সুবাদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা পরিচয়ে দাবড়ে বেড়াতেন বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজধানীতে।

এক সুযোগে তরিকুল লাইন পেয়ে যান। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভার্ন মেন্টাল সাইন্স এন্ড ম্যানেজমেন্টের প্রফেসর ও প্রক্টর নাজমুল আহসান খানের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই সূত্র ধরে ওই সাবজেক্টেই ২০১৩ সালে ভর্তি হন তরিকুল ইসলাম। আউট অব ফোর এ পান ৩.১৫। পরের সেমিস্টারের পান ২.১০। ২০১৪ সালে প্রথম সেমিস্টারে একটি সাবজেক্টে ফেল করে। শুরু হয় ফেল করা ২০১৫-১৬,১৭, অবশেষে ২০১৮ সালে ৫টি সাবজেক্ট নিয়ে ৪টিতেই ফেল করে। সিজিএ নেমে আসে ১ এ। পরের সেমিস্টারে ৫টি সাবজেক্ট নিয়ে ৫টিতেই ফেল করে। সিজিএ নেমে আসে ০.৬৬ এ। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসমিস করে দেয়া হয়। জানা যায় নর্থ সাউথে পড়াশুনাকালীন সময়ে তরিকুল ভর্তি বাণিজ্যের গন্ধ পেয়ে যান। ঢুকে পড়ে নর্থসাউথের ভর্তি বাণিজ্যে। দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, তরিকুল রিমান্ড ও জেরার মুখে স্বীকারোক্তিতে বলেছেন তার দেশী ভাই প্রক্টরের সাথে ছিল তার নিবির সম্পর্ক । তিনি তাকে আদর করতেন। তিনি অনেকেরই সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ধীরে ধীরে বরিশাল এলাকার ওই প্রফেসর তাকে দেশী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আশকারা দেন। তরিকুলের ৩টি সেল ফোন ও সংশ্লিস্টদের সেল ফোন ও ক্যাম্পাসের ভিডিও ফুটেজ দেখলেই সব ঘটনা ওপেন হয়ে যাবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ওই ভার্সিটির এসব সকল কিছুই নজরদারিতে আছে। রেকর্ড হচ্ছে। সময় আসলে সবকিছুই বেরুবে।

সূত্র আরো জানায়, প্রক্টর নামজুল হতে চেয়েছিলেন ট্রেজারার। কিন্তু বাধ সাধেন গৌড় গোবিন্দ গোস্বামী। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দফতরে রাজাকার থেকে শুরু করে সব ধরনের অভিযোগ পাঠানো হয়। কিন্তু সে কাজটি হয়নি। তবে এ ব্যাপারে প্রক্টর নাজমুল আহসান সব কিছুই অস্বীকার করেছেন। তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেছেন আমি বেশ কয়েকবার তরিকুলের ভর্তি বাণিজ্য, প্রবিশান বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য সহ নানান অপকর্মের কথা অনেকের কাছে শুনেছি। কিন্তু কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। তাই আমরা কিছু করতে পারি নাই। তিনি বলেন, আমি কোন কিছুই বলতে চাই না। আপনার কাছে নিয়মিত আসা যাওয়া করতো এমনকি ডিসমিসের পরেও এসেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রক্টর হিসেবে আসতেই পারে। তবে ডিসমিসের পর পুনরায় সেটি উড্রো হলে আমার কাছে তরিকুল এসেছে অনেকবার। কি কারণে কারা ডিসমিস শিক্ষার্থীকে পুনরায় ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো আমার বিষয় নয়। এটি জানে বোর্ড। তবে গৌড় গোবিন্দের ব্যাপারে কিছু বলতে চাননি তিনি।

নর্থ সাউথের ডিসমিস শিক্ষার্থী  ছিলেন তরিকুল 

 

এদিকে নর্থ সাউথের বিভিন্ন অপকর্মের সিন্ডিকেটে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঢুকে পড়েন তরিকুল। তিনি ঘোষনা দেন প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে শুরু করে অনেক অফিস ও মন্ত্রীর দফতরে তার লোক আছে। যে কোন কাজ করিয়ে দিতে পারবেন। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রো-ভিসি নিয়োগের ব্যাপারে শুরু হয় প্রথম অ্যাকশন। সেখানে প্রেসিডেন্টের একটা অর্ডার বাতিল করে ভুয়া অর্ডার দেখিয়ে একজনকে প্রো-ভিসি হিসেবে ১৩ মাস চেয়ার দখলের মাধ্যমে তরিকুল নিয়োগ বাণিজ্য শুরু করেন। দেখতে থাকেন রঙ্গিন স্বপ্ন। তরিকুল সংশ্লিস্টদের জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অফিস, বিভিন্ন মন্ত্রী ও তাদের পিএস, ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে রয়েছে তার শক্ত অবস্থান। সেই কথা বলে নর্থ সাউথের সেই সিন্ডিকেট থেকে তিনি মোটা অংকের নজরানা নিয়ে নেমে পড়েন প্রো-ভিসি নিয়োগ তদবীরে। নানান চলচাতুরীর মাধ্যমে ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রফেসর জিইউ আহসানকে ( গিয়াশ উদ্দীন আহসান) প্রো-ভিসি চলতি দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেয় তরিকুল সিন্ডিকেট। এবার তরিকুল মোটা অংকের টু পাইস নিয়ে একক ভাবে ঝঁপিয়ে পড়েন নিয়োগ বাণিজ্যে।

দায়িত্বশীল সূত্রটি আরো জানান, প্রেসিডেন্ট প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেন প্রফেসর ইসমাইল হোসাইনকে। ২০১৮ সালের ২ জুলাই তাকে অফিসিয়াল চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু তরিকুল ও তার সহযোগীরা ওই চিঠি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় অফিস, ইউজিসি, শিক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিস্ট দফতরে যাতে না পৌঁছে সেই ব্যবস্থা করে। গায়েব করে দেয় সেই চিঠিটি তবে বিওটি এর একজন কর্মকর্তা ওই বিষয়ে ও ট্রাস্টের ২/১ জন জানতেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বোর্ড দ্রুত প্রফেসর ইসমাইল থেকে শারিরীক অবস্থা ভাল নয় এই বলে উড্রো লেটার নিয়ে নেন। একটি নতুন প্যানেল করে পুনরায় পাঠানো হয়। এভাবে শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে যখন আবার তাগিদ আসে কিভোবে জিইউ আহসান প্রো-ভিসি আছেন, পরে ২০১৮ সালের আগস্টে তিনি ১৩ মাস পর সেই লোভনীয় পদটি ছেড়ে দেন। ১৩ মাস প্রেসিডেন্টের সার্কুলারকে বৃদ্দাঙ্গলী দেখিয়ে লোভনীয় ও ভর্তি বাণিজ্যের কারণে প্রো-ভিসি হিসেবে দখল করে থাকা প্রফেসর জিইউ আহসান ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানিনা। চিঠি আমার কাছে আসে না। আমাকে ট্রাস্টি বোর্ড দায়িত্ব দিয়েছে। আমি সেই দায়িত্ত্ব পালন করেছি মাত্র। ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ তদবীরসহ রাজনৈতিক তদবীর তরিকুল করেছে বলে শুনেছি। তবে আমার কাছে কোন লিখিত অভিযোগ নেই। প্রে-ভিসি হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রনালয় ও ইউজিসির কোন চিঠি পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি তেমন কিছু বলতে রাজ হননি। এমনকি অবৈধভাবে ১৩ মাস একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রখেছেন কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার বিষয়টিও সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন তিনি।

তরিকুলের উত্থান:

তরিকুলের বাড়ি, মা ও বাবা


ভোলায় গত কয়েকদিন ধরে টক অব দ্যা টাউন এই বাড়িটি ঘিরে। কারণ ক’দিন আগেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নথি বের করে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি তরিকুল ইসলামকে ঢাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এই বাড়ির ছেলে মুমিনকে। তখনই ঘরে থাকা বাবা-মার কানে আসে ছেলে মুমিন নাকি ঢাকায় বিশাল নেতা, তার আছে লাখ লাখ টাকা, আর বড় বড় মানুষের সাথে ওঠাবসা। এছাড়াও ঢাকার কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রকল্পের কাজের তদবির করে দিবে বলে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আসে তরিকুল ইসলাম মুমিনের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ভোলার ভাঙা ঘরের ছেলেটি ঢাকায় এসে কীভাবে মহীরুহ হয়ে উঠলো। ভোলার স্থানীয় ছাত্রনেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তার পুরো নাম তরিকুল ইসলাম মুমিন। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর ২০১১ সালে ঢাকায় আসেন মুমিন। সর্বপ্রথম তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (ডিইউডিএস) সভাপতি আশিকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ক’টা দিন থাকার জন্য আশ্রয় চান। একই এলাকার হওয়ায় মুমিনকে সূর্যসেন হলের ৫৪১ নম্বর কক্ষে কয়েকদিন থাকতে দেন আশিক। এরমাঝেই মুমিন শুরু করে ছোট ছোট প্রতারণা। হলের নিচের দোকানে ফাও খাওয়া, শিক্ষার্থীদের বকা-ঝকা, তর্কাতর্কিসহ বিভিন্ন অভিযোগ শোনার পর তাকে হল থেকে বের হয়ে যেতে বলেন তৎকালীন ডিইউডিএস সভাপতি। তারপর অন্য হলে আশ্রয় নেওয়ার জন্য মুমিন টার্গেট করেন সেই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদকে। পরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন মামুন। কয়েকদিন ফুট-ফরমায়েশ খাটার পর মামুনই তাকে আশ্রয় দেন সুর্যসেন হলের তিনতলার দক্ষিণ কোণের একটি কক্ষে। সেই সময় থেকেই মুমিন তার এলাকা ভোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেয়া শুরু করেন। সূর্যসেন হলের কিছু নেতার সাথেও পরিচয় হয়। সূর্যসেন হলের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বরিশাল অঞ্চল বেশ শক্ত হওয়ায় সেই পক্ষের সাথে মিশে যান মুমিন।

প্রতারণা ও জালিয়াতিতে অভিযুক্ত মুমিনের বড় উত্থানটি হয় মূলত ২০১৬ সালে। ছাত্রলীগের সোহাগ-জাকির কমিটি আসার পর। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ ছাত্রজীবন শেষ হওয়ায় পর হল থেকে চলে যান। কক্ষটি দিয়ে যান মুমিনকে। মুমিন টার্গেট করে সম্পর্ক করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আবিদ আল হাসানের সাথে। তখন থেকেই নিজেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পরিচয় দিতে থাকেন তিনি। সেসময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেন। মুমিনের কার্যকলাপ ও কমিটিতে না থেকেও নাম ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে।কয়েকমাস পর মুমিন সত্যি সত্যি জায়গা পেয়ে যান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে অনেকটা গণহারে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সেক্রেটারি জাকির হোসেন। সেই কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য হন মুমিন। তখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে “বৃহত্তর বরিশাল গ্রুপ”-এর প্রভাবশালী হিসেবেই আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই নয়, ক্যাম্পাসের বাইরেও প্রসারিত হতে থাকে কার্যকলাপ। বাইরে গিয়ে নিজেকে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির বড় নেতা পরিচয় দিতেন তিনি।

তখন থেকেই নানা ধরনের জালিয়াতির সাথে জড়িয়ে পড়েন মুমিন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি, গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ ও তদবির বাণিজ্য শুরু হয় পুরোদমে। প্রকল্প পাশ করানোর কথা বলে বেশ কয়েকজন ঠিকাদার, ব্যবসায়ীর থেকে টাকা নেয়ার কথাও রিমান্ডে জানিয়েছেন তিনি। সবশেষ, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার নিয়োগের সময় চাঞ্চল্যকর জালিয়াতিতে ধরা না পড়লে হয়তো এই বাণিজ্যেও উতরে যেতেন মুমিন। ভোলায় বিভিন্ন জনকে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নেয়া ও প্রতারণার অনেক অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। সদর থানায় তার নামে আছে বেশ কয়েকটি মামলা। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আবিদ আল হাসানের দাবি, ‘মুমিনের সাথে আমার কোনো সখ্য ছিল না। আমি সভাপতি হবার আগেই সাবেক নেতা মামুনুর রশীদ ও ডিইউডিসের সাবেক সভাপতি আশিক ভাইয়ের রুমে থাকতো এটা জানতাম। মুমিন এসে মাঝে মাঝে মামুন ভাইয়ের আত্মীয় পরিচয় দিতো। সে ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিল না, এটা জানতাম না। আবিদ আল হাসান জানান, মুমিন যাতে কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা না পান সেজন্য দলের সেক্রেটারি জাকির হোসেনকে ২/৩ বার অনুরোধ করেন তিনি’।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন জানান,‘মুমিনের ব্যাপারে আমিও কয়েকজনকে সাবধান করেছি। সে কমিটির না হয়েও পদ ব্যবহার করতো শুনতাম। কিন্তু, তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রীর পিএস-এর তদবিরের জন্যই তাকে মৌখিকভাবে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ঘোষণা করি’। মামলা ও রিমান্ড নিয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিজয় বসাক তালুকদার বলেন, ‘একটি স্পর্শকাতর মামলায় সে রিমান্ড শেষে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। মূলত জালিয়াতিতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন সহকারীকে আটকের পর সে মুমিনের কথা জানায়। রিমান্ডে পাওয়া তথ্যগুলো পরে জানানো হবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা’। মুমিন আরো বড় পরিসরে ছাত্রলীগে আত্মপ্রকাশ করেন দুই বছর আগে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবর্তন হয়। সোহাগ-জাকির কমিটি বিদায় নিয়ে আসে শোভন-রাব্বানী কমিটি। তখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আবিদ আল হাসান হল থেকে চলে যাওয়ার পর মুমিনও হল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কারণ কয়েকবছর ধরে তিনি যেসব শিক্ষার্থী, নেতা-কর্মীদের সাথে প্রতারণা করেছেন, যারা মুমিনের হম্বিতম্বি ও অত্যাচার সহ্য করেছেন তাদের আক্রোশের মুখে পড়েন মুমিন। হল ছেড়ে বাসায় উঠলেও ক্যাম্পাসে প্রভাব কমেনি।

নতুন মিশনে মুমিনের যাতায়াত তখন শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হলের নর্থ ব্লকে। সেই ব্লকের ২০৮ নম্বর রুমে থাকতেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। রাব্বানীসহ ওই হলের বরিশাল অঞ্চলের অনেক নেতার সাথে সখ্যতা হয় মুমিনের। তাদের বাসায় ও পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু হলেও মাঝে মাঝে থাকতেন তিনি। হলের একাধিক সাবেক ছাত্রনেতা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্বরত একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানান, রাব্বানীর সাথে মূলত টাকার লেনদেন করেই সখ্যতা হয় মুমিনের। অন্তত ১৮ লাখ টাকা দিয়ে তখন কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহসভাপতির পদ পান মুমিন। মুমিন যে কমিটিতে সহসভাপতি হন, ওই কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর শোভন ও রাব্বানীর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন শতাধিক পদবঞ্চিত নেতা। তারা টিএসসিতে আমরণ অনশনও করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ওই কর্মসূচি থেকে সরে আসেন পদবঞ্চিতরা। ওই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাবেক কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন জানান, আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, টাকা দিয়ে পদ দেওয়ায় আমার যারা আজীবন ত্যাগী কর্মী তাদের বঞ্চিত করা হয়েছিল। মুমিনের ঘটনা সেটার বড় প্রমাণ। মুমিনসহ কেউ কেউ ছাত্রলীগের না হয়েও টাকা দিয়ে পদ পেয়েছে এমন কথা আমরা বারবার বললেও কেউ পাত্তা দেয়নি।

তবে এসব তথ্য অস্বীকার করেন ছাত্রলীগের সবশেষ পদত্যাগ করা সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। ফেসবুকের একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘মুমিনের জন্য এতো বড় বড় নেতার তদবির ছিল যে তাকে আমি পদ দিতে বাধ্য হই। কমিটি দেয়ার আগে তাকে একটি উপ-সম্পাদক করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু, এমন একজন তাকে সহসভাপতি পদ দেয়ার রেফারেন্স দেয় যে তার কথা উপেক্ষা করতে পারিনি’। মুমিনের এই উত্থান নিয়ে কথা হয় ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের সাথে। এসব তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন কারো না কারো শেল্টারে চলেছে সে। কিন্তু, তার আগে থেকে পদ থাকায় আমাদের কিছু করার ছিল না। সবশেষ মুমিন এমন জালিয়াতি করেছে তাতে সবাই স্তম্ভিত। ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে এতোদিন সে যা করেছে এর দায় সগঠন নেবে না। তাকে এরমধ্যে স্থায়ী বহিস্কার করা হয়েছে। মুমিনের সব অপরাধের বিচার করতে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও সব সহায়তা করা হবে বলে জানান জয়।

মুমিনের মা পারভীন বেগম বলেন, ‘এনজিওতে ছোটকাজ করে দুই ছেলেকে বড় করেছি। কখনো খারাপ কিছু শেখাইনি। বড় ছেলের নামে এতোকিছু জানতামও না। হঠাৎ সেদিন বাড়ি এসে তাকে আটক করে নিয়ে গেলো। বলে গেলো ঢাকায় বড় প্রতারণার হোতা সে’ অভিযুক্ত তরিকুল ইসলাম মুমিনের বাবা ৭৫ বছর বয়সী ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘এগুলোর কিছুই জানতাম না আমরা। তাকে পড়াশোনার জন্য পাঠিয়েছি ঢাকায়। মাঝে মাঝে অল্প ক’দিনের জন্য বাড়ি আসতো। বলতো ঢাকায় তার বড় কাজ, কিন্তু কী কাজ বলতো না। তার কাছে কখনো টাকা-পয়সা চাইনি আমরা। সবসময় বলতাম, পড়াশোনা করে মানুষ হও। আমাদের অল্প যা আছে তাতেই চলবে’।

ঢাকা, ১৯ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।