মৃতের আত্মীয়-স্বজনরা দ্রুত কবরস্থান ত্যাগ করেন‘কবর খুঁড়ি আর দোয়া দোয়া করি ’


Published: 2021-04-10 20:26:16 BdST, Updated: 2021-05-15 20:45:38 BdST

স্বর্নালী রহমান: আমি আর পারছি না। এহেবারে কেলান্ত। এতো কবর আগে কোন দিন খুদি না। অহন আর কুলায় না। আল্লারে মাফ কইরা দাও। আমাগো। এভাবেই মিজানুর রহমান নামের একজন গোরখোদক তার প্রতিক্রিয়া জানালেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কবর খুঁড়ছেন রাজধানীর রায়ের বাজার কবরস্থানে। ১০ এপ্রিল ভোর ৫টায় শুরু করেছেন কবর খোঁড়ার কাজ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও শেষ হয়নি তাঁর কর্মযজ্ঞ। এই কবরস্থানে সিটি করপোরেশনের নিযুক্ত ড্রেসার মোহাম্মদ আলী জানালেন, অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ আনা হয়। লামের স্বজনরা যদি চান কবরস্থানের সামনের মসজিদে জানাজা হয়। এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়ি চলে যায় ৮ নম্বর ব্লকে। এরপর নির্দিষ্ট কবরে দাফন করে দ্রুত কবরস্থান ত্যাগ করেন আত্মীয়-স্বজনরা।

বিশাল এ কবরস্থানের একপাশে একাই কাজ করছিলেন তিনি। একদিকে মরদেহ দাফন হচ্ছে অপরদিকে কবর খুঁড়েই যাচ্ছেন মিজানুর। কখন কয়টি মরদেহ আসছে সেদিকে যেন একটুও ভ্রুক্ষেপ নেই। জানতে চাইলে, মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে এক কথায় জবাব দিলেন, করোনায় মৃত্যু বাড়ছে। কবর খুঁড়ে কূল পাই না।

কবরখোদক মিজানুর বলেন, অনেকদিন ধরে এই কবরস্থানে কবর খুঁড়ি। একসাথে এতো লাশ আগে দেহিনাই। একদিকে খুঁইড়া শেষ করছি, আরেকদিকে দেখতাছি ভরে যাচ্ছে। এখন অহন পর্যন্ত পাঁচটা লাশ আইছে, আরো আইবো। এইগুলা সবই করোনা রোগী। আশেপাশে দেখিয়ে বললেন, চারপাশে যতো কবর দেখছেন এগুলো সব করোনা রোগীর। এখানে শুধু করোনা রোগীদের দাফন করা হয়। গত ক'দিনে পুরোটা ভরে গেছে। নতুন নতুন লাইনে কবর খুঁড়ছি আর ভরছে। আল্লাহ মাফ করো।

৮ নম্বর ব্লকে গিয়ে দেখা যায় আগে থেকেই প্রায় ১০০ কবর তৈরি করে রাখা হয়েছে। কবরস্থানে একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের পর পিপিই পরিহিত আল মারকাজুল ইসলামী হসপিটালের চার স্বেচ্ছাসেবী স্ট্রেচারে করে সাদা কাফনে মোড়ানো হোসনে আরা খানম (৬৫) নামে এক জনের লাশ গাড়ি থেকে নামান। দূরে দাঁড়িয়ে আছেন মৃতের স্বজনেরা।

এরপর পিপিই পরা চার জন মিলে লাশ কবরে নামান। বাঁশের পাটাতন সাজিয়ে মাটি দেওয়া হয়। পরে যারা দাফনে অংশ নিয়েছেন তারা কবরস্থানের বাম পাশের একটি খালিস্থানে গিয়ে পিপিই খুলে ফেলেন। শরীর জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করে নেন। এসময় পিপিইগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

একজন মৃতের নাতনির স্বামী সনি বলেন, তার দাদি শাশুড়ি করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ল্যাবএইড হাসপাতালে মারা যান। তাদের বাড়ি আদাবরের শেখেরটেকে। তিনি ২২ মার্চ অন্য একটি অপারেশনে হাসপাতালে ভর্তি হন। অপারেশনের পর আইসিইউতে তার শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। শুক্রবার সকালে তিনি মারা যান।

একই সারির পশ্চিম দিকের প্রথম কবরে দাফন করা হয় করোনায় মারা যাওয়া স্থাপত্যবিদ মাসুদ করিমকে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি গ্রিন লাইফ হসপিটালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। লাশ দাফনে অংশ নিতে আসা তার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে চাপা কান্না। মৃতের ভাতিজা আসিফ মাহমুদ জানান, করোনায় তার চাচা-চাচি আক্রান্ত হওয়ার পর চাচির নেগেটিভ এসেছে। কিন্তু চাচাকে আমরা আর বাঁচাতে পারলাম না।

শুকুর আলী নামের এক গোরখোদক জানান, মাঝে লাশ দাফন একেবারেই কমে গিয়েছিল। এখন তো রাত দিন কবর খুঁড়ছি। গত ৪/৫ দিন ধরে লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, আমরা আগে থেকেই কবর তৈরি করে রাখছি।

আরেক গোরখোদক আসলাম জানান, কবরস্থানে প্রায় ২৫/৩০ জন গোরখোদক রয়েছেন। এরা কেউই সিটি করপোরেশন থেকে পারিশ্রমিক পায় না। কবর দেওয়ার পর মৃতের আত্মীয়-স্বজনরা বকশিশ দেন। কবর দিতে বাঁশ ও বেড়া কিনে এনে তারাই সরবরাহ করেন। এসবের দাম আত্মীয়-স্বজনরা দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে একটা কবর দিতে ১ হাজার টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। তবে আত্মীয়রা খুশি হয়ে এর বেশিও টাকা দেন।

শনিবার (১০ এপ্রিল) দুপুরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত রাজধানীর রায়ের বাজার কবরস্থানে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত অংশে দাফন শেষ করে চলে যাচ্ছিলো একটি এম্বুলেন্স। মৃতদেহের সংগে ছিলেন মাত্র দুজন মানুষ।
আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে সারি সারি অসংখ্য কবর খুঁড়ে রাখা রয়েছে। এরমধ্যে এক পাশ থেকে লাইন ধরে কয়েকটি কবর দেয়া হয়েছে।

শেষ লাইনের শুরু থেকে ৪টি কবর ছিলো একদমই নতুন। মাটি দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো একটু আগেই এখানে দাফন হয়েছে। গোরখোদক মিজানুর জানালেন এগুলো সবই আজকের কবর। আশেপাশের নতুন কবরগুলো দেখিয়ে জানতে চাইলে মিজানুর বললেন, গতকালই ১০ জনের বেশি করোনা রোগীকে কবর দেওয়া হয়েছে। কখন যে কোনটা হচ্ছে দেখারও সুযোগ পাচ্ছি না। আমরাও জানিনা। কনো সময় কার লাশ আসে।

ঢাকা, ১০ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।