গিয়েছিলাম পাহাড় ও ঝর্নার মিলন মেলায়...


Published: 2019-10-15 19:32:04 BdST, Updated: 2019-11-17 04:34:30 BdST

রেজওয়ান সীমান্তঃ বাউন্ডুলে ছেলে-মেয়েগুলোর খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো একঘেয়েমি জীবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে যেখানে পাহাড় এসে নদীর সাথে মিলিয়ে গেছে। বলছিলাম 'আ ই আর' জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষারর্থীদের কথা।

তাদের ইচ্ছানুযায়ী অফিসিয়াল ভাবে আয়োজন করা হলো একটি ট্যুর এর। স্থান ছিল সুনামগঞ্জ টাঙ্গুয়ার হাওর, সিলেট এর জাফলং। তাদের মতো করে তারা ট্যুরের সকল পূর্ব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলো। তিন রাত দুদিনের জন্য সময় নির্ধারণ করা হলো।

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে তারা রাত ১১ টায় রওনা হলো ক্যাম্পাস থেকে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে, ৫০ জন শিক্ষারর্থীর দায়িত্ব দেওয়া হলো ইনস্টিটিউটের শিক্ষক জনাব কাজী ফারুক হোসেন কে, আর তিনি সকল কাজ সুষ্ঠূ ভাবে করার জন্য ৫০ এর মধ্যে থেকে বেছে নিলেন কিছু স্বেচ্ছাসেবকদের।

ক্যাম্পাস থেকে রওনা হয়ে বাসটি ঢাকা শহরের কোলাহল ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা সিলেট মহাসড়ক হয়ে। সকলের মধ্যে যেন এক উত্তেজনা কাজ করছে। আর তার ই বহিপ্রকাশ ঘটছে আপন, সারা, বৃষ্টি, রাগীব,শুভাসিষ, সিফাতদের গানে গানে। পুরো বাসটি মাতিয়ে রেখেছিল তারা, এ যেন বাঁধন হারা উচ্ছাসে মেতেছে। বাস তার নিজ গতিতে ছুটে চলছে।

কেউ কেউ আবার বাসের মধ্যে ই লুডুর আসর বসিয়েছে যে যার মত করে নিজের জার্নিটাকে উপভোগ করছে। এই ট্যুরের আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন ভাবী অর্থাৎ আমাদের স্যারের স্ত্রী। তিনিও আমাদের সকলকে অল্প সময়েই আপন করে নিয়েছিলেন আমাদের স্যারের মত করেই। হঠাত করেই ব্রেক কষলো গাড়ি! আর ঘোষণা এলো যাত্রা বিরতির।

বিরতি টা হয়েছিল পানসী হোটেল এ, সেখানে নেমে যে যার মত করে ফ্রেশ হয়ে হালকা কিছু খেয়ে আবার বাসে উঠলো। ঘড়িতে তখন রাত ২টা বেজে ৪৫ মিনিট, একটু ঘুমের প্রয়োজন তাই না? হ্যা সকলে তাই ই করলো। বাস আবার তার গতিতে ছুটে চললো সুনামগঞ্জের দিকে।

হঠাৎ করে ডাক পড়লো আপনের এই সীমান্ত উঠে পড়, হাল্কা করে চোখ খুলে দেখি পৌছে গেছি সুনামগঞ্জ সদরে, স্যার ঘোষণা দিলেন এখান থেকে সকালের নাস্তা করে আমরা বেড়িয়ে পড়ব তাহিরপুরের উদ্দ্যেশ্যে, নাস্তা করতে করতে বেজে গেল ১১ টা, নাস্তা করতে করতেই পূর্বে ঠিক করা ৪ টি লেগুনা এসে হাজির, যেটাতে করে আমরা চলে যাব আমাদের নির্ধারিত প্রথম স্পট টাঙ্গুয়ার হাওড়ে।

সকলে তাদের ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়লো লেগুনায় আর লেগুনা যখন চলছিল পিচ ঢালা পথ দিয়ে তার দুপাশেই ছিল শুধু পানি আর পানি আর খানিক দুরে দূরে দেখা যাচ্ছিল সুউচ্চ পাহাড়। মেঘ-পাহাড়-পানি আর লোকালয়ের যেন অপরূপ এক মেলবন্ধন। এই পরিবেশে মুন্নির খালি গলায় ফোক গান যেন এক দারুণ পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল। প্রায় ২ ঘন্টা পর এসে পৌছালাম তাহিরপুর বাজারে।

সবগুলো লেগুনা এসে পৌছানোর পর আমরা উঠে পড়লাম আমাদের নৌকা দুটিতে, আর শুভ ভাই, ওমর ভাই আর নৌকার বাবুর্চিকে নিয়ে স্যার বেড়িয়ে পড়লেন বাজারের উদ্দেশ্যে, দুপুরের জন্য খিচুড়ি আর হাসের মাংস আর রাতে ভাত,আলু ভর্তা,রুই মাছ আর ডিম, আইটেম শুনেই যেন জিভে জল এসে পড়লো।

বাজার শেষে বাবুর্চিরা ব্যস্ত হয়ে পড়লো রান্না করতে আর দুটি নৌকা চলতে শুরু করলো তাল মিলিয়ে পাশাপাশি। ইমন আর সীমান্ত কে দায়িত্ব দেওয়া হলো স্মৃতি গুলো ক্যামেরা বন্দী করতে আর মেয়রা তাদের নিজ নিজ মুঠোফোনে সেলফি তুলতে ব্যস্ত!! তুলবেই না কেন?? হাওরের চারিদিকে পানি আর নীল আকাশ যেন মিশেছে ওই পানির সাথেই।

কিছুদূর যেতেই দেখি নৌকা থেকে কে যেন ঝাপ দিল অথৈ পানিতে!!! সে আর কেউ নয় আমাদের সাইদ ভাই। পানি দেখে আর নিজের লোভ সামলাতে না পেরে ঝাপ ই দিয়ে দিলেন কিছু সময় সাতার কেটে উঠে আসলেন আমাদের নৌকায়।

এর মধ্যেই আমরা পৌছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ার এ, সেখানে নৌকা থেকে পানিতে নেমে সবাই গোসল করলো। সাতার না পারায় আমি, রাতুল ভাই সহ অনেকেরই সঙ্গী হলো ডিঙ্গি নৌকা। ভেসে ভেসে উপভোগ করছিলাম বাকিদের ঝাঁপাঝাঁপি। স্যার তাড়া দিলেন সকলকে গোসল শেষ করে নৌকায় উঠার জন্য, এরপর আমাদের গন্তব্য নীলাদ্রি লেক, সবাই নৌকায় উঠে ড্রেস চেঞ্জ করে রউনা হলো নীলাদ্রির উদ্দেশ্যে।

নীলাদ্রি লেকের কিছুটা দূরে দুটি নৌকা বাধা হলো সেখানেই নৌকায় বসে আমরা দুপুরের খাবার খাব।খিচুড়ির গন্ধে যেন ক্ষুধা আরো বেড়ে গেলো, সাথে ছিল হাসের মাংস, সবাই এক নৌকায় এসে খাওয়া দাওয়া শেষ করলো এরপর আবার শুরু হলো পথ চলা, কিছু সময় পরই এসে পৌছালাম নীলাদ্রী লেকে। নৌকা তীরে এসে বাধা হলো, এর পরের গন্তব্য গুলো ছিল বারিক্কাটীলা,রাজাই ঝর্ণা আর লাকমানছড়া।

ওই স্থান গুলোতে যেতে বাইক ছাড়া আর কোন পথ নেই তাই ঠিক করা হলো ২৪ টা বাইক, মেয়েদের সুরক্ষার্থে প্রতিটি বাইকে দেওয়া হলো একজন ছেলে একজন মেয়ে। এবার শুরু হলো বাইকে করে পাহাড়ি রোডে পথ চলা, সারিবদ্ধ ভাবে এগিয়ে চলছে প্রতিটি বাইক।

সকলের মধ্যেই কাজ করছে প্রাণচঞ্চলতা। এসে পৌছালাম বারিক্কাটিলা আর মুগ্ধ হলাম তার সৌন্দর্যে কিছু সময় সেখানে অবস্থান করে গেলাম রাজাই ঝর্ণার রাজকীয়তা দেখতে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ পানি, আর সবাই সেটা পান করছিল এমন ভাবে যেন সকলেই ক্লান্ত পথিক।

এরপর সর্বশেষ জায়গা লাকমান ছড়া সেখানে ভারত আর বাংলাদেশের প্রকৃতি হ্যান্ডশেক করছে যদিও আপনি চাইলেই সীমানার বাইরে যেতে পারবেন না। তখন সুয্যি মামা অস্তের পথে ,আমরা উঠে বসলাম বাইকে নীলাদ্রী লেকের উদ্দেশ্যে। লেকের পাড়ে নৌকা বাধা, আর চাদের আলো আর পানির শান্ত ঢেউয়ের শব্দ পরিবেশটাকে আরো মাধুর্য্য করে তুলেছে।

সারা রাত আমরা নৌকায় থাকব সে কারণেই চলছে রাতের রান্না। আর দুটি নৌকায় গুচ্ছ গুচ্ছ ভাবে বসেছে গান আর গল্পের আসর। কিছু সময় পর পর স্যার গিয়ে গিয়ে সকলের আড্ডাকে আরো প্রাণচাঞ্চল্য করে তুলছেন।

এভাবেই চলছিল সকলের জ্যোৎস্না বিলাস, কিছু সময় পর খাওয়ার জন্য ডাক পড়লো। খাবার শেষে আবার শুরু হলো আড্ডাবাজী আর স্যার ও এসে যোগ দিলেন আমাদের সাথে আর তখন নৌকাও বয়ে চলছে আবারো তাহিরপুর বাজারের উদ্দেশ্যে। আড্ডা দিতে দিতে রাত পেরিয়ে সকাল আর আমরা এসে নামলাম তাহিরপুরে আবারো সেই লেগুনায় করে রওনা দিলাম সুনামগঞ্জ এর উদ্দেশ্যে ,সেখানে সকালের নাস্তা করে রউনা দিলাম সিলেট(জাফলং) এর উদ্দেশ্যে।

তখন বাসে শুরু হলো যুদ্ধ!! ভয় পাবেন না এই যুদ্ধ ছিল গানের যুদ্ধ । বাসের দুই প্রান্ত ভাগ হয়ে শুরু হয় গানের কলি খেলা। ১ম প্রান্তের রিমন ভাই ওয়াসী ভাইদের কে হারিয়ে জয়লাভ করে বাসে শেষ প্রান্তের আপন, সীমান্ত, অয়ন,ফাহাদ দের দল।

এর মধ্যে এসে পৌছালাম সিলেট শহরে আর কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি সেরে রওনা হলাম জাফলং এর উদ্দেশ্যে। রাস্তা কিছুটা খারাপ হওয়ায় যাত্রাটা খুব মধুর ছিল না তবে সেই কষ্ট কেটে যায় জাফলং এর মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য দেখে। জাফলং থেকে নৌকা করে চলে গেলাম জাফলং ঝর্নার উদ্দেশ্যে।

সবাই সেখানে গিয়ে নিজেকে ঠান্ডা পানিতে ঠান্ডা করতে ব্যস্ত যেন সব ক্লান্তি ধুয়ে যাচ্ছে ঝর্ণার পানিতে। এরপর সেখান থেকে চলে যাই আমাদের সব শেষ গন্তব্য জাফলং জিরো পয়েন্টে। সেখানে আপনি খুব কাছ থেকেই দেখতে পারবেন ভারতের পাহাড় বেয়ে চলছে গাড়ী কিছু চাইলেও ছুতে পারবেন না।

সেখানে পাথরের গা বেয়ে খুব জোরেই বেয়ে চলছে পানি আর সকলেই ট্যুরের সব শেষটা উপভোগ করছেন নিজের মত করেই। সেখানেই সন্ধ্যা নেমে আসলো, আর আমরা সকলে চলে এলাম গাড়ী পার্কিং এরিয়ায় আর জাফলং যেতে সময় লাগার কারণে সেখানে দুপুরের খাবার খাই সন্ধ্যা নাগাদ। খাবার খাওয়া শেষে রউনা হই সিলেট বাস স্টান্ড এর উদ্দেশ্যে।

সেখানে পৌছাই রাত ৯.৩০ নাগাদ, কিছু সময় ঘোরাঘুরির পর রাত ১১ টায় আবার সকলে মিলে ক্লান্ত শরীর সিটের সাথে মিলিয়ে দিতেই যেন এক গভীর ঘুমে চলে গেলাম। আর ঘুম ভাঙতেই দেখি চলে এসেছি সেই চিরচেনা শহর ঢাকাতে।

এই স্মৃতি নিয়েই কেটে যাবে এই বছর, সামনের বছর আরো সুন্দর একটি ট্যুরের অপেক্ষায়।
সবশেষে বলতেই হয়, "বাংলা মা তোমার রুপে আমরা মুগ্ধ।"

এজন্যই হয়তো কবি বলেছেন "সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে,
সার্থক জন্ম মাগো তোমায় ভালোবেসে।"

লেখক: রেজওয়ান সীমান্ত,
আই ই আর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ১৫ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।