আনলাকি থারটিন অতঃপর প্যারিস (১ম পর্ব)


Published: 2019-05-17 17:56:33 BdST, Updated: 2019-06-19 11:30:43 BdST

ইমরুল কায়েসঃ পশ্চিমা বিশ্বের কোথাও কোথাও ইংরেজী থারটিন বা ১৩ সংখ্যাটিকে আনলাকি থারটিন বা অশুভ মনে করা হয়, যদিও এর বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের অসভিলের স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার এন্ড ফোবিয়া ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশ বহুতল ভবনে ১৩ তলা বলে কোন তলা নেই। বিপুল সংখ্যক হোটেল ও হাসপাতালে ১৩ নাম্বার রুম বলে কোন রুম নাই। আবার অসংখ্য হোটেল ও হাসপাতালে ১৩ ‘র অধিক গেট থাকলেও কোনো গেটে ১৩ নাম্বার সংখ্যাটি ব্যবহার করা হয় না।

অশুভ কিছু ঘটতে পারে এমন আশংকা থেকেই ১৩ নাম্বার সংখ্যাটি তারা ব্যবহার করেনা। আমেরিকায় প্রতিমাসের ১৩ তারিখে প্রায় ১০ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয় মানুষের ট্রেন ও বিমান যাত্রা বাতিল, কাজে যোগদান না করা এবং অপেক্ষাকৃত কম বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের জন্য। ইতালির জাতীয় লটারী প্রতিযোগিতায় ১৩ সংখ্যা দিয়ে কোন টিকিট নাম্বার রাখা হয় না, কারণ ১৩ সংখ্যার কোন টিকিট কেউ কিনতে চায় না। পুরো প্যারিসে ১৩ হোল্ডিং নাম্বার বিশিষ্ট কোন বাড়ী নেই। ১৩ সংখ্যাটিকে তারা আনলাকি বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করে। 

১৩ সংখ্যাকে নিয়ে নানা রকম মিথ বা কল্পকাহিনী প্রচলিত থাকলেও আনলাকি থারটিন কথাটির কিভাবে উৎপত্তি হয়েছে, কোথা থেকে এসেছে তার সঠিক কোন ভিত্তি নেই। প্রচলিত ধারণাগুলোর মধ্যে একটি হলো আনলাকি থারটিন একটি গ্রীক মিথ। গ্রীকরা আনলাকি থারটিন বা ১৩ সংখ্যাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করতো। গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে আছে ভালহল্লা ভোজ উৎসবে ১২ দেবতাকে নিমন্ত্রণ জানান হয়। বিবাদ, শত্রুতা ও অমঙ্গলের প্রতিভু দেবতা ‘লোকি’ আমন্ত্রণ না পেয়েও ঐ ভোজ সভায় জোর করে প্রবেশ করে মোট সংখ্যা ১৩ তে উন্নীত করেন। পরে ভোজসভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে অমঙ্গলের দেবতা লোকি’র প্ররোচনায় ভালোর দেবতা ‘বেলডার’ নিহত হন। প্রাচীন গ্রীক সমাজে এই মিথ বা রুপকথাই ১৩ সংখ্যাকে আনলাকি থারটিন মনে করার উৎস বলে ধরা হয়।

১৩ সংখ্যাটিকে অশুভ মনে করার পিছনে সর্বাধিক প্রচলিত ধারনা হলো যীশু খ্রীস্টকে ক্রুশে বিদ্ধ করার আগের রাতের কাহিনী। ওই রাতে যীশু ও তার ১২ জন শিষ্য মিলে মোট ১৩ জন একত্রে খাবার খেয়েছিলেন । এ রাতের খাওয়াকেই দ্যা লাস্ট সাপার বলা হয়। ১৩তম ব্যাক্তি হিসেবে যিনি দ্যা লাস্ট সাপারে অংশ নেন তিনিই বেঈমানী করে বিরোধীদের কাছে যীশুর অবস্থানের খবর ফাঁস করে দেন। পরে বিরোধীরা যীশুকে আটক করে শূলে চড়ান বলে খ্রীস্টীয় মতবাদে প্রচলিত আছে। শূলে চড়ানোর তারিখটি ছিল ১৩ই শুক্রবার। সেই থেকে খ্রীষ্টানরা ১৩ সংখ্যাকে অমঙ্গলজনক এবং শুক্রবার ১৩ তারিখ হলে সে দিনটিকে অশুভ হিসেবে বিবেচনা করে। যদিও যীশু বা ঈসা (আ:) কে শূলে চড়ানোর বিষয়টি ইসলাম ধর্ম সমর্থন করেনা। 

ছবিতে ইমরুল কায়েস

আবার হিন্দু ধর্মবিশ্বাসেও ১৩ সংখ্যাটির বিষয়ে বারণ রয়েছে। একই সময়ে, একই উদ্দেশ্যে এক জায়গায় ১৩ জনের একত্রিত হওয়ার বিষয়ে হিন্দু ধর্মে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বিশ্বাস করা হয় ১৩ সংখ্যাটি অশুভ হওয়ার কারণেই ১৩ মাসের চন্দ্র পঞ্জিকার বদলে ১২ মাসের সৌর পঞ্জিকার ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ কারণে ১৩ সংখ্যাকে হিন্দুদের অনেকেই আনলাকি মনে করেন। তবে এ বিশ্বাসের যে ভিত্তি নেই বা এটি যে একটি কুসংস্কার তার জ্বলন্ত প্রমাণ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী নিজেই। তাঁর যখন ১৩ বছর বয়স তখন ভারত স্বাধীন হয়। ১৩ তারিখেই তিনি শুভ্রা মুখার্জীকে বিয়ে করেন এবং স্ত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত একই ছাদের নিচে বহু বছর একত্রে পার করেন। রাষ্ট্রপতি হবার আগে বছরের পর বছর তিনি দিল্লী’র ১৩ নাম্বার তালকাটোরা রোডের বাড়ীতে পরিবার নিয়ে কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই বসবাস করেছেন। এক ১৩ ছেড়ে আরেক ১৩’র হাত ধরেন তিনি অর্থাৎ ১৩ নাম্বার তালকাটোরা রোডের বাড়ী ছেড়ে ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হন প্রণব মুখার্জী। ১৩ জুন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে প্রণবের নাম ঘোষণা করে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট।

মুসলমানদের নবী মুহাম্মদ (স:)এর নামের ইংরেজী বানান MUHAMMAD. এর আদ্যক্ষর M ইংরেজী বর্ণমালার ১৩ তম সংখ্যা। তাই অনেকে ১৩ সংখ্যাকে মুসলমানদের জন্য লাকি বলে থাকেন। আবার ইহুদীদের অনেকেই এবং মুসলিম বিদ্বেষীরা এ কারণে ১৩ সংখ্যাকে অশুভ বলেন। কিন্তু ইসলাম ধর্মের কোন গ্রন্থে ১৩ সংখ্যা বা অন্যকোন সংখ্যাকে লাকি বা আনলাকি বলে কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না। তাই ১৩ সংখ্যাকে আনলাকি মনে করার বিশ্বাসটিও মুসলমানদের মধ্যে অনুপস্থিত।

১৩ বা থারটিন লাকি অথবা আনলাকি যাই হোক না কেন তা নিয়ে আমার কখনো মাথাব্যাথা ছিল না,এখনো নেই এবং আমার বিশ্বাসও বিপরীতমুখী। তবে ১৩ সংখ্যা নিয়ে লাকি-আনলাকি তথ্য বা বিশ্বাস যাই প্রচলিত থাক না কেন ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর দিবসটি প্যারিস তথা ফ্রান্সবাসীর জন্য সত্যিই আনলাকি বা দুর্ভাগ্যজনক একটি দিন ছিল। নভেম্বরের ১৩ তারিখ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বাতা ক্লঁ ক্যাফে কাম থিয়েটার, জাতীয় স্টেডিয়ামসহ কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়।

এতে প্রাণ হারান ১৩০ জন। আহত হন আরো ৩৬৮ জন। এতো বড় সন্ত্রাসী হামলা ফ্রান্সের ইতিহাসে আর কখনো হয়নি। সেই ১৩ তারিখেই পাশের দেশ বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসও সন্ত্রাসী হামলার কবলে পড়ে । দুই হামলারই দায় স্বীকার করে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস বা ইসলামিক স্টেট। (চলবে...)

ঢাকা, ১৭ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।