বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখ, আলপনায় রাঙানো ভালোবাসার গল্প


Published: 2018-04-14 13:40:20 BdST, Updated: 2018-09-26 13:36:30 BdST

ফারহানা নিশি : গ্রীষ্মকাল আমার বরাবরই অপছন্দ। অপছন্দের কারণতো আছেই অবশ্য। তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরমে রীতিমতো দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। দিনের পুরোটা সময় ঘরে বসে থাকলে বাঁচি। কিন্তু ভার্সিটি পড়ুয়া এক মেয়েতো চাইলেই বাসায় বসে থাকতে পারে না। শিক্ষকরাতো ক্লাস উপস্থিতির নাম্বারটা এমনি দিয়ে দেবেন না! প্রায় প্রতিদিনই ক্লাসে যেতাম। ক্লাস শেষে আড্ডা দিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ বাসায় ফিরতাম। প্রায় সবাই প্রেম করতো। তারা তাদের সঙ্গীর সঙ্গে ঘুরতে চলে যেতো। আমার আবার সেই বালাই ছিল না বিধায় আড্ডা শেষে বাসায় চলে আসতাম। ছুটির দিনগুলো ঘরে বসে কাটাতেই ভালো লাগতো। তবুও বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে কোনো কোনো ছুটির দিনে হয়তো ঘুরতে যাওয়া হতো। এভাবেই কাটছিলো দিন।

তখন আমি অনার্স শেষ বর্ষে পড়ছি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এপ্রিল মাস। শুরু হয়ে গিয়েছে নববর্ষের তোড়জোড়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবরই অনুষ্ঠান হয়। আগের রাতে আলপনা উৎসব। তখন যেমন কাজ হয়, তেমনি বেশ মজাও হয়। তাই আমরা বন্ধুরা কখনো ওই রাত মিস করতাম না। গোলচত্বরের পর থেকে আলপনা সাজাতে ব্যস্ত হয়ে যেতাম। জুনিয়রদের তাগাদা দিতাম। তবে সেইবার আমি বেশ অসুস্থ ছিলাম। সকাল থেকেই শরীরটা বেশ খারাপ লাগছিল। প্রচণ্ড মাথাব্যথা আর দুর্বল লাগছিল। তবুও গিয়েছি বন্ধুদের কথা ভেবে। আমি না গেলে তারা আবার বেশ মন খারাপ করবে। কিন্তু দশটার পর থেকেই খুব অস্বস্তি হতে থাকে। কাজ করতে পারছিলাম না তাই। বন্ধুদের বলে আমি একটু হাঁটতে বের হই। সুমন, ফাতেমা, রাতুল অবশ্য আমার সাথে যেতে চাচ্ছিল। আমি সাফ মানা করে দেই। অনেক কাজ বাকি। এর মধ্যে আমার সাথে যাবার কোনো মানে হয় না। তাই একাই হাঁটতে শুরু করি। হেঁটে হেঁটে লাইব্রেরি ভবনের পাশ দিয়ে গোলচত্ত্বর পার হয়ে লেকের কাছে চলে যাই। দূর থেকেই দেখতে পাই অন্ধকারে একটা ছেলে গাছের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। হঠাৎ আমায় দেখতে পেয়েই কেমন যেন চমকে উঠে সিগারেটটা ফেলে দেয় সে। আমি কিছু একটা বলতে যাবো তখনই মাথাটা কেমন করে যেন ঘুরে ওঠে। অজ্ঞান হয়ে যাই আমি। জ্ঞান ফেরার পর দেখতে পাই সীমা, ইমন, চৈতী আমার উপর ঝুঁকে আছে। আর কেউ একজন তার কোলে আমার মাথাটা নিয়ে বসে আছে। মাথায় পানি ঢালছে অবিরত। আমি উঠে বসি। বন্ধুরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। নুজহাত কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে, "বেঁচে আছিস তাহলে! আধ ঘণ্টা ধরে পানি ছিটানোর পরও উঠছিস না দেখে ভাবলাম মরে গেলি কিনা! আমার যা ভয় করছিলো!" বলেই আবার কাঁদতে শুরু করলো। ও বরাবরই এমন। বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ আর সহজ-সরল। ওকে সামলে সবাইকে জেরা করতে শুরু করি। কীভাবে ওখানে গেলাম। তখন সবাই আমার পেছনে জবুথবু হয়ে বসে থাকা ছেলেটিকে দেখিয়ে বললো সে নাকি আমাকে পাঁজকোলা করে ওখানে নিয়ে এসেছে অজ্ঞান অবস্থায়।

গোলচত্বরের সামনে এসে বোকার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। রাতুল আমাকে ওই অবস্থায় দেখতে পেয়েই সবাইকে ডেকে এনে মুখে পানি ছিটাতে থাকে। বিশ মিনিট ধরেও জ্ঞান ফিরছিল না বিধায় ওই ছেলেটা নাকি আমার মাথায় পানি ঢেলেছে। এরপরই আমি চোখ খুলেছি। আমি তখন ছেলেটার দিকে ভালো করে তাকাই। হ্যাংলা একটা ছেলে। বয়স একুশ-বাইশের বেশি নয়। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বুদ্ধিদীপ্ত চোখের তারা যেন জ্বলজ্বল করছে। ফর্সা সেই ছেলেটার চেহারায় সরলতা স্পষ্ট। আমি তাকিয়ে আছি দেখে সে খানিকটা নড়েচড়ে বসে। তাকে জিজ্ঞেস করি, "নাম কী?" সরল মুখে উত্তর দেয়, "রাজিত। ইয়ে মানে রাজিত হাসান।" "কোন সেমিস্টার?" "ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড সেমিস্টার।" "এভাবে স্টুপিডের মতো মাথায় পানি ঢেলেছো কেন? গোসল করিয়ে দিয়েছো পুরো!" সে মাথা নিচু করে বলে, "স্যরি আপু। বুঝতে পারিনি।" পাশ থেকে সীমা বলে, "ছেড়ে দে তো! এভাবে বকিস না বাচ্চাটাকে। ও তোকে না আনলে কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতি আল্লাহ্ জানে!" এরপর আমি আর তেমন কিছু বলিনি। তখন বেশ সতেজ হয়ে উঠেছি। তাই আবারও বন্ধুদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কাজে নেমে পড়ি।

পরদিন নয়টার দিকে শাড়ি পরে ক্যাম্পাসে চলে যাই। বেশ উৎসবমুখর পরিবেশ তখন। ছেলেরা সবাই লাল পাঞ্জাবি আর মেয়েরা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরেছে। বেশ লাগছে দেখতে! আমার বন্ধুরাই প্রথমে দেখতে পেয়ে, "এই জয়িতা! এদিকে আয়... " বলে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। আমি সেদিকে এগোতেই একজনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। তাকিয়ে দেখি রাজিত। সাথে সাথেই সে স্যরি বলে। আমি ইটস ওকে বলে হাঁটতে শুরু করতেই শুনি পেছন থেকে রাজিত বলছে, "আপু একটা কথা!" আমি ঘুরে জিজ্ঞেস করলাম, "কী?" সে বোকা বোকা চেহারায় বললো, "আপনাকে বেশ সুন্দর লাগছে। তবে খোঁপায় যদি একটা বেলি ফুলের মালা জড়াতেন, তাহলে আরও বেশি সুন্দর লাগতো। তবে আপনার ইচ্ছে। কিছু মনে করবেন না প্লিজ।" বলেই সে চলে যায়। কেউ একজন কাঁধে হাত রাখতেই দেখি সীমা। জিজ্ঞেস করলো, "বাচ্চাটা আবার কী বলছিল রে?" আমি তেমন কিছু না বলে এড়িয়ে যাই। এমনটা কেন করলাম কে জানে!

দশটায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। অনেক পরিচিতই পারফর্ম করছে। উপভোগ করছি অনুষ্ঠান। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠছি। এরই মাঝে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আলো খেলা করতে শুরু করলো টের পাইনি। আড্ডা থামিয়ে আবারও মঞ্চের সামনে দলবেঁধে গেলাম আমরা কজন। হঠাৎ দেখলাম রাজিত গিটার নিয়ে স্টেজে উঠছে। আগে খেয়াল করিনি ওকে এতটা সুন্দর লাগছে। ফর্সা, শান্ত চেহারার সাথে লাল পাঞ্জাবিটা বেশ মানিয়েছে। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম রোদে ঝিলিক দিচ্ছে। এতে তার সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি। সামনের দিকে বসে ছিলাম বলে সেও আমায় দেখতে পেয়েছে। দেখেই মুচকি হাসি দিল। আমি অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিলাম। সে গাইতে শুরু করলেই আমি চমকে উঠি। এত মিষ্টি কণ্ঠ! গান শেষ হয়ে গেলেও আমার মুগ্ধতা কাটে না। কেমন যেন ঘোরের ভেতর চলে গিয়েছিলাম। শিমুল ধাক্কা দিয়ে বলে, "তোর হিরোর কণ্ঠতো সেই!" আমি রাগী মুখ করে বলি, "হিরো মানে!" শিমুল হাসতে হাসতে জবাব দেয়, "আরেহ্ দোস্ত, মজা নিলাম। এত সিরিয়াস হয়ে যাস কেন!" "আর মজা নিবি না" বলেই উঠে যাই আমি।

মাস খানেক কেটে যায়। সামনে ফাইনাল। পড়াশোনার চাপ প্রচুর। ভার্সিটি গেলে প্রায়ই রাজিতের সাথে দেখা হয়। কুশল বিনিময় ছাড়া তেমন কোনো কথা হয় না ওর সাথে। ওইটুকুকেই কেমন যেন প্রশান্তি মিলতো কোনো অজ্ঞাত কারণে। একদিন ক্লাস শেষে বন্ধুদের না জানিয়েই একাডেমিক ভবনের পেছনে গিয়েছি। কেননা, মাঝেমাঝে একা থাকার ইচ্ছে হয় খুব! একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে বসে পড়লাম। দূরের গাছগুলো দেখতে লাগলাম।
"আপু, ভালো আছেন?" তাকিয়ে দেখি রাজিত।
"হুম ভালো। তুমি কেমন আছো?"
"এইতো আছি!" কেমন যেন বিষণ্ণ মুখে উত্তর দেয় সে।
"মন খারাপ?"
"না। এমনি খারাপ লাগছে একটু।"
"আচ্ছা বসো এখানে। গল্প করি।"

সে বেশ অবাক হয়েই খানিকটা দূরত্ব নিয়ে আমার পাশে এসে বসে। অনেক কথা হয় আমাদের সেদিন। মনে হয় যেন একজন আরেকজনের না জানি কতদিনের চেনা! কখন যে সন্ধ্যে নেমে এলো টেরও পাইনি। আযান শুনতেই উঠে দাঁড়াই। বিদায় নেবার সময় জিজ্ঞেস করি, "আমায় দেখে সেদিন ওভাবে সিগারেটটা ফেলে দিলে যে!" সে অস্বস্তি নিয়ে উত্তর দিলো, "আমি আসলে অভ্যস্ত নই এতে। মাঝেমধ্যে খাই। আপনাকে দেখে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল, তাই ফেলে দিয়েছি।" আমি হেসে ফেলি। "আর কখনও খাবে না। ঠিক আছে?" সে মাথা চুলকে সরল মুখে জবাব দেয়, "আচ্ছা।"

এভাবে প্রায় প্রতিদিনই আমরা দেখা করতাম। হাঁটতাম লেকের পাশ দিয়ে। অনেক বিষয়ে কথা বলতাম আমরা। দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে আমাদের। একজন আরেকজনের নাম্বার নেই। এরপর রাতের পর রাত চলতো আমাদের অফুরন্ত কথা। একবারের জন্যেও বয়সের তফাৎটা আমার মাথায় আসতো না। অনুভূতির ব্যাপারগুলো সে এত ভালো বুঝতে পারতো যে, আমার মন যেমনই থাকুক সে বুঝতো। একদমই মন খারাপ করতে দিতো না কখনও। একটা সময়তো রাজিতের কাছে আমিই বাচ্চা হয়ে উঠি। সব পরিস্থিতিতে আমায় সামলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে সে। আমিও অবুঝ বালিকার মতো তার কাছে বিভিন্ন আবদার জুড়ে দিতাম। সেও আমার আবদার পূরণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতো। এভাবেই কেটে যায় একটা বছর। আমি তখন মাস্টার্সে পড়ছি।

আবার ভার্সিটিতে নববর্ষের অনুষ্ঠান হয়। সেই রোদেলা বিকেলে খোঁপায় বেলি ফুলের মালা জড়িয়ে দিয়েই রাজিত বলে, "তোমায় ভালোবাসি, জয়িতা।" আমিও ছলছল চোখে অবুঝ কিশোরীর মতো তার বুকে মুখ লুকিয়ে বলি, "অনেক ভালোবাসি।" এভাবেই শুরু হওয়া আমাদের অসম প্রেমের চার বছর চলছে। আমি চাকরিতে ঢুকেছি। রাজিত এখনও পড়াশোনা করছে। আর দশটা সম্পর্কের মতোই আমাদেরও খুনসুঁটি, টুকটাক মান-অভিমান চলে। তবুও আমরা ভালো আছি। ভালো আছি আমাদের পবিত্র সম্পর্কে। বন্ধুরা জানাজানির পর অবশ্য প্রথম প্রথম অনেকেই অনেক কিছু বলেছে। এ সম্পর্ক টিকবে না ইত্যাদি বিভিন্ন কথা শুনতে হয়েছে। তবুও আমি আর রাজিত দুজনেই শক্ত থেকেছি। কারণ আমরা জানি, আমাদের এ সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার। বয়সের অসমতার মতো নিতান্ত ক্ষুদ্র বিষয় এতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। যে সম্পর্কে একজনের প্রতি আরেকজনের রয়েছে অসীম বিশ্বাস আর ভরসা, সামান্য সামাজিক স্বীকৃতি তাতে অতটাও জরুরি নয়। হয়তো রাজিত আর জয়িতার ভালোবাসাই ভালোবাসতে শিখিয়ে যাবে এ প্রজন্মকে।

ফারহানা নিশি
শিক্ষার্থী

ঢাকা, ১৪ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।