মেধা তালিকায় শীর্ষে : মায়ের স্বপ্নপূরণে বুয়েট ছেড়ে মেডিকেলে


Published: 2019-02-14 01:03:51 BdST, Updated: 2019-03-25 00:27:10 BdST

আনিকা তাহসিন : এইচএসসি পরীক্ষায় আমার ইংলিশে এ প্লাস মিস যায়। ব্যাপারটা ছিল আমার জন্য এক বিরাট ধাক্কা। অনেক ভাল পরীক্ষা দেয়ার পরেও এরকম একটা দুর্ঘটনায় আমি খুব ভেঙে পড়ি। স্কুল কলেজে সবসময় ভাল ফলাফল করায় আমার জন্য এটা মেনে নেয়া কঠিন ছিল। আমি মূলত বুয়েটের জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম। গোল্ডেন মিস যাওয়ায় বুয়েটে পরীক্ষা দিতে পারবো নাকি তা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাই। তাই ভর্তি পরীক্ষার দুই মাস আগে থেকে মেডিকেলের প্রিপারেশন নেয়া শুরু করি। এইচএসসির সময় সাবজেক্টগুলা বেশ ভালভাবে পড়া থাকলেও এভাবে নতুনভাবে শুরু করা ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। সারারাত আমার ঘরে বাতি জ্বলত। অনেক সময় টেবিলের উপরেই ঘুমিয়ে যেতাম। প্রথম কিভাবে হলাম তা অনেক জায়গায় অনেক বার বলেছি, কিন্তু তার পেছনের গল্পটা কেন জানি কখনোই বলা হয়ে ওঠেনি। গল্পটা আমার বাবা-মার।

আমার যখন জন্ম তখন মা অনার্সের ছাত্রী আর বাবা মাস্টার্স। মা থাকত রোকেয়া হলে, বাবা শহীদুল্লাহ হলে। কারোরই তখন চাকরি নেই। ফলে প্রথম সন্তান আগমনের আনন্দের সাথে তাকে বড় করবে কিভাবে সেই চিন্তাটাও পেয়ে বসে। জন্ম নেওয়ার ৪ দিনের মাথায় আমি আমার নানুর কোলে চড়ে নানাবাড়ি পিরোজপুর চলে গেলাম। অনেকেই ভেবেছিল মা বাবা ছাড়া আমি কিভাবে বেড়ে উঠব। আন্ডারওয়েট ছিলাম, তার উপর ব্রেস্টফিডিংয়ের সুযোগ ছিল না। ল্যাক্টোজেনই ভরসা। বাবা টিউশনি করে টাকা পাঠাতো আমার জন্য। মা ছুটি পেলে আমাকে দেখতে আসতো, তাও কয়েক মাস পর পর।

আমার বয়স যখন তিন বছর তখন বাবা ঢাকায় একটা ছোট্ট বাসা পেল। চার দিন বয়সে যেই বাবা মায়ের কাছছাড়া হয়েছিলাম তাদের কাছে এতদিন পর আবার ফিরে গেলাম। মা তখন বিএড. কোর্সে। আমি প্রথমে ভর্তি হলাম ওয়াইডব্লিওসিএ গার্লস স্কুলে। স্কুলে যেতে খুব ভাল লাগতো। একেকদিন একেকজন নিয়ে যেতেন। কখনো চাচা, কখনো বাবার অফিসের পিওন, কখনো বাবা বা কখনো আবার মা। স্কুল থেকে ফেরার সময় বেশ সমস্যা হত। ছুটির পর অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত মায়ের ছুটির অপেক্ষায়। কিছুদিন পরেই মা ভিকারুন্নেসায় চাকরি পেয়ে যায় আর আমাকে সেখানেই ওয়ানে ভর্তি করিয়ে দেন। মা বাবার ব্যস্ততার কারণে ছোটবেলা থেকেই স্বাবলম্বী হতে শিখেছি।

বাসায় প্রায় সময়ই একা থাকতাম, নিজেই সব কিছু করতাম। তখন মোবাইল ফোনও ছিল না যে কোন প্রয়োজনে বা বিপদে মা বাবার সাথে যোগাযোগ করবো। তখন বেশ অভিমানই হত। আমার বন্ধুরা সবাই মা বাবার সাথে কত সময় কাটায় অথচ আমি সেই সুযোগ পাইনা। একটু বড় হয়ে বুঝলাম, তারা এতখানি কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে দেখেই আমি কত ভাল আছি। আমি আজ যতদূর এসেছি তার সবটুকু কৃতিত্ব আমার মা বাবার।

ছোট থাকতে মা মাঝে মাঝেই বাসায় চিরকুট রেখে যেতেন। ঠিকমতো খেয়ে নিয়ো, সময়মত গোসল করো এইসব আরকি। মেডিকেলে প্রথম হবার পরে মায়ের কাছ থেকে আরেকটি চিরকুট পাই। লেখা ছিল যে মার খুব ইচ্ছা ছিল মেডিকেলে পড়ার। তার স্বপ্ন তার মেয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণ হয়েছে। এই সুযোগ আমি যেন নষ্ট না করি। তাই বুয়েটে ১৬০তম (শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে পেরেছিলাম) হওয়া সত্ত্বেও ডিএমসিতেই থেকে যাওয়া। দেশের সেরা মেডিকেল কলেজের রোল ১ হওয়া সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ। তাই একজন গর্বিত ডিএমসিয়ান হওয়ার সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করিনি। যখনি হতাশ লাগবে, মনে করবে তোমার বাবা মা তোমার জন্য কত কষ্ট করেছেন। তাহলে যেই অনুপ্রেরণা পাবে, যেকোনো বাঁধা অতিক্রম করতে তা যথেষ্ট।

লেখক : আনিকা তাহসিন
পড়াশোনা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।