সহজেই ইংরেজি শেখার পদ্ধতিটা যেমন হওয়া উচিৎ


Published: 2019-05-17 13:05:59 BdST, Updated: 2019-08-18 23:58:18 BdST

মুহিত আহমেদ জামিল : আমি নিজেও প্রায় এমনটা ভাবতাম। সেদিন আমাদের শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রযুক্তি বিষয়ক সংগঠন বাইনারি'র রিসিপশন প্রোগ্রামে এসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, শাবিপ্রবির পরিচালক ড. হিমাদ্রী শেখর রায় স্যারও প্রায় একই কথা বললেন। সমস্যাটা আমাদের ইংরেজি ভাষা শেখার পদ্ধতিতে। পৃথিবীর যেকোনো ভাষা শিখতে হলে যেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে আমরা বেশীরভাগই মোটেই সেই প্রক্রিয়া ঠিকমত মেনে চলি না। ভাষা শেখার প্রক্রিয়া ঠিকমত মেনে চলি না বলেই আমাদের অনেকেই স্নাতক, স্নাতকোত্তর শেষ করেও ইংরেজিতে সঠিকভাবে দুই চারটা কথা বলতে পারি না। আচ্ছা ব্যাপারটা তাহলে খুলে বলা যাক।

আমরা বাংলাদেশিরা বাংলা ভাষা শিখি কিভাবে? প্রথমে আমাদের জন্ম হলো। আমরা কোন কথা বলতে পারি না। কিছুই জানি না। কিছু পড়ার সুযোগ কিংবা যোগ্যতা কোনটাই তখন অবধি হয়নি। জন্মের পরপর-ই আমরা লিখতেও পারি না। আমরা যেটা পারি সেটা হলো শুনতে। আমাদের আশেপাশে থাকা মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনরা যেসব কথাবার্তা বলে আমরা সেসব শুনতে পারি। সময় গড়ানোর সাথে সাথে আমরা একটু একটু করে বড় হই। আমরা তখনো শুনছি। আম্মু বলছেন, "বাবা/মা, আম্মু ডাকো আম্মু।" বাবা বলছেন, "সোনা বাবা/মাটা আমার, আব্বু ডাকো আব্বু।" আমরা খিলখিল করে হাসি না হয় কান্না জুড়ে দেই। এভাবে আস্তে আস্তে আমরা যখন আরো বড় হই তখন এক-আধটু ভাঙা ভাঙা কথা বলতে শুরু করি। আম্মু, আব্বু, ফুপু, খালা, চাচা, মামা এগুলো ডাকতে শুরু করি। দিন যায় আর আমাদের কথাবার্তা বলার পরিমাণও সময় সময় বাড়তে থাকে।

একসময় আমাদের স্কুলে ভর্তি করা হয়। স্কুলে গিয়ে আমরা স্যারদের লেকচার শুনি, বুঝতে চেষ্টা করি, নিজেরা বই পড়ি, ক্লাসে এটা-সেটা লেখি, মাঝেমাঝে প্রশ্নও করি। বাসায় এসে পড়তে বসি। ব্যাকরণ শিখি। পরীক্ষা এলে আমরা আবার পরীক্ষা দেই। নিজের আশপাশের মানুষের সাথে দৈনন্দিন বিভিন্ন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনেও আমরা নিত্যই এটা-ওটা কথা বলতে থাকি। এইতো এভাবেই আমরা আস্তে আস্তে বাংলা ভাষাটা আয়ত্ত করতে শিখি।

তাহলে আমাদের বাংলা ভাষা শেখার পদ্ধতিটা কী দাঁড়ালো? আমরা প্রথমে শুনি, তারপর সেটা বোঝার চেষ্টা করি, এরপর ব্যাকরণ না মেনে কিংবা না জেনেই কথা বলি, এরপর আমরা বই পড়ি এবং সর্বশেষ লিখতে চেষ্টা করি। লিখতে গিয়ে আমাদের ভালোভাবে ব্যাকরণ জানতে হয়। আমরা আস্তে আস্তে ব্যাকরণ শিখি। অর্থাৎ ব্যাকরণ শেখাটা হলো ভাষা শেখার চূড়ান্ত পরিণত ধাপ।

এবার আমাদের ইংরেজি শেখার পদ্ধতিটা একটু খেয়াল করুন। ভাষা শেখার সর্বশেষ এবং চুড়ান্ত ধাপ ব্যাকরণ শেখা দিয়েই আমরা ইংরেজি শেখা শুরু করি। একদম শেষের ধাপ প্রথমে এনে গোড়াতেই আমরা গণ্ডগোল বাঁধিয়ে ফেলি। ফলাফলটাও তাই খুবই বাজে হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে আমরা বছরের পর বছর ধরে ইংরেজি গ্রামার পড়ে কিছুই শিখতে পারি না।

আমরা গ্রামার শেখার পাশাপাশি ইংরেজিতে লেখি। লেখা হলো ভাষা শেখার প্রক্রিয়ার শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় ধাপ। এটা আমরা শুরুর দিকে করি। গ্রামার শেখা আর লেখার মধ্যেই আমাদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষা সীমাবদ্ধ। আমরা ইংরেজি শুনি খুব কম, পড়িও খুব কম আর সবচেয়ে কম আমরা বলি। যেটা কিনা সবচেয়ে বেশি করার কথা।

আমরা যে ইংরেজি খুব কম বলি এর পেছনে আমাদের নিজেদের অনিচ্ছার পাশাপাশি পরিবেশেরও বেশ খানিকটা প্রভাব আছে। আমরা ইংরেজিতে কথা বলতে গেলেই একদল মানুষ ভুল ধরতে শুরু করে। তোমার এটা হয়নি, ওটা হয়নি। শুধু ভুল ধরলে না হয় একটা কথা ছিল। আস্তে আস্তে সঠিকটা শিখে নেওয়া যেত। কিন্তু না, তারা ভুল ধরার পাশাপাশি ভুল ইংরেজি বলা নিয়ে হাসাহাসিও করে। ব্যাস, আপনার খুব উৎসাহ নিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলার প্রচেষ্টাটা শুরুতেই থেমে গেল। আপনি বুঝে গেলেন গ্রামার না জেনে ইংরেজি বলা ঠিক না। যেখানে ব্যাকরণ না জেনেই আপনি বাংলা শেখা শুরু করেছিলেন। এবং এক্ষেত্রে এখন আপনি মোটামোটি সফলও। সত্যি কথাটা হলো, ব্যাকরণ না জেনেও একজন মানুষ ভাষা ব্যবহার করতে পারে।

ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা না। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এই ভাষা শুরুতে ঠিকমত পারার কথা না। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমরা কি বাংলা ভাষা পুরোপুরি বিশুদ্ধভাবে চর্চা করতে পারি? পারি না।

আমরা সবাই বুঝি ইংরেজি ভাষা শিখতে হলে বন্ধু, পরিবার, শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগীতা দরকার। কিন্তু বাস্তবে কেউ সহযোগীতা চাইলে আমরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে দেই। থামিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা তার ইংরেজিতে ভুল ধরতে শুরু করি। তাকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে না।

আমাদের দেশে মনে করা হয় ইংরেজিতে কথা বলতে হলে আপনাকে অবশ্যই গ্রামার জানতে হবে। ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষক সবাই শুধুমাত্র গ্রামার শেখার ওপর গুরুত্ব দেন। তারা মনে করেন ভালো গ্রামার জানলেই ভালো ইংরেজি শিখা হয়ে যাবে। আদতে এটা একটা ভুল ধারণা বৈ আর কিছু না। বই শিখে যেমন সাইকেল চালানো শেখা যায় না, ঠিক তেমনি গ্রামার পড়েও ইংরেজি শেখা যায় না। এই কথাটা যে কতটুকু সত্য সেটা আপনার চারপাশে চোখ মেলে তাকালেই বুঝতে পারবেন। আমরা শিক্ষাজীবনের বিশাল একটা সময় ব্যয় করি গ্রামার শেখার পেছনে। আর্টিকেল, প্রিপজিশন, রাইট ফর্ম অব ভার্বস এসবের নিয়ম আমরা সেই স্কুল লাইফ থেকেই মুখস্থ করতে শুরু করি। পরীক্ষায় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে হয়তো আমরা বেশ ভালো মার্কসও পেয়ে যাই। কিন্তু আমাদের গ্রামার শেখার মূল উদ্দেশ্যটা কি তাহলে শুধু পরীক্ষায় ভালো মার্কস পাওয়াই? কারণ আমরা অনেকেই তো স্নাতক, স্নাতকোত্তর শেষ করেও দু'চার লাইন বিশুদ্ধ ইংরেজি বলতে পারি না।

আসলে আমাদের গ্রামার শেখার আগে ভাষাটা শেখা দরকার। ইংরেজিতে মোটামুটি মানের কথা বলতে শেখার পর, একটা ইংরেজি লেখা পড়ে সেটার মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারার পর, একটা ইংলিশ লেকচার শুনে সেটা বুঝতে পারার পর, সর্বোপরি দুই চার লাইন ইংরেজি লিখতে জানার পর তবেই আমাদের গ্রামার শেখা শুরু করা উচিত। আমরা গ্রামারের নিয়মকানুন শিখে এসে তারপর ভাষা শিখব না, আমরা ভাষা শিখে তারপর গ্রামার শিখব। যাতে আমরা সঠিকভাবে ইংরেজি ভাষাটা চর্চা করতে পারি। কারণ বাংলা ভাষাতো আমরা এভাবেই শিখেছি। ছোটবেলায় যখন আমরা কথা বলতাম তখন তো আমরা সমাস, প্রত্যয়, পদ, ক্রিয়া এসব জেনে কথা বলতাম না। এসব আমরা বড় হয়ে আস্তে আস্তে শিখেছি। সত্যি বলতে কি, এখনও শিখছি।

আমরা যদি ভালোভাবে ইংরেজি বলতে চাই আমাদের প্রথমে ভালোভাবে ইংরেজি শুনতে হবে। মানে আমাদের লিসেনিং পাওয়ারটা শক্ত করতে হবে। আমরা যদি ইংরেজিতে ভালোভাবে লিখতে চাই তাহলে প্রথমে আমাদের ভালোভাবে ইংরেজি পড়তে জানতে হবে, সেটা বুঝতে জানতে হবে। আসল কথাটা হলো, সবকিছু হবে নতুন একটা ভাষা শেখার প্রক্রিয়া মেনে। শেষের ধাপ প্রথমে শিখব, প্রথম ধাপ শেষে শিখব এসব করলে আমাদের জীবনেও ইংরেজি ভাষা শেখা হবে না।

খুঁটি ছাড়া বিল্ডিং দাঁড়িয়ে থাকে না। আপনি যতই গ্রামার শেখেন মানে বিল্ডিংয়ে তলা বাড়াতে থাকুন না কেন, আপনার লিসেনিং, আন্ডারস্ট্যান্ডিং, স্পিকিং, রিডিং, রাইটিং মানে বিল্ডিংয়ের খুঁটি যদি না থাকে তাহলে বিল্ডিংটা কখনই দাঁড়াতে পারবে না। মানে আপনি আসলে কখনই ইংরেজি ভাষাটা শিখতে পারবেন না। সবচেয়ে বড় কথাটা হচ্ছে, ইংরেজি শেখাটা পুরোটাই চর্চার বিষয়। আপনি যত বেশি চর্চা করবেন তত বেশি ইংরেজি শিখবেন। আর হ্যাঁ, ইংরেজি কেন আপনাকে এত গুরুত্ব নিয়ে শিখতে হবে এটা তো নতুন করে বলার কিছু নাই। ইংরেজি না জানলে আজকের যুগে চলাফেরাই কঠিন, চাকরি-বাকরি করা, নিজেকে প্রমাণ করা এসব তো অনেক দূরের কথা।

শেষকথা, নিজেদের আরো দক্ষভাবে গড়ে তুলতে আমরা গুরুত্বসহকারে ইংরেজি শিখব কিন্তু কোনভাবেই বাংলা ভাষাকে অবহেলা করে নয়। আমরা ভালো করে বাংলাটাও শিখব। শিকড়কে ভুলে গিয়ে নয়, শিকড় সাথে নিয়েই যেন আমরা শিখরে পৌঁছাই।

লেখক : মুহিত আহমেদ জামিল
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ঢাকা, ১৭ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।