মাত্র ২৩ হাজার টাকায় দুই শিশু সন্তান বিক্রি, তোলপাড়


Published: 2021-02-26 23:53:36 BdST, Updated: 2021-04-12 04:21:32 BdST

কুড়িগ্রাম লাইভ: অমানবিক। পাষান্ড। নিজ সন্তানকে কোন মা-বাবা বিক্রি করতে পারে না। পারেনা অন্যের হাতে ন্যাক্কারজনকভাবে তুলে দিতে। কিন্তু হয়েছে। বিষয়টি বেদনাদায়ক। দু:খজনক। এনিয়ে চলছে গোটা জেলায় নানান সমালোচনা। চলছে তোলপাড়। এলাকাবাসী সূত্রে জানাগেছে কুড়িগ্রামের উলিপুরে অভাবের তাড়নায় দুই শিশু সন্তানকে ২৩ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে এক অসহায় দম্পতির বিরুদ্ধে।

উপজেলার বুড়াবুড়ী ইউনিয়নের শিমুলতলা এলাকার ফকির মোহাম্মদ গুচ্ছ গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। এনিয়ে পাড়া-মহল্লা ও অলিতে-গলিতে চলছে সমালোচনা। এলাকাবাসী আরো জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে বুড়াবুড়ী ইউনিয়নের মন্ডল পাড়া গ্রামের মৃত মজিদ মন্ডলের ছেলে খলিল মন্ডলের (৪৫) সাথে বিয়ে হয় একই ইউনিয়নের শিমুলতলা গ্রামের কৃষক মোচকেন আলীর মেয়ে মর্জিনা বেগমের (৩৬)।

খলিল মন্ডলের কোনো বসতভিটা না থাকায় স্ত্রী মর্জিনা বেগমের চাচা রুস্তম আলীর জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা দেন। ২০১৩ সালে শিমুলতলা এলাকায় সরকারিভাবে স্থাপিত ফকির মোহাম্মদ গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্পে তারা একটি ঘর বরাদ্দ পান। সেখানে থেকে স্বামী-স্ত্রী দুজন দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। তাদের সংসারে কলিমা (৯), মিজানুর (৭), ইছানুর (৬) ও খুশি (৪) চার সন্তান রয়েছে বলে জানাগেছে।

এদিকে বিয়ের পর খলিল মন্ডল নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। কোনো কাজকর্ম না করতে পারায় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারেন না। এর মধ্যে খলিলের স্ত্রী মর্জিনা প্যারালাইজড হয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন। তারা গত দুই বছর আগে গত ১৫ মাস আগে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিলে তাকে তিন হাজার টাকায় কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার শুলকুরবাজার এলাকার এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে বিক্রি করে দেন।

আড়াই মাস আগে জন্ম নেয়া আরেকটি কন্যা সন্তানকে কুড়িগ্রাম পৌর শহরের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন ওই দম্পতি। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে খলিল ও মার্জিনার পুরো পরিবারের। কখনো বাবার বাড়ি থেকে সামান্য চাল অথবা প্রতিবেশীদের দেয়া খাবারে দিন কাটে।

অভাবের সংসার ও শারীরিকভাবে অসুস্থ দম্পতি সন্তানদের ভরনপোষণ ও খাবারের যোগান দিতে না পারায় প্রথম কন্যা সন্তান কলিমাকে (৯) রংপুরে কাজে দিলেও বয়স কম বলে তাকে ফেরত পাঠায় ওই লোক। এ ব্যাপারে গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দা বানেছা বলেন, ‘ওদের চারটি সন্তান বাড়িতে আছে ও দুটি সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন।

এলাকাবাসী আরো জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনই প্রতিবন্ধীর মতো। তাই ওরা কোন কাজ কর্ম করতে না পারায় সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে অক্ষম। তাই তারা দুটি সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন।’ একই এলাকার প্রতিবেশী জিয়া বলেন, ‘ওদের কোনো জায়গা জমি নেই। ওরা আবাসন প্রকল্পে ঘর পেয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই পঙ্গু। মেম্বার, চেয়ারম্যান ও প্রতিবেশীরা যে সহযোগিতা প্রদান করেন তা দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে। অভাবের কারণে দুটি সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন তারা।’

রূপা নামে আরেক প্রতিবেশী বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী দুজনই প্রতিবন্ধী। ছয়টি সন্তান। একটি সন্তানকে কুড়িগ্রামে ও অপর একটি চর এলাকায় দত্তক দিয়েছেন। স্ত্রী মর্জিনার এক হাত ও এক পা অবশ। তাই সে হাঁটতে পারে না। খাবারের অভাবে একবেলার খাবার তিনবেলা খায়।’ এই অবস্থা নিরুপায় হয়ে এই কান্ড ঘটিয়েছে।

এদিকে ওই মর্জিনার বাবা মোচকেন আলী বলেন, ‘আমার জামাই ও মেয়ে তারা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতে পারে না। খাদ্যের যোগান দিতে পারে না। এই কারণে দুটি সন্তানকে তারা দত্তক দিয়েছে।’ খলিল মন্ডল জানান, ‘আমি অসুস্থ। কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। কোনো জায়গা জমিও নেই। সন্তানদের খাবার দিতে পারি না। তাই সন্তানকে বেছে দিছি।

এদিকে এ ব্যাপারে খলিলের স্ত্রী মর্জিনা বলেন, ‘আমাদের ৬টা সন্তান। অসুস্থতার কারণে আমরা কোনো কাজ করতে পারি না। তাই সন্তানদের লালন-পালন করতে পারি না। তাই দুইটা সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছি। তারা কিছু টাকা দিয়েছে। তা দিয়ে কয়েক দিন খেয়েছি ও চিকিৎসা চালিয়েছি।’

উলিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন মন্টু এ বিষয়ে বলেন, ‘আমি খলিল মন্ডল ও মর্জিনা বেগম দম্পতির একটি দুই মাস বয়সী ও একটি পনের মাস বয়সী সন্তান বিক্রির বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম।

ইউপি চেয়ারম্যান যদি ওই পরিবারকে সহায়তা দেয়ার সামর্থ্য না রাখেন তাহলে আমাদের বিষয়টি অবগত করলে তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার চেষ্টা করতাম।’ উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানতাম না। আমি উপজেলা চেয়ারম্যানকে বলবো তিনি যেন ওই পরিবারের যাবতীয় খোঁজ খবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন ‘ আমরা চাই না এধরনের কাজ। আমাদের কাছে উনারা সহায়তা চাইলে আমরা সব ধরনের সহায়তা দিতে পারতাম।

ঢাকা, ২৬ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।