করোনায় বিপর্যস্ত এইসএসসি পরীক্ষার্থীদের দিনলিপি


Published: 2020-06-27 19:30:24 BdST, Updated: 2020-08-14 05:33:48 BdST

চারদিকে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চলছে লকডাউন। সংক্রমনের ঝুঁকি এড়াতে ৬ আগস্ট পর্যন্ত সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই করোনা মহামারি মহাবিপর্যয় নিয়ে এসেছে শিক্ষাঙ্গনে। এরই মধ্যে এসএসসির ফল ঘোষণা হয়ে গেছে। আর এইচএসসি পরীক্ষা কবে হবে-তার নিশ্চয়তাও নেই। মূলত এই দুটি পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে শিক্ষার্থীরা। উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকা এসব শিক্ষার্থীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে ভুগছেন, হতাশা আর অনিশ্চয়তা। আর তাদের বিপর্যস্ত দিনলিপি তুলে ধরছেন
আমাদের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান।

উচ্চ মাধ্যমিক বা এইসএসসি হলো উচ্চ শিক্ষার প্রবেশদ্বার। এইসএসসি পরীক্ষার ফল উচ্চ শিক্ষায় প্রতিষ্ঠান ও স্নাতকের বিষয় নির্ধারণীর ভূমিকায় কাজ করে। ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক সকলের দৃঢ় মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে এইসএসসি পরীক্ষার দিকে। দুই বছরের ক্লাস, যাচাই পরীক্ষার পাঠ চুকিয়ে এইসএসসি পরীক্ষা যখন কড়া নাড়ছে ঠিক তখনই দেশে হানা দিলো বিশ্ব-মহামারি করোনাভাইরাস(কোভিড-১৯)। শিক্ষার্থীদের ছন্দময় জীবনকে করে দিয়েছে ছন্দহীন। সাম্ভাব্য পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকায় পরীক্ষার্থীরা আজ উদ্ধিগ্ন ও হতাশ। এই অনিশ্চয়তায় পরীক্ষার্থীদের দিন কেমন কাটছে? হাঁটতে পারছে কি স্বাভাবিক ছন্দে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মনে।

ফৈজিয়া হক অপর্ণা,বিএএফ শাহীন কলেজ, পাহাড়কাঞ্চনপুর। জীবন ছন্দময়। ছন্দের মধ্যে হাঁটা তার ধর্ম। আমাদেরও তাই। ২০১৮ সালে এসএসসির ফলাফলের পর নতুন ছন্দ নিয়ে একবুক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলাম কলেজ প্রাঙ্গনে। সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল।দেখতে দেখতে এইচএসসি পরীক্ষাও চলে এসেছিল। সবাই যখন পরীক্ষা নামক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখনই হঠাৎ যেন আমাদের পুরো সিলেবাসটাই পাল্টে গেল।যেখানে পরীক্ষার হলে বসে লড়াই করার কথা সেখানে আজ ঘরে বসে জীবন বাঁচানোর লড়াই করে যাচ্ছি। এক অজানা আশঙ্কা ভর করেছে আমাদের মাঝে। এই পরিস্থিতিতে অফুরন্ত সময় পাওয়ার পরও আগের মতো পড়ার আগ্রহটা আর নেই। পড়ার ছন্দটা হারিয়ে ফেলেছি। যদিও নিয়ম করে বই নিয়ে বসছি ঠিকই কিন্তু পড়ার নামে লবডঙ্কা। বাবা - মাও আর আগের মতো পড়তে বলে না। আসলে কারোর মনের অবস্থা আর আগের মতো নেই। এই পরিস্থিতি কবে ঠিক হবে, কবে আবার পরীক্ষার রুটিন দেবে সেই অপেক্ষাতেই দিন কাটছে। আমরা সবাই চাই আগের পরিবেশে ফিরে যেতে।এখন শুধু একমাত্র আল্লাহ'তায়ালাই জানেন কবে সব ঠিক হবে। একটি সুন্দর করোনা মুক্ত সকালের অপেক্ষায় আমি,আমরা সবাই।

সুমাইতা বিনতে রহিম আফনান, কক্সবাজার সরকারি কলেজ : করোনাকালীন গৃহবন্দী জীবন ও আতঙ্ক অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাচ্ছে। একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের পর পরীক্ষা স্থগিত হওয়া ও করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। পড়ার প্রতি মনোযোগ ও আগ্রহ অনেকটা কমতে শুরু করেছে। সাথে সাথে হারিয়ে ফেলছি আত্মবিশ্বাস। তাই আবার নতুন উদ্যমে শুরুর চেষ্টা করছি। পরীক্ষা প্রস্তুতির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছি। তবুও দিনশেষে কখনো হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। হতাশাকে কাটিয়ে উঠতে বিনোদনের অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছি শিক্ষাকে। মোবাইল ফোনে শিখছি গ্রাফিক্স ডিজাইন ও পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন। সর্বদা প্রার্থনা করছি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যেন অামরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আকাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করতে পারি।

গোলাম ফারুক অভি, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, তেজগাঁও। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে প্রকৃতি সৃষ্ট প্রাণনাশক করোনা ভাইরাস(কোভিড-১৯)। চীন থেকে উৎপত্তি হওয়া এ ভাইরাস এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে, প্রতিদিন মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ, আমাদের দেশ(বাংলাদেশও) এ ভাইরাসের আগমন ঘটে মার্চ এর মাঝামাঝি সময়ে, আর এই মহামারির কারনে বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছি আমরা (এইচ এস সি) পরিক্ষার্থীরা, এপ্রিল ২০২০ এ আমাদের ফাইনাল পরিক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও এই মহামারির কারণে এখন এটি কবে হবে, আদৌও হবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। এই সময়ে আমি আমার দিক থেকে মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতায় ভুগছি। এখন না পারছি ভালোভাবে পড়তে, না পারছি বই বিমুখ থাকতে। প্রায় তিন মাস ধরে গৃহবন্দি জীবন পার করছি ; জানা নেই কবে হবে পরীক্ষা ; কবে কাটবে এ আধার ; কবে হবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। এভাবেই অনিশ্চয়তায় কাটছে আমার জীবন। প্রত্যাশা খুব শীঘ্রই এ আঁধার কাটুক ; খুব শীঘ্রই আলো ফিরে আসুক পৃথিবীর বুকে; শান্ত ও সতেজ হোক এ বসুধা।

তানিশা নাওয়ার, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি কলেজ। সামনে এইসএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষা শুরুর আগে যেই সিরিয়াসনেস ছিল এখন তার ১% ও নেই। তবে পড়াশুনা আমার জন্য বসে থাকবে না। হুট করে কখন যে পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিবে টেরও পাবনা। আর রুটিন দিলে কেমন বন্ধ দিবে তা খুব ভালই বুঝতে পারছি। তাই মাঝে মাঝে বই খাতাগুলো একটু নাড়াচাড়া করি। পদার্থ বিজ্ঞান, জীব বিজ্ঞান ও রসায়ন বিজ্ঞানের নোটসগুলো রিভিশন দেই। ম্যাথগুলো একটু প্র‍্যাক্টিস করছি।

তবে টানা ৪মাস বাসায় থেকে একঘেয়েমি লেগে যাচ্ছে তাই নিজে নিজের বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপ করার চেষ্টা করি। অনলাইনে কিছু ক্লাস করছি। গান শুনি, নাচটা নতুন করে আবার একটু একটু করে শুরু করছি। গল্পের বই পড়ার নেশাটা ছোট্টবেলা থেকেই ছিল। এখন যেহেতু কিনতে বাহিরে যেতে পারছি না তাই পিডিএফ পড়ার চেষ্টা করছি এবং মাঝে মাঝে অনলাইনে অর্ডার করছি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি ভিডিও কলে। এছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও দেখি শিক্ষামূলক। পাশাপাশি লেখালেখির চর্চা করছি।

সায়েম বিন হোসেন আকাশ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ। পৃথিবী এখন করোনাভাইরাস নামক মহামারীতে আক্রান্ত। তন্মধ্যে আমাদের দেশ ও রয়েছে। এই মহামারীতে স্তরভেদে বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন হয়েছে। আমি একজন শিক্ষার্থী এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী। শিক্ষার্থী হিসেবে এই মহামারীতে আমাদেরও দৈনন্দিন জীবন পরিবর্তিত হয়েছে। এই মহামারীতে দীর্ঘ সময় বন্ধ পেয়ে আমাদের সুবিধা এবং অসুবিধা দুইটায় হয়েছে। আমরা আমাদের পড়া রিভিশনেরজন্য অধিক সময় পেয়েছি। কিন্তু সুবিধার চেয়ে অসুবিধার পরিমাণ বেশি বলে আমার মনে হয়। এই দীর্ঘ অনিশ্চিত ছুটিতে আমাদের পড়াশোনার গুরুত্ব হ্রাস পাচ্ছে। পরীক্ষার নির্দিষ্ট কোন সময় না থাকার কারণে আমরা দোটানায় পড়েছি।

ফলে একদিকে আমাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে অন্যদিকে আমরা মানসিক চাপে আছি। গ্রামাঞ্চলে থাকার কারণে শিক্ষকদের সঠিক পরিচর্যা আমরা পাচ্ছি না। যার ফলে রিভিশনে সমস্যা হচ্ছে আমাদের। সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা মাধ্যমিক লেভেলের শিক্ষার্থীদের জন্য। উচ্চমাধ্যমিক লেভেলের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুরুপ কোন
ব্যবস্থা গ্রহন করেনি। ফলে আমরা সঠিক দিকনির্দেশনা এবং এই সময়কে কিভাবে সঠিক ভাবে কাজে লাগানো যায় তার পরামর্শ পাচ্ছি নাহ। এইচএসসি পরীক্ষার পরেই আমাদের জীবনের লক্ষ নির্ধারনী ভর্তি পরীক্ষা। সেটা নিয়েও আমরা দ্বিধায় আছি৷ এইচএসসি পরীক্ষার পর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া নিয়েও উৎকন্ঠিত লাখো শিক্ষার্থী। এই মহামারী কাটিয়ে প্রাণোজ্জ্বল জীবন আমরা আবার ফিরে পাব এই প্রত্যাশা।

দীপ্ত দে, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ। এইচএসসি পরীক্ষা পিছানোর ফলে পরীক্ষার্থীদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। যার মধ্যে প্রধান হলো পড়ায় অমনোযোগিতা এবং শেষ করা পড়াভুলে যাওয়া। প্রস্তুতি যা ছিলো তা আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। এখন নতুন করে সিলেবাস গুছানোর জন্য আবার নতুন করে পড়া শুরু করতে হবে। সময় পেছানোর ফলে দেখতে দেখতে একটি শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাচ্ছি। এই বিষয় নিয়ে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন সবাই চিন্তিত। এছাড়া সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষা এবং এর প্রস্তুতি নিয়ে। এই লকডাউনের কারণে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পত্র কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তিত সব শিক্ষার্থী। অনেকে মনে করে বেশি সময় পাওয়ার কারণে হয়তো আমাদের প্রশ্ন কঠিন করতে পারে এবং কম সময়ে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার একটা বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে সবার উপর। লকডাউনের এই সময়টাতে বাসায় বসে পরিবারের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করছি এবং বিভিন্ন গল্পের বই আর সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ছি। সব মিলিয়ে লকডাউনের সময়টা উপভোগ করার মতো।

সামিউল হাসান তানভীর, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ,ঢাকা: মোটামুটি মানের ছাত্র হিসেবে প্রস্তুতিও ছিল মোটামুটি। পড়াশোনার প্রতি বিমুখীতা আগে থেকেই তবে পরীক্ষার মৌসুম আসলে পড়াশোনার ধুম পড়ে যায়। তাতেই মোটামুটি একটা ভালো প্রস্তুতি হয়ে যেত। তবে এইচএসসির মতো একটি বড় পরীক্ষার জন্য অন্যান্য পরীক্ষার চেয়ে ভালো প্রস্তুতি নিলেও করোনায় থমকে গেল সব। আর এতে আমার মতো ছাত্ররাই বিপাকে পড়েছে বেশি। একদিকে পরীক্ষা কবে হবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই, অন্যদিকে সরকার থেকে মিলছে লাগাতার ছুটি। আর এই সুযোগে যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে গেলাম সেই পুরোনো দিনে। সময়ের মতো লেখাপড়াও থমকে আছে। অনিশ্চিত পরীক্ষার জন্য পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে আছে। পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হলে হয়তো আবারও চলবে প্রস্তুতির তোড়জোড়।

রিয়াজ উদ্দিন ফাহিম, চট্টগ্রাম কলেজ : গত ১৮ মার্চ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর ২২ শে মার্চ শিক্ষামন্ত্রালয় এইচ এসসি পরিক্ষা স্থগিত করে।পরিক্ষা জন্য আমার ভাল প্রস্তুতি ছিল কিন্তু করোনা মহামারির আতঙ্কে শহর থেকে গ্রামে চলে আসি। তারপর সারা দেশে লক ডাউন হওয়ায় আমার ভিতর একটা ভয় কাজ করছে পরীক্ষা হবে কি না। হলেও ভর্তি পরিক্ষার জন্য যথেষ্ট সময় পাব কি না? এর মধ্যে আমি দিন দিন পড়ার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে পেলছি। আমার যা পূর্বে পরিক্ষার প্রস্তুতি ছিল তা এখন সব ভুলে যাচ্ছি। জানি না কবে এইচএসসি পরিক্ষা হবে হলেও আমরা ভর্তি পরিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাব কি না।

ঢাকা, ২৭ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।