অস্তিত্ব নেই প্রতিষ্ঠানের কিন্তু হয়েছে এমপিওভুক্ত!


Published: 2019-10-27 16:22:20 BdST, Updated: 2019-11-14 10:07:15 BdST

লাইভ প্রতিবেদকঃ এবারের এমপিওভুক্তির তালিকায় জায়গা পেয়েছে কুড়িগ্রামের একই ইউনিয়নের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে একই মালিকের দুইটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলেও একটি প্রতিষ্ঠানের নেই কোন অস্তিত্বই। এ প্রসঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৩ অক্টোবর দুই হাজার ৭৩০ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত ঘোষণা করেন। এমপিওভুক্ত তালিকার মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-৮ম) ৪৩৯, মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-১০ম) ৯৯৪, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় একাদশ থেকে দ্বাদশ ৬৮, কলেজ একাদশ থেকে দ্বাদশ ৯৩, ডিগ্রি কলেজ (১৩শ-১৫শ) ৫৬, মাদরাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দাখিল ৩৫৭, আলিম ১২৮, ফাজিল ৪২, কামিল ২৯, কারিগরি কৃষি ৬২, ভোকেশনাল ১৭৫ এবং এইচএসসি (বিএম) ২৮৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সদর ইউনিয়নে এক/দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই এমপিওভুক্ত হয়েছে ৪টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে একই মালিকের দুটি প্রতিষ্ঠান। যার একটি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে পরিত্যক্ত ভবন, কিন্তু নেই কোনো শিক্ষার্থী।অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দেখিয়ে এমপিওভুক্তের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

জরাজীর্ণ আর পরিত্যক্ত ভবনটি দীর্ঘ ৪/৫ বছর ধরে হাটের গরু রাখাসহ বর্তমানে মাদকাসক্তদের অপকর্মের একটি আস্তানায় পরিণত হয়েছে। নেই কোন দরজা-জানালা, কক্ষগুলোতে রয়েছে গরুসহ খড়কুটা, গোবর ও জুয়া খেলার সরঞ্জামাদি। কাগজ-কলমে এই প্রতিষ্ঠানের জায়গা হলেও এর বাস্তব অস্তিত্ব মেলে অন্যত্র।

এমপিওর তালিকায় নাম আসার সাথে সাথেই রাতারাতি সোনাহাট ইউনিয়নের ঘুন্টির মোড় নামক একটি স্থানে অন্য প্রতিষ্ঠান উপমা মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে সেখানে এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটের ব্যানার লাগানো হয়েছে।

টিনশেডের এই প্রতিষ্ঠানটিতে না আছে কোনো শিক্ষার্থী, চালু নেই কোন রকম পাঠদান কার্যক্রম। কাগজ-কলমে পরিচালনা হলেও পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তের তালিকায় কীভাবে গেল এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে সম্প্রতি এমপিওভুক্ত হওয়ার ফলে ২৮ শতক জমিতে স্থাপিত এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটে চলছে পরীক্ষা। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান ছাড়া কোনো কারিগরি শিক্ষা পায় না। প্রতিষ্ঠানে নেই কোন ল্যাব এবং কম্পিউটারের সুযোগ-সুবিধা তারপরও পেয়েছে এমপিও।

কাগজ-কলমে স্থান ও শিক্ষার্থীদের নাম ঠিক থাকলেও কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র। এখানে অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষা দেওয়া হয়। এফএ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর আগে পাসকৃত অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন।

একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হয়। এমপিও তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা হতাশ হয়ে পড়েছে।

এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মোদ্দাছেরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, প্রতিষ্ঠানের মূল জায়গাটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। আগে উপমা মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউট থাকলেও তাদের কোনো শিক্ষার্থী না থাকার কারণে তা বন্ধ হয়ে গেছে।

যার ফলে এক বছর যাবৎ মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় ২৬ শতক জমিতে গড়া এ টিনশেড ঘরেই এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তার কথাতেও গড়মিল পাওয়া যায়।

টিনশেডের এসব ঘরগুলোতেও ক্লাস পরিচালনা করার জন্য পাওয়া যায়নি কোনো বেঞ্চ, বোর্ড কিংবা পাঠদানের কোন সরঞ্জাম। যদিও অধ্যক্ষ দাবি করেছেন নিয়মিত ক্লাস হয়। রয়েছে ১৯০জন শিক্ষার্থী। আর শিক্ষক চারজন এবং স্টাফ ছয়জন। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখানে কম্পিউটার ল্যাব না থাকলেও রয়েছে ১০টি কম্পিউটার। এফএ নামে একই মালিকের দুটি প্রতিষ্ঠান থাকায় অন্য প্রতিষ্ঠানে সেগুলো রয়েছে। তবে তার এ কথারও খুঁজে পাওয়া যায়নি কোন প্রকার মিল।

এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে না আছে কোনো ল্যাব কিংবা না আছে কোন কম্পিউটার। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা এখন পর্যন্ত করেনি কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণের ক্লাসই।

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আল-মামুনও ল্যাব-কম্পিউটার না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ নিজেদের অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে চালিয়ে আসা হচ্ছে। সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রকার কোন অনুদানই পাইনি এবং নেইনি। কিন্তু এখন এমপিওভুক্ত হয়েছে, যার ফলে এখন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। ঘনবসতি এই এলাকায় ২৮ শতক জমিতে স্থাপিত এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ৪৫০জন শিক্ষার্থী। আর শিক্ষক আছেন ১২ জন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এফএ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউট নামে কোনো প্রতিষ্ঠানই নেই। তবে বছর পাঁচেক আগে এখানে টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউট ছিল। সেইটাতেও শিক্ষার্থী না থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।

এ প্রতিষ্ঠানের মালিক ফেরদৌসুল আরেফিন তিনি নিজেও এমপিওভুক্ত দিয়াডাঙ্গা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ। তার বেশকিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে রংপুর ও ভুরুঙ্গামারীতে। নতুন এমপিও স্বীকৃতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার আপন ছোট ভাই ও চাচা অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন।

শিক্ষক রিয়াজুল বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার খেসারত দিতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের ত্যাগী শিক্ষকদের। তারা দীর্ঘদিন ধরে এমপিওর আশায় থাকলেও নামসর্বস্ব কিছু প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে এবার এমপিও।

এফএ টেকনিক্যাল অ্যান্ড আইটি ইনস্টিটিউটের মালিক ফেরদৌসুল আরেফিন পরিত্যক্ত ভবনের কথা স্বীকার করলেও জানান, কাগজপত্র সব ঠিক আছে। তবে, ছাত্র-ছাত্রী না পাওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী এনে ভর্তি দেখানো হয়।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কখনই শতভাগ দেখানো সম্ভব নয়। যখন পরিদর্শনে আসে তখন সেগুলোই দেখানো হয়। তার দাবি, এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য তিনি একাধিক প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। এর মধ্যে তার কর্মরত প্রতিষ্ঠানটি আগেই এমপিও ছিল। এবার তার নিজের দুটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এক কিলোমিটারের মধ্যে বলতে কোনো বিধি নেই। একই উপজেলায় সর্বোচ্চ ছয়টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারে।

জেলার শিক্ষা অফিসার শামছুল আলম বলেন, কুড়িগ্রামে ১৯টি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ছয়টি মাদরাসা এবং ১০টি এসএসসি বিএম প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী চারটি শর্ত পূরণ করলে এমপিও পাওয়া যায়।

শর্তগুলো হল- প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির মেয়াদ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পাসের হারের ভিত্তি। অনলাইনে এসব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্তের জন্য আবেদন করেছিল।

তিনি স্বীকার করেন, জেলায় এখনও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যাদের যোগ্যতা থাকার পরও এমপিওভুক্ত হয়নি। তবে এমপিও যেহেতু চলমান প্রক্রিয়া, তাই পর্যায়ক্রমে হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অনলাইনে কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলেও সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখে পুনর্বিবেচনা করবে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ঢাকা, ২৭ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।