জীবিকা ও জীবন: সিলেট: ১


Published: 2020-07-20 21:22:27 BdST, Updated: 2020-10-30 08:14:30 BdST

আবু তালেব সিদ্দিকী: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যার পর দেশটাতে নূতন ও অবাক হওয়ার মত কিছু ঘটনা ঘটতে থাকলো; বিস্ময়াভিভূত হলাম যখন দেখলাম একটা মানুষও প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ করলো না, তাহলে কি সবাই নেপথ্যে নিরালাায় শোকাহত হয়েছিল? আমরা সবাই আতঙ্কগ্রস্ত, যদিও ততদিনে সত্য দিবালোকের মত আমাদের সামনে উপস্থাপিত হলো। দেশের সার্বিক এ অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের সাথে আমার নিজস্ব অনিশ্চয়তায় এক ধরণেরর হারানোর ব্যথা আমার মনকে অস্থির করে তুললো। এভাবেই দিন যায় রাত আসে আরেক দিনের আগমনে প্রতীক্ষিত আশার আলোয়।

মাস দুয়েক বা তিনেক পর একদিন স্বপ্রণোদিত হয়ে ইউনিসেফ অফিসে খোঁজ নিতে গেলাম, যেখানে ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছিল ঠিক ঐ বিল্ডিংটার দোতলায়; সেদিন ভাগ্য প্রসন্ন। করিডোরে আনোয়ার ভাইয়ের সাথে দেখা, উনি হন্তদন্ত হয়ে কোথায়ও যাচ্ছিলেন। শুধু জানালেন অপেক্ষা করতে, আমাকে নাকি আবারও ডাকা হবে। ফিরে আসব আসব করছি এমন সময় মাসুদ হোসেন (পরে আমার ঘনিষ্ঠজন, মাসুদ ভাই) বলে একজন ভদ্রলোক আরেকটু পরিস্কার করে আশার বাণী শুনালেন, আশার আলোয় বুকের ভিতর অপূর্ব পুলক সঞ্চারিত আমি স্বপ্ন তাড়িত হয়ে বন্ধু মনজুরের কাছে ছুটে এলাম।

মনজুর জানালো রেহানাকে আমার চাকরীর সম্ভাবনা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে রেহানা শুধু রহস্য করে বলেছে, 'সিদ্দিকী শুড বি কনফিডেন্ট অন হিস ওঅন পারফরম্যান্স'। নভেম্বর মাসের কোন এক সময়, তারিখ মনে নেই, আমাকে আবার ইউনিসেফ অফিস থেকে ডাকা হলো;

এবার তিনজন, আনোয়ার ভাই, অনিল পি. রয় আর সেই বয়স্ক ভদ্রলোক যিনি আমাকে ম্যাগাজিন দিয়েছিলেন। আমি রুমে ঢুকতেই তিনি মাথা তুলে আমাকে দেখলেন, হতবিহবল আমি বয়স্ক মানুষটাকে দেখতে পেয়ে একটু বিচলিত হয়ে ভাবলাম চাকুরীটা বুঝি আর হলো না। বয়স্ক সাদা চামড়ার মানুষটা আনোয়ার ভাইকে বললেন আমাকে তিনি এই পোস্টের জন্য নির্বাচিত করলেন; আনোয়ার ভাই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আমাকে অভিনন্দিত করলেন, বললেন আগামীকাল এসে কন্টার্ক্টে র কাগজপত্রতে সই করে বিস্তারিত জেনে নিতে।

রুম থেকে বেড়িয়ে জানতে পারলাম বয়স্ক ভদ্রলোক বাংলাদেশে তৎকালীন ইউনিসেফ প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন, একজন আমেরিকান, নাম প্যারি ও হ্যানসেন। আমি সিলেটে জয়েন করার পর সস্ত্রীক উনি সিলেট ভিজিটে এসেছিলেন এবং আমারও তাঁদেরকে সঙ্গ দেয়ার সুযোগ হয়েছিল।

পরদিন অফিসে এলাম, আমাকে এ্যাপয়েন্টমেন্টের সব কাগজপত্র বুঝিয়ে দিলেন। গিলবার্ট ফ্রান্সিস নামের ফাইন্যান্স সেকশনের এক ভদ্রলোক আমাকে ব্রিফ করলেন এবং আনোয়ার ভাইয়ের কাছে আমার এ চাকুরীর বিস্তারিত তথ্য জানতে বললেন। গিলবার্টব সাহেব শুধু বললেন যে আমাকে সিলেট ইউনিসেফ অফিসে ১ ডিসেম্বর যোগ দিতে হবে।

যথাসময়ে ১ তারিখে ভোর বেলায় ইউনিসেফের একটা গাড়ী আমাকে ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিল এবং বিমানের প্রথম ফ্লাইটে সিলেট পৌঁছালাম। রাস বিহারী মালাকার নামে তখন সিলেট অফিসে এক ড্রাইভার ছিল;(পারভেজ সাহেবের সাথে সাথে আমিও তাকে বিহারী ডাকতাম। বিহারী রসিক স্বভাবের হাসিখুশী বন্ধুভাবাপন্ন এক মানুষ)। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে যখন বিহারীকে অল্প সময়ের মধ্যেই খুঁজে পেলাম, বললাম আমি সেই ব্যাক্তি যাকে নেয়ার জন্য তিনি এসেছেন,বিহারী অবিশ্বাসের চাহনীতে আমাকে দেখলো।

তারপর আমার হাতের স্যুটকেসটা নিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিল। সিলেটি উচ্চারণে ওর বাংলা বলা আমাকে প্রথম দিনেই একটা ভাল লাগায় ভরিয়ে দিল। অফিসে এলাম; সুবিদবাজার; পি. টি. আই সংলগ্ন বিরাট এক বাড়ী। লাক্কাতুরা চা বাগানের মালিকের বাড়ী। জেলা প্রতিনিধি পারভেজ সাহেব তখন একা ছিলেন, ফলে তাঁর সাথেই থাকার ব্যবস্থা হলো। সিরাজুল ইসলাম নামে এক সপ্রতিভ মানুষ অ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ সেক্রেটারীর পদে কাজ করতেন। অমায়িক, ভদ্রস্বভাবের এ মানুষটা আমাকে একটা ক্যাম্প খাটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আরেকজন সহকর্মীর সাথে পরিচিত হলাম। ফিল্ড টেকনিশিয়ান, এ বি এম তরিকুল আলম, চমৎকার একজন মানুষ। জেলা প্রতিনিধি পারভেজ সাহেব পরদিন আমাকে হবিগঞ্জ নিয়ে গেলেন, বললেন এটাই আমার কর্ম এলাকা। হবিগঞ্জ মহকুমার সব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কেয়ারের সাথে একটা চাইল্ড ফিডিং প্রগ্রাম চলমান। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন মনিটরিং করাই হলো আমার কাজ। খুশী হলাম চা বাগানের ভিতরে ভিতরে অবস্থিত স্কুলগুলোতে আসতে হবে জেনে। তারপর তখনকার এস.ডি.ও সাহেবের অফিসে গেলাম, পরিচিত হলাম। এ অফিসে সাবেক ও বর্তমান এস.ডি.ও দের নামের তালিকার যে বোর্ডটা আছে সেখানে পারভেজ সাহেবের মরহুম বাবা মুহাম্মদ মাসুদ সাহেবের নামও দেখলাম এবং জেনে খুশী হলাম।

সিলেটে ফিরে এলাম সন্ধ্যা নাগাদ, বলা হলো আমাদের দু'জনকে ঢাকা যেতে হবে একটা ট্রেনিং ওয়ার্কশপে যোগ দেয়ার জন্য। আমরা সিলেট থেকে সন্ধ্যায় রওয়ানা হয়ে মৌলভীবাজারে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মৌলভীবাজারের একটা মোটেলে ওঠলাম। এক রুমে থেকে সারারাত গল্প করে কাটিয়ে দিলাম নতুন সহকর্মীর পাশে শুয়ে । ভদ্রলোক বললেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এ মোটেলটা পাক মিলিটারী ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, অনেক লোককে নাকি গুলি করে মেরে তাদের লাশ মটেলের সামনের কূপটিতে ফেলে দেওয়া হতো।

একসময় অহেতুক ভীতু হয়ে রুমে আমরা খাট দু'টু টেনে একসাথে লাগিয়ে নিলাম। অনেক গল্পের পর রাতে গভীর ঘুম হলো, ঘুমের সময় পার হয়ে যাওয়াতে চোখ থেকে ঘুমের ভাবটা দূর হয়ে গেছে, পারভেজ সাহেব সিডাক্সেন নামক ঘুমের ট্যাবলেট (ঔষধ) বের করে উনি একটা খেলেন এবং আমাকে একটা বাড়িয়ে দিলেন খাওয়ার জন্য। জীবনের প্রথম ঘুমের বড়ি খেতে হবে ভাবতেই একটু ইতস্তত: করেছিলাম। উনি আমাকে অভয় দিয়ে বললেন এতে আমাদের এক ঘুমে রাত পার হয়ে যাবে, সত্যি সত্যি গভীরতর ঘুম আমাকে আচ্ছন্ন করলো। জীবনের এই প্রথম ঘুমের বড়ির সাথে পরিচিত হলাম। এ এক রোমাঞ্চকর স্মৃতি।

ঢাকা এসে ট্রেনিং ওয়ার্কশপে যোগ দিলাম, সারা বাংলাদেশের ১৯ জেলার জেলা প্রতিনিধি ছাড়াও ঢাকাস্থ সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার সাথে পরিচয় হলো। ওয়ার্কশপে পরিচয় হলো কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট সালেহ উদ্দিন আহমদের সাথে। এবার আমরা একসাথে ট্রেনযোগে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাব বলে ঠিক হলো। রাতের ট্রেনে একটা স্লিপিং কোচে একসাথে রওয়ানা হলাম, ট্রেনটা আখাউড়া জংসন ষ্টেশনে আসলে একজন টিকেট চেকার আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলে গেলেন আপনার সাথের যাত্রী প্লাটফরর্মের এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়াদৌড়ি করছে; ট্রেন থেকে নেমে গিয়ে ধরে আনলাম। ভাবলাম হয়ত ঘুমের ঘোরে নেমে গেছে; এক সময় ট্রেনটা ব্রাহ্মনবাড়িয়া এলে তিনি নেমে গেলেন। আমি সিলেট চলে এলাম। ঐ রাতের পর সালেহ উদ্দিন আহমেদের সাথে আমার আর সাক্ষাৎ হয়নি।

কদিন পর পারভেজ সাহেব বদলী হয়ে ঢাকা চলে এলেন আমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে। সারা জীবন স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকবেন পারভেজ সাহেব। ( কিছদিন পর সাহেব শব্দটিকে বাদ দিয়ে ভাই সম্বোধনে ডাকতে শুরু করলাম ) মাস ছয়েক মহানন্দে সিলেট অফিসে কাটালাম, চা বাগানের নয়নাভিরাম দৃশ্য মনকে এখনও ব্যাকুল করে তোলে। রাতে গাড়ীতে বসে বিহারী তার কল্পিত বাঘের কাহিনী শুনিয়েছে; তেলিয়াপাড়া পেড়িয়ে চাঁদনী রাতে যখন আমরা চা বাগানের মাঝ দিয়ে যাতায়াত করতাম মনে হতো কত মোহনীয় এ রাত।

আমার স্বল্পকালে অবস্থান করা সিলেটের এই কর্জমীবনের বৈচিত্র্য আমাকে এখনও মুগ্ধ করে রেখেছে। কামালও বদলী হয়ে ঢাকা গেল: মাহবুব শরীফ কুমিল্লার জেলা প্রতিনিধি। এক সময় বার্মাতে কোন এক ট্রেনিংয়ে গেলে আমাকে করা হলো ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। কুমিল্লা এলাম; একদিন যে মধ্যমনির খোঁজে কুমিল্লা আসতে হাইজাক্যারের হাতে নিগৃহীত হয়েছিলাম সেই মধ্যমনিতে রাত্রিযাপন, অফিসে বসা সব মিলিয়ে রোমাঞ্চের সাথে ক্ষাণিকটা পুলক আমাকে নিয়ে খেলা করছিলো যখন-তখন।
চলবে...

ঢাকা, ২০ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।