একটি বাস্তব ঘটনার খন্ড চিত্রকরোনাবিজয়ী একজন প্রবাসীর গল্প


Published: 2020-07-15 23:12:51 BdST, Updated: 2020-10-30 07:39:30 BdST

আশিক আহাদ খান, সিঙ্গাপুর থেকে: মহামারী আগেও ছিল। এখনোও চলছে। হয়তো ভবিষ্যতে আরো হবে সে বিষয় সময়ই বলে দিবে। সময়ের ব্যবধানে যা হচ্ছে সব‌ই মহামারী। কিন্তু আক্রান্ত বা আক্রমনের ধরনে শুধু নাম পরিবর্তন হয়ে আসছে। প্ল্যাগ, ডায়েরিয়া ও যক্ষা। এখন চলছে কোভিডড-১৯। এই করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রাণহানি হয়েছে লাখ লাখ বনি আদমের। আক্রান্ত হয়েছেন কোটির উপরে মানুষ। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষের জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন দেশের সরকার লকডাউন করেছেন। বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

এই প্রাণঘাতি ভাইরাসের ছোবল থেকে রক্ষা করতে গত ৫ এপ্রিল ২০২০, সিংগাপুর সরকার ঘোষণা করেন সবাইকে বিশেষ করে সকল অভিবাসী শ্রমিকদের রুমে/ডরমিটরিতে থাকার জন্য। আর তার নাম দেয়া হয় circuit breaker. এদের মধ্যে জসিম উদ্দীন নামের একজন আছেন যিনি বাংলাদেশী। তার COVID-19 সোয়াব পরীক্ষা করা হয়েছিল ১৭ এপ্রিল ২০২০। তার বয়স ৩১ বছর। দুর্ভাগ্যক্রমে, সোয়াব টেস্টের মাত্র চার দিন পরে অর্থাৎ ২১ তারিখ‌ তার শরীরের তাপমাত্রার বেড়ে যাওয়ার কারণে তাকে ডরমিটরি থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

তাকে সিনকাং জেনারেল হাসপাতালে ২৪ ঘন্টা ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। ডাক্তার তাকে জানিয়েছিলেন যে তার COVID-19 এর ফলাফল নেগেটিভ ছিল (যা ১৭ এপ্রিল ডরমেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছিল তার ফলাফল)। পরের দিন সন্ধ্যায় তাকে আবারও এজেসিএইচ (অ্যান্ডারসন জুনিয়র কলেজ হোস্টেল) কোয়ারেন্টাইনের জন্য স্থানান্তরিত করা হয়। তিনি সেখানে পাঁচদিন ছিলেন একা একটা রুমে।

সেখানকার স্টাফদের আচরণ খুবই রুঢ়। নিয়মকানুন মেনে চলতে কড়াকড়ি ভাবে নির্দেশ দেয়া হয়। বলা হয় ওয়াসরুম ব্যাতীত যেনো অন্য কোথাও না যায়। অর্থাৎ সবসময় রুমে অবস্থান করতে হবে। ওদের আচরণ দেখে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল যেন জেলখানার জীবন। চতুর্থ দিন তাকে বলা হয়েছিল যে তাকে আগামীকাল অন্য কোনও জায়গায় স্থানান্তর করা হবে।

কথামতোই, তাকে এপ্রিল মাসের ২২ তারিখে সিঙ্গাপুর স্পোর্টস হাব (ন্যাশনাল স্টেডিয়াম) এ স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। যেখানে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকারিভাবে অস্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয় । এক রুমে তারা দশজন ছিলেন। যায়গাটা আরামদায়ক, স্পোর্টস হাব কর্মীরা ছিলো সহানুভূতিশীল এবং সর্বদা তাদের উত্সাহ দিয়ে রাখতেন। জানা গেছে সেখানে অবস্থানরত সবাই ছিলো নেগেটিভ। যা তার উদ্বেগকে কমিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, তাদের মধ্যে একজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। COVID-19 পরীক্ষা করার পরে পজিটিভ হন। সে কারণে হয়তো সরকারীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেখানে অবস্থানরত সবাইকে আবারো সোয়াব টেস্ট করার।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মে মাসের ৩ তারিখে তাদের সকলকে আবারো সোয়াব টেস্ট করা হলো। পরের দিন সকালে একজন স্টাফ্ তার নাম ধরে ডাকলেন এবং বললো সব গুছিয়ে নিতে। আমাকে অন্য রুমে স্থানান্তরিত করা হবে। কারণ জিজ্ঞেস করতেই তারা জানায়, তিনি COVID-19 পজিটিভ !!!!!। সে কথা শুনে মনে হয়েছিল পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেছে। নিরাশ হয়ে যান। সেদিন এতটাই ভয় পান যে তিনি এটি ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনি।

তারপরো নিজেকে স্ট্রং রাখতে নিজের সাথে নিজেই প্রমিজ করলো। যেকোনো ভাবেই হোক স্বতস্ফুর্ত থাকতে হবে। আরেকটি ভালো দিক ছিলো পজিটিভ হ‌ওয়া সত্বেও তার শরীরে কোভিড-১৯ এর কোনো রকম লক্ষন ছিলো না। তার পরেও মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কেন পজিটিভ হলো? সোয়াব পরীক্ষার পজিটিভ ফলাফলের কারণে, মে মাসের ৭ তারিখে তাকে স্পোর্টস হাব থেকে সিইসি Changi Exhibition Center এ স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো।  সেখানে যাওয়ার পর‌ও এক রুমে দশ জনের বসবাস। যেখানে সবার COVID-19 পজিটিভ ছিল। নিয়মিত, আমাদের রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা এবং অক্সিজেন স্যাচুরেশন দিনে তিনবার জমা দিতে হয়েছিল। যা ডাক্তাররা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং এভাবেই কাটিয়ে দেন সময়।

২৮ মে ২০২০। কর্তৃপক্ষ একটা চিঠি দিলেন চিসকো পুলিশকে। সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে আমি করোনা ভাইরাস মুক্ত। তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর পক্ষে সত্যিই অসম্ভব কিছু নেই। সেদিন তাকে ডিসচার্জ দিয়ে দেয়। আবার সাতদিন Stay_Home_Notice সহ ট্যাম্পানিসের কিআওনান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়। (অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকারিভাবে অস্থায়ী কোয়ার্টার)

দুঃখ যেনো বুকে জড়িয়ে রাখতে চায় তাকে। জুন মাসের ১ তারিখে তার পাশের রুমের কেউ একজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিনই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার COVID-19 পরীক্ষা করলে তার ফলাফল পজিটিভ হলো। এক‌ই floor এর কারণে, দ্বিতীয় তলায় থাকা আশেপাশের প্রত্যেককেই আরও ১৪ দিনের কোয়ারান্টাইন থাকতে হবে বলে জানিয়ে দিলেন এখানকার র্কতৃপক্ষ। এখন নতুনভাবে দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধলো তার মনের মধ্যে। জুন মাসের ৩ তারিখে ডরমিটরিতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল দুর্ভাগ্যবশত যাওয়া হয়নি। সরকারের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তবে ০৬ জুন থেকে পুনরায় কাজে যোগদান করার অনুমতি পান এবং কাজ যোগদেন।।

করোনায় অর্জন:
তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে কোয়ারেন্টাইন নামের অবসরে থাকা সময়টাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন তিনি। ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের জন্য অনলাইন/ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে কিছু কোর্সও করেন। যেমন-
* Safe Management Officer.
* Asbestos Awareness
* Positive Intervention & Situational awareness.
* COSHH Risk Assessor Certification.
* COSHH Awareness.
* Emotional management training.

জসিম উদ্দীন জানান, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে, এখন আমি সুস্থ। আমার বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী ও সহকর্মীগণ এবং যারা আমার জন্য প্রার্থনা করছেন ও উত্সাহ দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার কঠিন দুঃসময়ে আমার পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমার নিয়োগকর্তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাই। এক কথায় আপনাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সিঙ্গাপুর সরকার, চিকিত্সক, নার্স এবং সম্মুখ সারীর প্রত্যেককে যারা এই কাজের সাথে যুক্ত রয়েছেন।

কিছু পরামর্শ:
জসিম জানালেন আমি কোন ডাক্তার নই। বিজ্ঞ কোন ব্যক্তিও নই। তবুও যেহেতু আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে সুস্থ হয়েছি তাই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বলতে পারি আপনার_দৃঢ়_মনোবল, সতর্কতা এবং ইমিউনিটি সিস্টেমই একমাত্র ভরসা। তারা সেখানকার চিকিৎসকরা যা জানালেন তাই আপনাদের শেয়ার করবো। প্রচুর পরিমানে ফল এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে যেমন ডিম, দুধ, মাছ, মাংস। মোটকথা আপনার ইমিউনিটি সিস্টেমকে বাড়াতে হবে। কেননা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই পারে স্বল্প সময়ে আপনাকে স্বাভাবিক অবস্থানে ফেরাতে। এক্ষেত্রে কোন আপোষ না করাই উত্তম। তবে ইমিউনিটি সিস্টেম ভালো করার জন্য ফলমুল খাওয়ার পাশাপাশি কিছু অভ্যাস তৈরি করতে হবে। যেমনঃ-
* শ্বাস প্রশ্বাসের কিছু বিশেষ ব্যয়াম যা কিনা ইউটিউবে পেয়ে যাবেন।
* গরম পানির বাষ্প গ্রহণ।
* গরম পানির মধ্যে সামান্য লবণ নিয়ে গারগল করুন।
* হালকাগরম জলের সাথে একটু লেবুর রস মিশিয়ে সেবন করুন।

এদিকে ওই করোনা বিজয়ীর জানালেন, কোভিড-১৯ মানুষকে শিখিয়েছে অনেক কিছু।
একা কিভাবে থাকতে হয়। করোনাভাইরাসে প্রাদুর্ভাব না হলে আমি বুঝতেই পারতাম না একা থাকা কতটা যন্ত্রনাদায়ক ৷ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষা দিয়েছে তা হলো জগতে কেউ আপন নয় ৷ যদি করোনায় পজিটিভ হন দেখবেন প্রিয় মানুষগুলো কিভাবে দূরে সরে যায়। এমনকি করোনায় মৃত্যুর কারণে আপনজনরা কেউ লাশ দাফন করতে এগিয়ে আসছে না ৷ টাকা, ক্ষমতা কিছুই কাজে আসবে না। জীবনে সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে হলে স্রষ্টার প্রতি অনুগত ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা যে কতটা জরুরি তা বুঝতে শিখিয়েছে এই ভাইরাস। সত্যি বলতে এবার একেবারেই ভিন্নরকমের অভিজ্ঞতার সঞ্চার হলো যা গত ৩১ বছরের মধ্যে হয়নি।

অবশেষে, পৃথিবীর বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে করোনভাইরাস আমাদের সাথে মারাত্মক গেম খেলছে। বলা যায় এর নাম "মরণ গেম"। কখন/কোথায় এই খেলাটি শেষ হবে তা এখনো কেউ জানেন না। তবে আশাকরি বিশ্ববাসী শীঘ্রই ব্যস্ততায় ফিরে যাবে ঠিক যেমনটি আগে ছিল। সবাই আগের মতো ঘুরে বেড়াবে আত্মীয়স্বজন নিয়ে এবং কর্মজীবী লোকজন ফিরে যাবে তাদের কর্মস্থলে। মনে রাখবেন, পজিটিভ হ‌ওয়া মানেই মরন নয়, আবার নেগেটিভ মানেই জীবন না। মূলকথা হচ্ছে সৃষ্টি কর্তার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং ভরসা করুন।

ঢাকা, ১৫ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।