সমাপ্তির চিঠি (পর্ব-১) : যেদিন শেষ দেখা হয়েছিল...


Published: 2019-08-23 01:25:33 BdST, Updated: 2019-12-10 08:22:38 BdST

ফারহানা নিশি : সম্পর্কটা থাকাকালীন তুমি কত করে বলতে তোমায় যেন চিঠি লিখি। কখনও লেখা হয়নি, আজ এভাবে লিখতে হবে তাও ভাবিনি। তুমি এই চিঠিগুলো হয়তো কোনোদিন পাবেও না। কিন্তু মাঝেমধ্যেই হুটহাট যখন তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হবে, তখনই এভাবেই চিঠি লিখবো, কেমন?

তোমার সাথে শেষ দেখা হয়েছিলো ১৩জুলাই, শনিবার। তুমি খুব ভালো করেই জানো দিন তারিখ আমি বিশেষ মনে রাখতে পারি না। কত গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ভুলে যাই! অথচ নিয়তির পরিহাস দেখো, এই তারিখটি ভুলিনি। ভুলতে পারিনি আসলে। শেষবারের মতো তোমায় দেখা। দেখা করার চেয়ে তার প্রস্তুতি নেয়া সবচেয়ে কঠিন ছিলো। তবে সেটা অন্য মেয়েদের মতো সেজেগুজে নিজেকে প্রস্তুত করার মতো ব্যাপার নয়। মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করাটাই ছিলো সবচেয়ে কঠিন কাজ। তবুও আমি প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। নিজের ভেতরটায় পাথর গড়ে নিয়েছিলাম। যত যাই হোক, ভেঙ্গে যাতে না যাই। ভাঙা যাবে না, শক্ত হতে হবে তোমার সামনে। নির্দিষ্ট সময় চেয়ে নিয়েছিলাম আগেই। মাত্র তিন ঘণ্টা! জানতাম এতে কিছুই হবে না। সহস্র বছর ধরে তোমার পাশে থাকলেও যেই আমার তৃষ্ণা মিটবে না তার কাছে মাত্র পাঁচ হাজার চারশ সেকেণ্ড কিছুই নয়! তবুও এর বেশি চাইতে পারিনি। ভয় হচ্ছিলো, যদি মানা করে দাও! তোমার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হবার অভ্যেসটা তো ছিলো না কখনোই। যদিও ততদিনে ওই অভ্যেসটা গড়ে নেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু পারিনি। দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তন কি এত সহজেই মেনে নেয়া যায়?

অবশেষে তুমি এলে সেই পরিচিত জায়গায়। আমার একটু আগেই পৌঁছেছিলে। তা নিয়ে ভীষণ অপরাধবোধ জন্মেছিলো। শেষ দেখা থেকে কতগুলো মিনিট হারিয়ে ফেললাম! হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো। কিছুদিন আগেই এক্সিডেন্ট করেছিলাম। হাঁটুর এক স্হান থেকে কয়েক ফোঁটা রক্তও গড়িয়েছিলো। কিন্তু বুঝতে দেইনি তোমায়। নিজেকে অসহায় প্রমাণ করা যাবে না। তাই সাবলীলভাবেই হেঁটে গেলাম তোমার সামনে। যতই এগোচ্ছিলাম, হৃদস্পন্দন ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, দূরত্বটা থাক। কাছে গিয়েছিলাম বলেই তো দূরে যাবার যন্ত্রণাটা পেতে হচ্ছে!

সামনে যেয়ে তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারিনি। এমনটা কেন হলো জানি না। অথচ এই মুখটা একবার দেখার জন্যেই কত না আকুতি ছিলো আমার! কাছে যেয়ে এতটাই এলোমেলো লাগছিলো যে বুঝতে পারছিলাম না কী বলবো। হয়তো জানতে চেয়েছিলাম কেমন আছো। তুমি কালো রঙের টি-শার্ট পরে এসেছিলে। কালোতে তোমায় বেশ মানায়! হঠাৎই অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো। ইচ্ছে হলো আগেকার মতো তোমার হাতের দুটো আঙুল ধরে হাঁটতে থাকি। কিন্তু না! শক্ত থাকতে হবে আমায়। হেঁটে হেঁটে অবশেষে খাবারের দোকানটার সামনে যাই। সাড়ে দশটা বাজে। দোকানটা খোলেনি তখনও। অবশেষে মনে হলো শেষবারের মতো রিকশায় কিছুটা পথ ঘুরে বেড়াই একসাথে। সেটাই করলাম। তোমার পাশে বসার পর চিরচেনা সেই অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো কয়েক গুণ। উঁচুনিচু রাস্তায় রিকশার ঝাঁকুনিতে তোমার শরীরের সাথে মাঝেমধ্যেই স্পর্শ লাগছিলো। আমি প্রতিবারই চমকে উঠছিলাম। সাথে সাথেই নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু জানি না তোমার মনে কী ছিলো। হাসছিলে মুচকি মুচকি। আমি না দেখার ভান করে চোখমুখ শক্ত করে বসেছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আমি বুঝতে শুরু করেছিলাম, নিজেকে আমি যতটা শক্ত ভাবি, ততটাও নই। অন্তত তোমার ব্যাপারে।

যাচ্ছিলাম টিএসসির উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছেও নামার ইচ্ছে হলো না। রিকশা ঘুরিয়ে আবার আগের স্থানেই ফিরে যেতে বললাম। ভান করলাম খাবারের দোকানটাতেই বসতে চাচ্ছি। কিন্তু তোমার শরীরের উষ্ণতাই পেতে চাচ্ছিলাম। মাঝেমধ্যেই তোমার শরীর থেকে মৃদু এক সুবাস পাচ্ছিলাম। বোধ করি সেটা আমার দেয়া সুগন্ধির ছিলো। তখন না এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিলো জানো? মনে হচ্ছিলো তুমি তো আমারই। খুব আপন! আমার থেকে দূরে সরে যাওয়া কি এতই সহজ? নিশ্চয়ই মজা করছিলে এতদিন! কিন্তু সহজই ছিলো তোমার জন্যে, যা এখন বুঝি। যাই হোক, আবার সেই দোকানের সামনে যেয়ে দেখলাম তখনও বন্ধ। মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া জানালাম। আবারও এক চাচার রিকশায় চড়লাম। একই পথে, আবার টিএসসির উদ্দেশ্যে... এবার বোধহয় ঝাঁকুনিটা জোরেই লাগছিলো। হঠাৎ কোমরে তোমার হাতের স্পর্শ পেলাম। তৎক্ষণাৎ সরিয়ে দিতে চাইলাম। লাভ হলো না। তুমি শক্ত করে আঁকড়ে ধরলে। হার মানলাম। চোখের জল তো বাঁধ মানলো না, তোমায় আড়াল করেই মুছে নিলাম। আবারও টিএসসি পৌঁছে ফিরতি পথ ধরলাম।

তুমি খুব স্বাভাবিক আচরণ করছিলে, যেন আমাদের মধ্যে কিছুই হয়নি! তখন কেন জানি মনের মধ্যে এক ক্ষীণ আশা জন্মাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো তুমি হয়তো আজ আমায় ছেড়ে যেতে পারবে না। আড়াল করে রাখা হাতটা ততক্ষণে নজরে পড়েছে তোমার। ব্যান্ডেজটা দেখিয়ে জানতে চাইলে কীসের ওটা। আমি লুকোতে চাইলাম। তুমি জোর করছিলে বলবার। কিন্তু তখন ওই দুঃসময়ের কথা মুখে আনার শক্তি ছিলো না। অবসাদ বোধ হচ্ছিলো। দুদিন যাবৎ অভুক্ত আমি। জীবনে তুমি থাকবে না এই ভাবনা আমার কাছ থেকে ক্ষুধা, ঘুম সব কেড়ে নিয়েছিলো। বারবার তোমার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিলো আগের মতোন। ওই একটা কাজই আমার ভেতর থেকে সব ক্লান্তি দূর করে দিতো। কিন্তু ওই মুহূর্তে তা সম্ভব ছিলো না। আমায় শক্ত থাকতে হবে তো!

পুনরায় সেই দোকানের সামনেই নামলাম এবং তখনও বন্ধ পেলাম। সেখান থেকে হেঁটে অল্প দূরত্বে থাকা এক শপিংমলে ঢুকলাম। সামনের এক দোকানে দাঁড়িয়ে তুমি হেডফোন দেখতে লাগলে। আমি কিছুটা বেসামাল হয়ে যাচ্ছিলাম। মনে পড়ছিলো এর আগে শেষবার যখন তোমার সাথে শপিংয়ে গিয়েছিলাম, সারাক্ষণ বাচ্চাদের মতো তোমার হাত ধরে ছিলাম। যেন হাত ছাড়লেই হারিয়ে যাবো! চোখের সামনে সেইসব কিছু ভেসে উঠছিলো আর বুকের ভেতরটা কেমন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো! কিছুটা সরে গিয়ে নিজেকে সামলে এলাম। তখন ঘোলাটে চোখে তোমায় দেখছি আর বোঝার চেষ্টা করছি এই মানুষটাই কি আমায় পাগলের মতো ভালোবাসতো? আগলে রাখতো? চিনতে পারছিলাম না তোমায় একদমই। এসব ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে গেলাম সেখান থেকে। অবশেষে দোকানটা খোলা পেয়ে ওখানে গিয়ে বসলাম। তুমি অনেক জোরাজুরি করলে কিছু অর্ডারের জন্য। আমি জানতাম গলা দিয়ে কিছুই নামবে না। তাই শুধুমাত্র একটা কোল্ড কফি অর্ডার করলাম। তুমি নিলে চাওমিন। অর্ডার নিয়ে লোকটা চলে যাবার পর বলার মতো কিছুই পাচ্ছিলাম না।

কী বলবো! যেই মানুষটি আমায় ছেড়ে চলে যাবে পণ করেছে, তাকে বলার মতো আর কিছু বাকি রয়ে যায় কি? তুমিই টুকটাক খোঁজ খবর নিতে লাগলে। খাবার এলো। কোনোরকমে কফিটুকু গলাধঃকরণ করছিলাম। বিষাদের গান চলছিলো ওখানের টেলিভিশনে। ততক্ষণে আমার হৃদয়ের পাথর ভাঙতে শুরু করেছে। দু চোখ ফেটে কান্না আসছিলো। আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছি। বুকে প্রচণ্ড ব্যথা আর হাহাকারের মিশেলে অবর্ণনীয় অনুভূতি হতে লাগলো। তৎক্ষণাৎ ব্যাগ থেকে একটা ডিপ্রেশন আর একটা পেইন কিলার ট্যাবলেট বের করে একসাথে দুটোই খেয়ে নিলাম তোমায় বুঝতে না দিয়ে। তোমার চোখের দিকে তাকাতেই কিছুটা থমকে গিয়েছিলাম। টকটকে লাল ঘোলাটে চোখ দুটো থেকে যেন বহুদিনের কান্না বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। তবুও তা বহু কষ্টে আটকে রাখা হয়েছে। বিস্মিত হলাম, ভুলও হতে পারি। যে আমায় ছেড়ে চলে যেতে চায়, সে কেন কাঁদবে! কীভাবে কীভাবে যেন সময়টা দ্রুত চলে গেলো। এর মাঝেই কিছু কথা আমায় জানালে যা শুনে ভাবলাম ওর বিশ্বাস তবে পুরোপুরিই অর্জন করেছিলাম, তাই এখনও আস্হা রাখতে পারে। ভালোবাসাটাও যদি এভাবে থাকতো! অবশেষে বের হলাম সেখান থেকে। সময় এসেছে বিদায় নেয়ার। মৃদু জ্বলতে থাকা আশার প্রদীপটা নিভে গিয়েছে। তুমি আমায় একবারের জন্যেও বলোনি, শবনম, থেকে যাও আমার হয়ে! আমি তোমায় রেখে হাঁটতে শুরু করলাম। তখন আর চোখের জল বাধা মানেনি। অবাধে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আকাশেরও হয়তো আমার মতোই একলা হবার যন্ত্রণা হচ্ছিলো। বৃষ্টি শুরু হলো। ভিজতে লাগলাম আমি, আমার কষ্টেরা....

[লেখক : ফারহানা নিশি]

ঢাকা, ২৩ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।