‘গার্লফ্রেন্ড আমাকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ করেছে !’


Published: 2019-04-19 14:06:40 BdST, Updated: 2019-12-16 11:13:44 BdST

মোসাব্বের হোসেন মুয়ীদ : গার্লফ্রেন্ড আমাকে ধর্ষণ করেছে। এই অভিযোগ করার পর থানার কর্মকর্তা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আশেপাশের কনস্টেবলরা হাসছে। কর্মকর্তা আমাকে বললেন-
- আপনার গার্লফ্রেন্ডের নাম কি?

- নন্দিতা।

- কিভাবে ধর্ষণ করলো আপনাকে?

- তার সাথে আমার ৫ বছরের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কে আমাদের বহুবার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। কিন্তু এখন সে বিয়ে করছে অন্য একজনকে। সে আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করেছে।

- আচ্ছা আপনার নাম কি?

- মোসাব্বের হোসেন মুয়ীদ।

- শুনুন মুয়ীদ, আমার ২০ বছরের জীবনে প্রথম এমন একটা কেইস আসলো… আপনি কি করেন?

- প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করি।

- তাহলে কেন আপনি নিজের মানসম্মান খোয়াতে লেগে পড়ে গেলেন?

- এখানে আমার মান সম্মান কিভাবে চলে গেল? একটা মেয়ে আমাকে ইউজ করেছে। বিয়ের আশা দেখিয়েছে, সে আমার সাথে প্রতারণা করেছে…! এখানে আমি ভিকটিম!

- ভাই আপনি যানতো, আরো অনেক কেইস আছে!

আমি থানা থেকে হতাশ মনে বের হয়ে গেলাম। আমি একজন এ্যাডভোকেটের কাছে গেলাম। তিনি আমার কথা শুনে বললেন-

- দেখুন মুয়ীদ, মজা আপনিও পেয়েছেন সেও পেয়েছে। এক মেয়ে যাবে আরেক মেয়ে আসবে। আপনি হলেন ছেলে! ছেলেরা হলো ছুড়ি। ছুড়ি আপেলের উপর পড়ুক আর আপেল ছুড়ির উপর কাটবে তো আপেল!

- আমি কোন ছুড়ি না! আপনাদের আইনে কি আমি সহায়তা পাবো না?

- আপনি একটা নতুন মানুষ খুঁজুন এটিই একটা সমাধান। আর প্লিজ মুয়ীদ আপনি আসুন!

- কেন আসবো আমি? আমি জাস্টিস চাই!

- আপনিতো সম্মতিতে করেছেন!

- কিন্তু এটা ভেবে যে বিয়ে হবে আমাদের। সে আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েছে। একদিন সে বলে মুয়ীদ আমাদের বাচ্চা হলে নাম হবে মিমো।

- ধুর মিয়া যান তো! ছ্যাঁকা খেয়ে পাগল হয়ে গেছেন।

নাহ আমি যাবো না!

- হালার পুত বের হ! নিজের মান সম্মানতো খাবিই! এই কেইস নিয়া আমি কোর্টে যাই আর সবাই হাসুক!

আমি এখান থেকেও হতাশ মনে বের হয়ে গেলাম। বাসায় এসে মাকে বললাম-

- আম্মা আমাকে একটা মেয়ে ৫ বছর ধরে ধর্ষণ করেছে।

- ও মা! তুই কস এগুলা! আমি তর মা!

- আম্মা, আমাকে মেয়েটা ধর্ষণ করেছে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে! আর তুমি এড়িয়ে যাচ্ছো!

-বাবা তর কি শরীর খারাপ। একটা মেয়ে গেছে দশটা আসবে। তর মন খারাপ করার কিছু নাই। তাও বাবা এসব বলিস না। আশেপাশের সবাই হাসবে। আর তর বিয়ের জন্য পাত্রী দেখছি আমি। এসব বললেতো কেউ তকে মেয়ে দিবে না!

- মা আমি কি তাহলে আমার ন্যায় বিচারটা পাবো না?

- যাহ! হারামজাদা ঘরে গিয়া ঘুম দে! তর মাথা গেছে!

আমি ঘরে বসে ভাবছি যে কি করবো। নন্দিতার নুড আছে আমার কাছে আমি কি প্রতিহিংসা বশত সেগুলো লিক করে দেব? নাকি একটা চাপাতি নিয়ে মেয়েটির গলা নামিয়ে দেব! নাকি রাস্তায় দেখা হলে কতগুলো চড় থাপ্পড় বসিয়ে দেব। কিন্তু এগুলো করলেতো আমি দোষী হয়ে যাবো! তাহলে আমি কি করবো? হঠাৎ ফেসবুক লাইভের কথা মাথায় আসলো। আমি ফেসবুক লাইভে গেলাম। ফেসবুক লাইভে আমার সাথে ঘটা সকল কিছু শেয়ার করলাম। মাত্র এক ঘন্টায় সেই ভিডিও ভাইরাল। ভিডিওতে ১ কে হা হা হা রিয়্যাক্ট, কমেন্টে গালি। এসব দেখে আমি আরো অবাক! রাতারাতি আমাকে নিয়ে ট্রল হচ্ছে। এলাকার রাস্তা থেকে শুরু করে শহরের কোথাও বের হতে পারছি না। আমাকে দেখে সবাই হাসছে আর তিরষ্কার করছে। এদিকে মাও লজ্জায় বের হচ্ছে না। আমার কথা হলো আমি তো দোষের কিছু করিনি। একজন মেয়েকে বিশ্বাস করেছিলাম! সে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে।

আজ সকাল বেলা নন্দিতা আমাকে কল দিয়েছে। আমি কল রিসিভ করতেই বললাম-

- কি বলার জন্য কল করেছো?

- তুই লাইভ ভিডিওতে আমার নাম না নিয়ে বেঁচে গেছিস! শুন মুয়ীদ! ঠাণ্ডা হয়ে যা! আর আমার নাম যদি নিয়েছিস! আইটি সেক্টরে মামলাতো খাবিই আর নারী নির্যাতনের আর ধর্ষণের মামলাও খাবি!

- নন্দিতা আমি তোমার কথা রেকর্ড করে রেখেছি। থ্যাংক ইয়ু আমার জাস্টিস পেতে এখন সুবিধা হবে কিছুটা।

কল কাটার সাথে সাথে বাসায় কলিং বেল এলো। একজন লোক এসেছে আমার বাসায়। আমি তার সাথে কথা বলছি। সে আমাকে বললো-

- আমি হুমায়ুন কবির। একজন ব্যবসায়ী। আমি ছোট বেলায় ধর্ষণের স্বীকার হই।
- কার দ্বারা?

- আমার ড্রাইভারের দ্বারা। আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। মা টিচার। তাই বাসায় ড্রাইভারের কাছে রেখে যেতেন। সেই ড্রাইভার আমাকে ছোট বেলায়...

- আপনি একটু স্বাভাবিক হোন প্লিজ।
- মুয়ীদ, একটা সময় যখন বড় হই তখন আমি বুঝতে পারি আমার সাথে কি ঘটেছে। সেই ঘটনার আরো দশ বছর পর্যন্ত সেই ড্রাইভার কাজ করেছে আমাদের বাড়িতে। খুব বলার চেস্টা করেছি মা-বাবাকে কিন্তু পারিনি। এখন সে অন্য জায়গায় কাজ করে। বয়স হয়েছে তার। কিন্তু স্বভাব নয়। ভয় করে যে সে অন্য কোন বাচ্চাকেও এমন করছে কিনা!

- আপনি কি করতে চান?

-আপনার সাথে লাইভে সেই ঘটনা শেয়ার করতে চাই...

- তাহলে আসুন...

লোকটির সাথে লাইভে গেলাম। সেই একি প্রতিক্রিয়া। এদিকে অফিস থেকে চিঠি এসেছে আমার চাকরি নেই আর এই কোম্পানিতে। আচ্ছা এসব কেন হচ্ছে আমার সাথে? আমি কি দোষ করেছি? আজ আমার জায়গায় কোন মেয়ে ভিকটিম থাকতো তাহলে বুঝি সবার টনক নড়তো। পাশের বাসার হালিম আংকেল আসলেন। তিনি আমাকে বলছেন-

- তোমার আন্টি আমাকে মানুষিক টর্চারে রাখে। সে যেমন খুশি তেমন জীবন যাপন করে। আমি প্রতিবাদ করলে সে আমাকে নারী নির্যাতন মামলার ভয় দেখায় আর বলে যে তালাক দাও। কিন্তু কাবিনের ওত টাকা তো আমার পক্ষের দেওয়া সম্ভব না! আমি নির্যাতিত। কিন্তু এই সংসার না চেয়েও আমাকে করতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে আমার মন চায় স্ত্রীকে খুন করে ফেলি!

- আপনি কি লাইভে আসবেন আংকেল?

- না রে বাবা... মানসম্মানের ভয় আছে আমার। আর সবাইতো পরে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। যেমনটা তোমাকে নিয়ে করছে।
- তাহলে আমাকে বললেন যে?

- মনটা হালকা করার জন্য,,,

এদিকে এ্যাপার্টমেন্টেরে সোসাইটি হেড আজ এসেছে। তিনি চাপ দিচ্ছেন যে ফ্ল্যাট বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে। আমি বলে দিয়েছি যাবো না। আজ সকালের বেলা চুপচাপ হতাশ মনে হাঁটছি। হঠাৎ এক স্কুল ড্রেস পড়ুয়া ছেলে এসে বললো -

- ভাইয়া আপনি লাইভের ঐ মুয়ীদ ভাইয়া না?

- হ্যাঁ...

-আচ্ছা ভাইয়া আমি একবার গার্লস স্কুলের পাশ দিয়ে আসার সময় কিছু মেয়ে আমাকে দেখে বোতল ছুড়ে মারে। টিজ করে, আচ্ছা সেই একি জিনিস আমরা ছেলেরা করলেতো যৌন হয়রানি হতো। কিন্তু তারা করলে কেন সেটি নিছক মজা? আইনতো সবার প্রতি সমান তাই না?

আমি ছেলেটিকে কিছুই বললাম না। সে চলে গেল। এদিকে একটি টক শো তে আমার ডাক পরেছে। আমি সেখানে গেলাম। উপস্থাপিকা আমাকে বলছেন-

- আপনি সস্তা ফেইমের জন্য লাইভে একজন নারীর নামে যা খুশি তাই বলে যাচ্ছেন এটা কী ঠিক হচ্ছে মুয়ীদ?

- প্রথমত আমি সস্তা ফেইমের জন্য বলছি না। আর দ্বিতীয়ত আমি তার নাম এখনো নেইনি। আমি জানি নাম নিলে আমাকেই জটিলতায় পড়তে হতো। আচ্ছা আমার চেহারা কি আপনারা ব্লার করেছেন?

- মানে?

- আমি তো ভিকটিম...
- আসলে আপনি লাইভে নিজের চেহারা দেখিয়েছেন তাই আমরা আর ব্লার করিনি...

- লাইভ আর টিভি প্রোগ্রাম কিন্তু এক নয়। করা উচিত ছিল...

- আচ্ছা আমি ধরে নিচ্ছি যে আপনার ঘটনা সত্য। আপনার সাথে তো মেয়েটির সম্মতিতে হয়েছে। তাহলে ধর্ষণ কিভাবে?

- সে আমাকে বলেছিল একটা সময় বিয়ে হবে আমাদের। তাই আমি তাকে বিশ্বাস করছি।
- হা হা হা...

- আপনি হাসছেন কেন? বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শুধু মেয়েদেরই ধর্ষণ করা যায়? ছেলেদের নয়?

- দুঃখিত।
- আচ্ছা আমার জায়গায় যদি কোন মেয়ে যদি এই কথাগুলো বলতো তাহলে আপনি হাসতেন না। বিগত কয়েকটা মাস ধরে আমি শুধু তিরস্কারের শিকার হচ্ছি। একজন পুরুষ ধর্ষণ হওয়াটা কি হাস্যকর বিষয়? আমাদের কোন পুরুষ যদি বলে তার স্ত্রী তাকে মারে সেটি কোন অপরাধ নয় সেটি শুনে হাসে সবাই! আসলেই কি জিনিসটা হাস্যকর? ছেলেরা যৌন হয়রানি করলে সাজা পাবে কেননা, এটি গুরুতর অপরাধ। কিন্তু একটি মেয়ে তা করলে সে নিছক মজার ছলে করেছে! আসলেই কি সেটি জাস্ট মজা? আচ্ছা এটাতো একবিংশ শতাব্দী। এখন সময় হলো নারী পুরুষের সমতার। এই সমতার যুগে কিছু নারী অপরাধ করছে তার কোন বিচার নেই বা ছেলেরা বলে না সামাজিক মর্যাদার ভয়ে। এর ফলে কিন্তু অনেক অপরাধের সৃষ্টি হচ্ছে। মজার ব্যাপার দোষ তখনো ছেলেটারই। ছেলেদের জন্য কোন আইন হওয়া উচিত নয় কি আপনারাতো প্রতিবাদ করতে পারছেন। আমরা তো পারছি না! আচ্ছা আপনি কি এটি মানেন যে সব নারীই ভাল নয়?

-হ্যাঁ মানি।

- তাহলে আমরা যারা সেই খারাপ নারীদের দ্বারা ভিকটিম হচ্ছি আমরা কই যাবো? আর কত হাসির খোরাক হবো? আপনারা যেমন কেউ বিরক্ত করলে বলতে পারেন ঘরে মা-বোন নাই! আমরা কি বলতে পারি যে তোমাদের ঘরে কি বাপ ভাই নাই। বললে মার আর তিরষ্কার একটাও মাটিতে পরবে না। আমরা যাবো কই? প্লিজ একটু বলবেন? নারী প্রসঙ্গ বাদ ছেলেদের দ্বারা যে ছেলেরা ধর্ষণ হচ্ছে সেটার জন্য কি উল্লেখযোগ্য শাস্তির বিধান হয়েছে?

- ওহ! আমাদের আজকের অনুষ্ঠানের সময় শেষ হয়ে গিয়েছে মোসাব্বের হোসেন
আমি অনুষ্ঠানটি শেষ করে আর চ্যানেলের গাড়িতে বাসায় আসছি না। এক হেঁটে হেঁটে বাসায় আসছি। সালফিউরিক ল্যাম্পপোস্টের আলো দিয়ে হাঁটছি আর নিজেকে খুব অসহায় লাগছে।
বাসায় পৌছে গিয়ে দেখি মা চিঠি লিখেছেন, “আমি তর বড় ভাইয়ের বাসায় চলে গেলাম। তর কাছে জীবনে আসবো কি না জানি না। বাবারে এসব বাদ দে। অনেক তো করলি। তর জন্য সমাজে আর মুখ দেখাতে পারলাম না রে।”

আমি খুব হাসছি। ছেলদেরতো কাঁদতে মানা...

[বাকি অংশটুকু আর দেয়া গেল না সম্পাদকীয় পলিসির কারণে]

(কাল্পনিক)

লেখক : মোসাব্বের হোসেন মুয়ীদ
LLB, University of London

ঢাকা, ১৯ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।