ফেলে আসা প্যারিস রোডের দিনগুলি


Published: 2018-07-06 17:45:22 BdST, Updated: 2019-08-18 11:32:58 BdST

দীপঙ্কর সরকার: পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে আর যাওয়া হয়নি অন্বেষার। ডিপার্টমেন্টের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা রি-ইউয়নের আয়োজন করা হয়েছে। পরিচিত অনেক বন্ধুই ইতোমধ্যে রেজিস্ট্রেশন করেছে। ক্যাম্পাসে যেতে মনটা সায় দিচ্ছে না অন্বেষার।

কিন্তু সেই স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাসকে তো ভোলা যায় না। পাশ করার পর নিজেকে অনেকটা আড়ালে রেখেছে সে। খানিকটা অভিমান আর ক্ষোভে বিয়ে পর্যন্ত করেনি।

বন্ধুরা হয়তো স্ত্রী, সন্তানসহ আসবে; হই হুল্লোড় করবে কিন্তু সে যে একা। নিজের অমিত সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। এখন নিজের তৈরি একটা স্কুল খুলে সুবিধাবঞ্চিত কচিকাঁচাদের পড়ায় অন্বেষা। অনেক বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গেছে। সে তুলনায় অন্বেষার পেশাও মানানসই নয়। নিতান্ত তুচ্ছ।

নিজের মনের সঙ্গে দীর্ঘক্ষয়ী অর্ন্তযুদ্ধের পর হেরে গেল অন্বেষা। শত অনিচ্ছা সত্ত্বেও রেজিস্ট্রেশন করলো। বন্ধু মহলে এতোদিন পর ও সামনে আসবে সেটিই যেন বন্ধুদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

অন্বেষার নিজেকে আড়ালে রাখার আর একটি কারণও আছে। সেটি রুদ্রর সঙ্গে বিচ্ছেদ। ক্যাম্পাসে এলেই রুদ্রর সঙ্গে দেখা হবে। তাই ক্যাম্পাসে আসা ছেড়ে দিয়েছে ও। সে সময় ক্যাম্পাসে অন্বেষা আর রুদ্র চুটিয়ে প্রেম করতো। তাই সকলের পরিচিত ফেস ছিল তারা। প্রেম বিচ্ছেদে পরিণত হওয়ায় অন্বেষা হেরে গেছে; অনেকটা হারিয়েও গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।

মার্চের ২৭ তারিখে রিইউনিয়ন। দুদিন ব্যাপী এ আয়োজনে নতুন ও পুরাতনের মেলবন্ধন হবে। নতুন করে কাছে পাওয়া যাবে পুরাতন বন্ধুদের। যেন তর সইছে না অন্বেষার। ২৬ তারিখে রাজশাহীতে পৌঁছে গেল ও। তখন রাজশাহীতে সন্ধ্যা নেমেছে। তবুও ইচ্ছে করলো এই সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসটা একবার ঘুরে আসি।

যেই ভাবা সেই কাজ। হোটেল থেকে বেড়িয়ে একটা অটো নিয়ে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল অন্বেষা। অটোটা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আর ও পেছনে ফেলে যাচ্ছে অজস্র স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইনগেটে অটো দাঁড়ালো। ও প্রবেশ করছে ক্যাম্পাসে। ঢুকতেই 'সাবাস বাংলাদেশ ' ভাস্কর্যটি চোখে পড়লো। ঠিক তেমনটিই আছে আগে যেমনটি ছিল।

'সুবর্ণ জয়ন্তী টাওয়ার', 'শহীদ মিনার', 'কেন্দ্রীয় মসজিদ' সব একই আছে। কিচ্ছুটি বদলায়নি। তবে, 'বুদ্ধিজীবি চত্ত্বর' ও 'জোহা চত্ত্বর' নতুন হয়েছে। 'জোহা চত্ত্বরে' তরুণ তরুণীর আড্ডা বসেছে। নবীনদের সাথে আড্ডা দিতে খুব ইচ্ছে করছিলো ওর। কিন্তু ও যে নিজের ক্যাম্পাসেই অচেনা।

এরপর 'প্যারিস রোড' ধরে হাঁটতে শুরু করলো অন্বেষা। আহা! কি তৃপ্তি। ভালবাসার আরেক নাম প্যারিস রোড। রুদ্রর হাতে হাত রেখে কতদিন যে হেঁটেছে ; দুজনে গলা মিলিয়ে কতবার যে উচ্চস্বরে গেয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। সবচেয়ে বেশি গেয়েছে 'সপ্তপদী' সিনেমার সেই গান "এই পথে যদি শেষ না হয়..."

ভাবতে ভাবতে চোখের কোণে জল চলে এলো অন্বেষার। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে 'পশ্চিম পাড়া'। মেয়েদের হোস্টেলের সামনে কত ছেলেরা ভিড় জমিয়েছে মেয়েটাকে একবার দেখবে বলে। ছেলে মেয়েরা চুটিয়ে প্রেম করছে। রাত দশটায় হোটেলে ফিরলো অন্বেষা। মনে হলো আজকেইতো সব দেখলাম ; কালকে গিয়ে আর হবে।

স্মৃতিগুলো মনে করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো ও। সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সকাল ৯ টায় র‍্যালি হবে। সাড়ে আটটায় পৌঁছে গেল অন্বেষা। বন্ধু বান্ধবদের সাথে দেখা হলো। কত গল্প, কত স্মৃতি এই ক্যাম্পাসকে ঘিরে।

রুদ্র এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। মনে ইচ্ছে থাকলেও ওর সাথে কথা বলতে রুচিতে বাঁধলো। যার জন্য অন্বেষার জীবনটা নষ্ট হয়েছে সেই প্রতারকের সঙ্গে আলাপ না করাই ভালো। পড়াশোনা শেষে রুদ্র পিএইচডি করতে লন্ডনে গেল। তখন থেকে অন্বেষার সাথে যোগাযোগে ভাটা পড়েছিল। অন্বেষা যোগাযোগ করতে চাইলে ব্যস্ততা দেখাতো রুদ্র। সাদা চামড়ার দেশে গিয়ে নিজেকে বদলিয়েছে সে। দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মেয়েকে বিয়ে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছে রুদ্র।

সে এখন মানুষ গড়ার কারিগর। রি-ইউনিয়নে বড় বড় বক্তব্য রাখছে। নীতিকথার ফুলঝুরি ফুটছে তার মুখে। শুধু আড়চোখে অন্বেষার দিকে বারবার তাকাচ্ছিলো রুদ্র। অন্বেষা চিন্তা করলো এখানে তার থাকা ঠিক হবে না। তাই, কাউকে না বলে দুদিনের প্রোগ্রামে একদিন থেকে ঢাকায় ফিরে এলো অন্বেষা। ভালো থাক স্বার্থপর, লোলুপ দৃষ্টির মানুষগুলো। কচিকাঁচাদের নিয়েই অন্বেষা ভালো আছে ; কারণ কচিকাঁচাদের অন্তরে অন্তত স্বার্থপরতার জ্ঞান নেই।

লেখক: দীপঙ্কর সরকার
বি: দ্র: সব চরিত্র কাল্পনিক।
ছবি সংগৃহীত।

 


ঢাকা, ০৬ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।