‘আমি বাজি ধরতে পারি, তুমি বাংলাদেশের গর্ব হবে’


Published: 2018-02-19 02:29:15 BdST, Updated: 2018-06-19 08:52:28 BdST

মোহাম্মদ জে এ সিদ্দিকি : কিছুদিন আগে এক বাংলাদেশি ছাত্র আমার ল্যাবে এডমিশন ও স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেছিল। শেষ পর্যন্ত তার এডমিশন হলেও স্কলারশিপ হয়নি। সে আমার কাছে পরামর্শ ও সহযোগিতা চাইলো। তার এখন কী করা উচিত? এখন সে কীভাবে তার পিএইচডি, ভালো একটি দেশে, ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে করতে পারবে?

আমি বললাম “তুমি দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান বা চীন থেকে একটি মাস্টার্স করে ফেলো।” এতে তোমার তিনটি উপকার হবে :
(এক) তোমার গবেষণায় যে দুর্বলতাগুলো আছে সেগুলো (ইচ্ছে করলে) পুষিয়ে নিতে পারবে।
(দুই) ভালো কয়েকটি পাবলিকেশানসও পেয়ে যাবে।
(তিন) সেখান থেকে তুমি গবেষণার একটি কালচার শিখে যাবে যেটি তোমার গবেষণা জীবনের জন্য খুব দরকারি হবে।

সে আমার কথা কী বুঝলো জানি না। সে বলল, স্যার দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান বা চীন না, আমার জন্য ভালো একটি দেশে ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাবস্থা করে দেন। আমি তার কথা শুনে থমকে গেলাম, বলে কী? এর পরেও বিগলিত হাসি দিয়ে বললাম তুমি কী মনে করো যে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন বা তাইওয়ান ভালো দেশ না? ঐসব দেশে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নেই?

এই ঘটানাটি হলো একটি উদাহরণ মাত্র। এটি আমাদের দেশের বা অনেক দেশেরই তরুণ ছেলে-মেদের মনের গহীনের কথা। গত ১০ বছরে কমপক্ষে ২০ বার এমন ঘটনা আমার সঙ্গে ঘটেছে। তবে তারা ভালো দেশ এবং ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায় তা আমার মাথার উপর দিয়ে যায়।

আমার জানামতে পিএইচডি গবেষণার জন্য যেটি দরকার তার মধ্যে প্রথমটি হলো তুমি কোন ল্যাবে (মানে হলো কোন প্রফেসরের, গবেষকের বা বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করছো) এবং কোন প্রজেক্টে কাজ করছো। দেশ বা বিশ্ববিদ্যালয় খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না (সে হিসাবে চিন্তা করলে আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তাদের কোন লেভেলেই টিকে থাকার কথা নয়)।

তুমি পিএইচডিতে কী শিখছো তা অনেকটা নির্ভর করে কোন ল্যাবে, কার সঙ্গে, কোন পরিবেশে কাজ করছো। শেখার জন্য ভালো একজন প্রফেসর, গবেষক বা বিজ্ঞানীকে মেন্টর হিসাবে পাওয়া এবং হাই-কোয়ালিটির ইন্টেলেকচুয়াল পরিবেশে কাজ করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি কোন দেশে বা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটি ভালো দেশ বা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন খারাপ ল্যাব এবং খারাপ প্রফেসর থাকেন, ঠিক তেমনি একটি খারাপ দেশ এবং খারাপ বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেক ভালো ল্যাব বা ভালো প্রফেসরও আছেন।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি প্রত্যেককে পিএইচডি করতে যাওয়ার আগেই একটি বিষয়ে পরিস্কার থাকতে হবে, অন্তত তার নিজের কাছে, তাকে কেন পিএইচডি করতে হবে?

বিদেশে উন্নত জীবনের জন্য বা প্রমোশনের জন্য, এই দুইটির যে কোন একটি যদি কারও পিএইচডি করার কারণ হয়ে থাকে তাহলে পিএইচডি গবেষণার তিন থেকে পাঁচ বছর মহামূল্যাবান সময়গুলোতে তার মনযোগ গবেষণায় থাকবে না। কোনরকমভাবে এটা শেষ করে দেশে চলে যাওয়া বা কীভাবে এখানে উন্নত জীবন ব্যবস্থার সাথে টিকে থাকা যায় সেই রিকুইয়ারমেন্টগুলো পরিপূর্ণ করাই তার মূল কাজ হয়ে যায়। পিএইচডি প্রজেক্টের কমিটমেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বসাকূল্যে তার পেছনে খরচ, ল্যাব বা প্রফেসর যিনি প্রজেক্টের জন্য এত খাটাখাটনি করে তাকে আনলেন, সেগুলোর কোনটাই তার কাছে তখন গুরুত্বপূর্ণ লাগে না। এই সবগুলোই তখন তার মাথার বোঝা।

অথচ একজন ছাত্রকে পিএইচডির জন্য যখন একটি স্কলারশিপ দেওয়া হয়, তখন তার সামনে অফুরন্ত সুযোগ খুলে যায়। তার নিজেকে গঠন করার সুযোগ। নিজের, দেশের বা ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য ভালো কিছু করার সুযোগ। আমি মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যদি একজন ছাত্র পিএইচডির সময়গুলো ভালোমত কাজে লাগায়, অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় তাকে যে কারণে স্কলারশিপটুকু দিয়েছিলো তা যদি যথাযথ ভাবে কাজে লাগায়, তাহলে চাকুরির জন্য তাকে কারও পেছনে দৌড়াতে হবে না। বরং চাকুরি তার পেছনে দৌড়াবে।

বি: দ্র:
১. আশার কথা হচ্ছে পিএইচডি লাইফে চাকরির পেছনে দৌড়ানো বা আখের গোছানোর চেষ্টায় মত্ত বাংলাদেশি ছাত্রদের সংখ্যাটা খুব বেশি নয়। বরং অনেক বাংলাদেশি গ্র্যজুয়েট ভালো মত পিএইচডি করে পৃথিবীর সেরা সেরা জায়গায় গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এরা কেউ দেশে বুয়েট, ঢাবি, জাবি, শাবিপ্রবি এসবে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় এর কোনটাই ছিলো না। মোটামুটি লেভেলের ছাত্র – ক্লাসের পেছনের সারিতেই এদের স্থান ছিল।

২. আমি অনেক বাংলাদেশি ছেলেমেয়েদের চিনি যারা বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেও পৃথিবীর সেরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছে, বিজ্ঞানের মূল ধারায় সরাসরি ভূমিকা রাখছে।

৩. দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, এখন গবেষণায় পিছিয়ে নেই বরং কমান্ডিং পজিশনে। সম্ভবত পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে বিজ্ঞানের উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এরা পৃথিবীর সব দেশের সামনে থাকবে।

৪. যাদের মুটামুটি একটি ভালো রেজাল্ট আছে এবং গবেষণাকে পেশা হিসাবে নিয়ে যারা নিজের জন্য যেমন পজিটিভ তাগিদ অনুভব করো ঠিক তেমনি মানুষের জন্য, দেশের জন্য ভালো কিছু দেওয়ার মানসিকতা আছে তারাই পিএইচডির জন্যে লেগে যাও, চেষ্টা চালাও, আমি বাজি ধরে বলতে পারি তুমি একদিন বাংলাদেশের গর্ব হবে, পৃথিবীর নক্ষত্র হবে।

লেখক : প্রফেসর
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া এবং রিসার্চ লিডার
সাবেক শিক্ষার্থী, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১৯ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।