জুমু‘আর খুতবায় মসজিদুল হারামের খতিব যা বললেন...


Published: 2017-11-29 21:34:10 BdST, Updated: 2018-06-25 00:21:27 BdST

 

 

লাইভ প্রতিবেদক: সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সঙ্কটমুক্তিকে সঙ্কটের সহযাত্রী বানিয়েছেন। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান বিপদ ও পরীক্ষার মাধ্যমে মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। প্রশংসা করছি আল্লাহর, যিনি বিপদগ্রস্তদের ডাকে সাড়া দেন। সঙ্কট ও কঠিন অবস্থা দূর করেন।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপায় সন্ধান করুন। তাঁর ওপর নির্ভর করুন। তাঁর প্রতি একাগ্র হোন। তার ব্যাপারে ভাল ধারণা পোষণ করুন। ভয় ও আশা নিয়ে তাঁকে ডাকুন। স্মরণ করুন আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার দিনকে, যে দিনটির ভয়াবহতা বালকদেরকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিবে।
‘সেদিন মানুষ ভাই থেকে পালাবে। পালাবে মা, বাবা, সঙ্গী ও সন্তানদের থেকে। সেদিন সবারই থাকবে নিজস্ব ব্যস্ততা।’

হে আল্লাহর বান্দাগণ! রাতের আগমন, দিনের পরিবর্তন মানুষের অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। দুঃখ, কষ্ট, বিপদ ও সঙ্কট মানুষের মধ্যে মনস্তাত্তিক প্রভাব ফেলে। শুধু তাই না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তার শরীরে, তার পরিবারে, তার সম্পদে এমনকি তার দেশেও। বিপদ ও সঙ্কটে তার বক্ষ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

সে তা থেকে মুক্তি চায়। এ অবস্থায় তার স্মরণ করা প্রয়োজন তার মহান রবের ঘোষণা ‘তিনি যদি তোমাকে বিপদ দিতে চান, তিনি ছাড়া এ বিপদ থেকে বাঁচানোর কেউ নেই। তিনি যদি তোমাকে কল্যাণ দিতে চান, এ কল্যাণ ঠেকানোর কেউ নেই। তিনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাশালী।’

তিনি আরো বলেন, ‘বলো, তোমাদেরকে জল ও স্থলের অন্ধকার থেকে কে রক্ষা করেন? তোমরা তাঁকে ডাকো বিনয়ের সাথে ও গোপনে। তোমরা বলো, তিনি যদি আমাদেরকে এর থেকে রক্ষা করেন তাহলে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবো।’
একজন মুসলিম বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই সকল সঙ্কট থেকে রক্ষাকারী। সকল বিপদ ও কষ্ট দূরকারী।

এ বিশ্বাস নিয়ে সে তাঁর কাছে দু‘আ করে নিষ্ঠা ও বিনয়ের সাথে। প্রার্থনা করে হৃদয়ে ভয় পোষণ করার মাধ্যমে। সে গুরুত্বের সাথে খুঁজে নেয় দু‘আ কবূলের সময়গুলোকে। রক্ষা করে দু‘আর আদব ও শিষ্টাচার। যেমন, ওযু, কিবলামুখী হওয়া, আল্লাহর হামদ ও রাসূলের ওপর সালাত ও সালাম পেশের মাধ্যমে দু‘আ শুরু এবং শেষ করা। দু‘আয় আল্লাহর কাছে দু‘হাত তোলে।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।’
একদিকে দু‘আ করতে হবে; অন্যদিকে আশা পোষণ করবে যে, আল্লাহ সংকট থেকে প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যাবেন, দুশ্চিন্তামুক্ত করবেন।
দু‘আতে ওইসব বিষয়কে ওয়াসীলা তথা মাধ্যম বানানো যাবে যাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাধ্যম বানিয়েছেন।

ইমাম তিরমিযী (রাহি.) আনাস (রা.)-র সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্কটকালীন সময়ে বলতেন, ‘ইয়া হাইয়্যূ ইয়া কাইয়্যূমু বিরাহমাতিকা আসতাগিছ’


‘হে চিরঞ্জীব, হে নিজ থেকে প্রতিষ্ঠিত! আমি তোমার করুণা ও দয়ার মাধ্যমে সাহায্য চাই।’
বিপদ ও সঙ্কট থেকে রক্ষা পাওয়ার আরেকটি দু‘আ হলো ইউনুস (আ.) মাছের পেটে থেকে যে দু‘আটি করেছেন। আর তা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায-যালিমীন’ ‘তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তুমি পবিত্র। আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো মুসলিম এটি পড়ে আল্লাহর কাছে দু‘আ করলে, আল্লাহ তাতে সাড়া দেবেন। (হাকিম)

এটি মূলত আল্লাহর ঘোষণা। তিনি বলেন, ‘আমি তার (ইউনুসের) ডাকে সাড়া দিয়ে, তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছি, অনুরূপ মুমিনদেরকে আমি মুক্তি দেবো।’
সঙ্কট থেকে মুক্তি, কঠিন অবস্থা দূর করা, কিয়ামাত দিবসের বিভীষিকাময় অবস্থান থেকে পরিত্রাণ লাভের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান।

তাঁর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা, তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে এমন সবকিছু বর্জন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ, আল্লাহর শরীয়াহ অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন, তার বিপরীতে চলা থেকে সতর্ক থাকা।

বিপদ-সঙ্কট থেকে বাঁচার আরেকটি উপায় হলো, আল্লাহর বান্দাদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা। এ ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। হেরা গুহা থেকে ভীত হয়ে ঘরে ফিরে আসার পর খাদীজা রাদিআল্লাহু আনহা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কক্ষণো নয়, আল্লাহর কসম, আল্লাহ কখনো আপনাকে অসম্মানিত করবেন না।

কেননা আপনি জরায়ুর সম্পর্ক রক্ষা করেন, বিপদগ্রস্তদের বোঝা বহন করেন, মেহমানদারী করেন, নিঃস্বদের সহায়তা করেন, সত্যিকার বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন।’ (বুখারী ও মুসলিম) মানুষের প্রতি ইহসান তথা অনুগ্রহের অন্যতম দিক হলো দীনি ভাইদের অধিকার রক্ষা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণ পরস্পর বন্ধু।’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ভালবাসা, সম্প্রীতি ও হ-মমতায় মুমিনরা এক দেহ স্বরূপ। দেহের একটি অঙ্গ যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয় তখন তার বেদনায় পুরো দেহ জ্বরাক্রান্ত হয়ে রাত জাগে। (মুসলিম)

ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.)-র সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই, সে তার ওপর যুল্ম-অবিচার করে না। তাকে বিপদে একা ছেড়ে দেয় না। যে তার ভাইয়ের বিপদে তার পাশে থাকে, আল্লাহ তার বিপদে তার পাশে থাকেন। যে দুনিয়াতে তার কোনো ভাইয়ের বিপদ-সঙ্কট দূর করে, আল্লাহ তার কিয়ামাত দিবসের সঙ্কট দূর করবেন।

যে কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামাতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। যে দুনিয়াতে কারো কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কষ্ট লাঘব করবেন বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্য করতে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহ তার সাহায্য করতে থাকবেন।’

এ হাদীস থেকে বুঝা গেল, আল্লাহ বান্দাদেরকে ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ দেবেন। দুনিয়ায় কেউ সঙ্কট থেকে রক্ষা করলে পরকালে আল্লাহ তাকে সঙ্কট থেকে রক্ষা করবেন।
মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়ার সঙ্কট আর পরকালের সঙ্কট এক নয়। বরং আখিরাতের সঙ্কট অনেক বেশি ভয়াবহ। পরকালের এই ভয়াবহ সঙ্কটে আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ বেশি বেশি প্রয়োজন। আল্লাহ তাঁর ওইসব বান্দার প্রতি রহম ও অনুগ্রহ করবেন, যাদের মধ্যে দয়া ও অনুগ্রহ আছে।

‘যে কোনো মুসলিমের সঙ্কট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামাত দিবসে তার সঙ্কট দূর করবেন।’ ইসলামী গবেষকগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এটি হলো মুসলিমের বিপদ দূর করা এবং প্রয়োজন পূরণ করার ফযীলত ও মর্যাদা।
একজন মুসলিম সম্ভাব্য সকল উপায়ে আরেক মুসলিমের কল্যাণে কাজ করবে তার জ্ঞান ও শিক্ষা দিয়ে।

তার পদ-পদবী ব্যবহার করে, উপদেশ দিয়ে, ভাল কাজে উৎসাহ দিয়ে, সুসংবাদ দিয়ে, সুপারিশ করে, মধ্যস্ততা করে, সর্বোপরি তার অনুপস্থিতিতে তার জন্য দু‘আ করে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে গোটা সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার। আমাদের সমাজের একটি বিষয় সবার জানা যে, কোনো নেতা বা শাসক, তার পরিবার-পরিজন বা আপনজনের প্রতি কেউ ভাল আচরণ করলে তাতে খুশি হন। সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ করলে আল্লাহ অবশ্যই খুশি হবেন।


এ অনুগ্রহ হলো কাউকে বিপদে সাহায্য করা, সঙ্কট দূর করতে সহায়তা করা, ভয়-ভীতি দূর করা, দুর্বলদের সাহায্য করা। বিশেষ করে মুসলিমদের অধিকার রক্ষা করা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না। একে অপরের পেছনে লাগবে না; একজনের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর আরেকজন ক্রয়-বিক্রয় করবে না। আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ভাই-ভাই হয়ে যাও। এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই, সে যুল্ম-অবিচার করে না। তাকে অপমান করে না।

তাকওয়া আল্লাহর ভয় এখানে (বুকের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথাটি তিনবার বলেছেন)। একজন লোকের মন্দ হওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে অপমান করে। একজন মুসলিমের কাছে আরেক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্ভ্রম মর্যাদার বিষয়।’

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহকে ভয় করুন। দীনি ভাইদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হোন। এর মাধ্যমে সফলতা অর্জন করবেন। আর তা হলো জান্নাত। দুনিয়া ও আখিরাতে সঙ্কট থেকে মুক্তি।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহকে ভয় করুন। দীনি ভাইয়ের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হোন। তাদের বিপদ ও সঙ্কটে তাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের কল্যাণ হয়, এমন কাজে তাদেরকে সাহায্য করুন। আল্লাহ আপনাদেরকে যে অফুরন্ত নিয়ামাত দিয়েছেন, তার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের চেষ্টা করুন। কুরআনের হেদায়াত ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনকে পরিচালিত করে আদর্শ ও অনুকরণীয় মুসলিম হিসাবে ইসলামের সর্বোত্তম নমুনা পেশ করুন।

খতিব: শাইখ উসামাহ বিন আবদুল্লাহ আল-খাইয়্যাত

অনুবাদ: অধ্যাপক আ.ন.ম. রশীদ আহমদ
খুতবার তারিখ: ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী; ২৪ নভেম্বর ২০১৭ ঈসায়ী

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।