''অস্তিত্ব রক্ষায় নৈতিকতার ভূমিকা''


Published: 2019-12-02 01:53:58 BdST, Updated: 2020-04-06 00:39:06 BdST

আতাউর রহমান খসরুঃ পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে বহু জাতি ও সভ্যতার উত্থান ও পতন হয়েছে। বহু জাতি-সভ্যতা ও তাদের নিদর্শন হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকলেও অনেকেই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। তাদের বিকাশ ও বিনাশের পেছনে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকগণ যেসব কারণ তুলে ধরেছেন নৈতিক স্খলন ও চারিত্রিক অধঃপতন তার অন্যতম।

খ্যাতিমান আরব সাহিত্যিক ড. আহমদ শাওকি চমৎকার বলেছেন, ‘একটি জাতি যত দিন তাদের নীতি-নৈতিকতার ওপর টিকে থাকে তাদের অস্তিত্ব টিকে থাকে, যখন তাদের নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় হয় তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়।’ (আল ইত্তেজাহাতিল ওতানিয়্যা ফিল আদাবিল মুআসির, পৃষ্ঠা ১৮৪)

বিলোপ ঘটে যেভাবেঃ

আল্লামা ইবনে খালদুন (রহ.) জাতি, সভ্যতা ও সাম্রাজ্যকে মানুষের জীবনের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘মানুষের মতো তার জন্ম হয়, তা ধীরে ধীরে শক্তি অর্জন করে, সামর্থ্যবান হয়, বৃদ্ধ হয় (জৌলুস ফুরিয়ে যায়) এবং তার মৃত্যু হয়।’

অতঃপর তিনি চারিত্রিক গুণাবলি ও নৈতিকতাকে জাতিসত্তা ও সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার চাবিকাঠি বলে অবহিত করেন। তিনি বলেন, ‘জাতির শক্তি-সামর্থ্য তাদের বস্তুগত শক্তি, বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির দ্বারা প্রমাণিত হয় না; বরং উত্তম চরিত্রে তাদের পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।’ (মাজাল্লাতুল বুহুসুল ইসলামিয়া, দ্বিতীয় সংখ্যা)

নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী জে ডি আনউইন তাঁর ‘সেক্স অ্যান্ড কালচার’ বইয়ে দাবি করেছেন, তিনি পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস, ছয়টি সভ্যতা ও ৮০টি গোত্রের ওপর গবেষণা করে এই সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছেন যে নৈতিক স্খলনের কারণেই এসব গোত্র ও সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি আরো দাবি করেছেন, যৌন উন্মাদনা ও সামাজিক শক্তি সমান্তরালে চলতে পারে না।

জাতির পতনের কারণঃ

কোরআনে বর্ণিত জাতিসমূহের ইতিহাস প্রমাণ করে কোনো জাতির উত্থান, অগ্রগতি ও অস্তিত্ব রক্ষায় নৈতিকতা অপরিহার্য। কোনো জাতি যখন ঘৃণ্য অনৈতিকতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়। সুরা আরাফে আল্লাহ সেদিকেই ইঙ্গিত করে বলেন, ‘যদি সেসব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং আল্লাহকে ভয় করত, তবে আমি আসমান ও জমিনের কল্যাণসমূহ তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতাম।

কিন্তু তারা অস্বীকার করল। ফলে আমি তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিলাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৬)। আর যে সমাজ পাপ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে এবং যারা নিজেদের মধ্যে ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ’-এর চর্চা অব্যাহত রাখে তাদের আল্লাহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের আগে আমি যাদের রক্ষা করেছিলাম তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন ছাড়া ভালো মানুষ ছিল না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করত। সীমা লঙ্ঘনকারীরা যাতে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পেত তার অনুসরণ করত। তারা ছিল অপরাধী।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৬)।

সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বঃ

সুরা হুদের উল্লিখিত আয়াত থেকে বোঝা যায়, নৈতিক মূল্যবোধ, নৈতিকতার চর্চা ও সমাজ সংস্কার জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষায় অপরিহার্য। সুতরাং ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে ‘সামাজিক ও নৈতিক’ মূল্যবোধকে ধ্বংস করে এমন কাজের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুমোদন অগ্রহণযোগ্য। এমনকি কোনো ব্যক্তি যদি তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনেও অনৈতিক হয়, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে তাকে ফেরানো।

এ ব্যাপারে আল্লাহর হুঁশিয়ারি হলো, ‘আমি যখন কোনো জনপদ ধ্বংস করতে চাই, তখন তার ধনী ব্যক্তিদের সৎকাজ করার আদেশ দিই, কিন্তু তারা সেখানে পাপে লিপ্ত হয়। ফলে তারা শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যায় এবং আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ১৬)

মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ধনী দ্বারা এখানে আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তি উদ্দেশ্য। যাদের ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সামাজিক অবস্থানের কারণে মানুষ তাদের অনুসরণ করে। আল্লাহ তাআলা এই শ্রেণির দুর্নীতি, স্খলন এবং তাদের দ্বারা সামাজিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত করেন।

সভ্যতার বিকাশে নৈতিকতার অবদানঃ

ইসলাম আগমনের মাত্র অর্ধশতাব্দীর ভেতর তা পৃথিবীতে এক অপরাজেয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে, ধর্মীয় ইতিহাসে যার কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। ড. রাগিব সার্জানি এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছেন।

তা হলো—এক. আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং ক্ষমতা ও সাহায্যের ওপর দৃঢ়বিশ্বাস স্থাপন; খ. ঐক্য ও একতা; গ. চারিত্রিক মাধুর্য ও ন্যায়পরায়ণতা, শাসক ও শাসিতের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা; ঘ. জ্ঞানচর্চা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামের প্রচার ও প্রসার; ঙ. প্রয়োজনীয় শক্তি-সামর্থ্য ও উপকরণ অর্জন।

(https://bit.ly/37NDIcY) ঈমান, আল্লাহভীতি ও নৈতিক জীবন ইসলামের প্রাণসত্তার সঙ্গে মিশে আছে। হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশির দরবারে জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) ইসলাম ও ইসলামের নবীর যে পরিচয় তুলে ধরেন, তাতে নৈতিকতার দিকগুলো প্রবলভাবে উঠে আসে। তিনি বলেন, ‘হে বাদশাহ! আমরা ছিলাম মূর্খ জাতি।

আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত পশুর গোশত খেতাম, অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতাম, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সঙ্গে অসদাচরণ করতাম, আমাদের ধনীরা দরিদ্রদের সম্পদ আত্মসাৎ করত; আমরা এমনই ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের ভেতর একজন রাসুল প্রেরণ করলেন।

আমরা তাঁর বংশীয় পরিচয়, সত্যবাদিতা, সততা ও দয়ার কথা জানি। তিনি আমাদের আল্লাহর একত্ববাদ ও ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানালেন। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে মূর্তি ও পাথরের পূজা করত তা পরিত্যাগ করতে বললেন। নির্দেশ দিলেন সত্য বলার, আমানত বুঝিয়ে দেওয়ার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার, হারাম ও রক্ত থেকে বিরত থাকার।

নিষেধ করলেন অশ্লীলতা, মিথ্যা বলা, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, পবিত্র নারীর ওপর অপবাদ দেওয়া থেকে।’ (আল জামিউস সাহিহ মিম্মা লাইসা ফিস-সাহিহাইন : ৩/৩৪৪)

সংকট ও মুসলিম উম্মাহঃ

শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে বস্তুবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা হলো মানুষের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ। বস্তুবাদী সভ্যতার আরাধ্য ভোগবাদ মানবসমাজে গভীর এক মানবিক সংকট তৈরি করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা সাম্রাজ্যবাদের বাহকে পরিণত হয়েছে। নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক আলবেয়ার কামুর ভাষায় এটি মানবতার সংকট। বিশ্বাস ও নৈতিকতা মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামী সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি হওয়ায় বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থায় তারা নানাভাবে পর্যুদস্ত হচ্ছে।

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.) বলেন, ‘ইসলামী বিশ্বের বর্তমান অধঃপতনের পেছনে জাতীয়বাদী ধ্যান-ধারণা ছাড়াও আরেকটি ফিতনার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা হলো সমাজের শিক্ষিত ও নেতৃস্থানীয় মহলের ভোগবাদী মানসিকতা এবং পার্থিব আরাম-আয়েশের পেছনে হন্যে হয়ে ছোটা।

যার স্বাভাবিক পরিণতি মানবীয় বৈশিষ্ট্যাবলি ও নৈতিকতার অবক্ষয়। ...ইসলামী দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে আজ এই ভোগবাদী মানসিকতা লালনকারী এক বিশাল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি আমাদের জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।’ (নতুন তুফান ও তার প্রতিরোধ, পৃষ্ঠা ২২-২৩)

উত্তরণের উপায়ঃ

আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.) এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় জাগরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ইসলামের বিশুদ্ধ চর্চা ও তার প্রসার, প্রয়োজনী সংস্কার ও বিপ্লব, দ্বিনি দাওয়াত ও দ্বিনের জন্য আত্মনিবেদন, অতীত থেকে শিক্ষাগ্রহণ ও ভবিষ্যতের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সঠিক কর্মপদ্ধতির অনুসরণ মুসলিম উম্মাহকে আগামী দিনের সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায়...।

[email protected]

ঢাকা, ০১ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।