মসজিদে হারামের খুতবা: ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের ভাল-মন্দ


Published: 2018-07-19 16:29:03 BdST, Updated: 2018-12-18 01:56:46 BdST

শাইখ সালিহ আল-হুমাইদ, মক্কা মুকাররামা: সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি একাই টিকে থাকবেন। তিনি একাই স্থায়ী। তিনিই কর্তৃত্বশালী, পবিত্রও শান্তিময়। আমি আমার নিজকে এবং আপনাদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। আল্লাহর ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করুন। তাকে ভয় করুন।

জেনে রাখুন যে, বান্দার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহ ও সৌভাগ্যের প্রমাণ হলো আল্লাহকে মানা ও সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ, সৎ ও ভালো লোকদের সাহচর্য্য, উত্তম চরিত্র, কল্যাণকর কাজ, রক্তসম্পর্ক রক্ষা, সময়ের সদ্ব্যবহার, মুসলিমদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান।
সুস্থতার চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে?

প্রয়োজনীয় বিষয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কী হতে পারে? অবাধ্যতা ও পাপাচার বর্জনের চেয়ে কল্যাণকর বিষয় আর কী হতে পারে? শিষ্ঠাচারের চেয়ে আর কিসে ভদ্রতার পরিচয় পাওয়া যাবে?

যার মধ্যে সততা নেই, তার মধ্যে ব্যক্তিত্ব নেই। যার মধ্যে লজ্জা নেই, তার মধ্যে সম্মানবোধ নেই। আল্লাহ বলেন, ‘ক্ষমার নীতি গ্রহণ করো, ভালো কাজের আদেশ দাও, মূর্খদের এড়িয়ে চলো।’ সময়, সময়ের সদ্ব্যবহার, সময় থেকে উপকৃত হওয়া, সময় নিয়ে আত্মসমালোচনা এ বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন।

সময় সোনা নয়, বরং সোনার চেয়েও মূল্যবান। সময়ের সমষ্টি হলো জীবন। সময়ই হলো মানুষের বয়স। জ্ঞানীজন বলেন, যার জীবন থেকে একটি দিন অতিবাহিত হয়ে গেল, আর এ দিন তার ওপর অর্পিত কোনো অবশ্যকর্তব্য পালন করেনি,কোনো ভাল কাজ করেনি, জ্ঞানর্জন করেনি সে নিজের ওপর যুল্ম তথা অবিচার করলো।

ওই দিনটির সাথে সে অসদাচরণ করলো, নিজ বয়সের সাথে খিয়ানত তথা অবিশ্বস্ত আচরণ করলো। ইসলামের ফরয তথা অবশ্যপালনীয় কাজগুলোর বণ্টন ব্যবস্থা সময় সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় তাকে গুরুত্ব দেয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত হলো এক দিনের মানদণ্ড। জুমু‘আ হলো সপ্তাহের মানদণ্ড।

রামাদান বছরের মানদণ্ড। আর হজ্জ হলো জীবনের মানদণ্ড। এর প্রত্যেকটিই একজন মুসলিমকে সতর্কতার সাথে স্মরণ করিয়ে দেয় তার একটি দিন আছে,
সপ্তাহ আছে। তার জন্য রয়েছে বছর ও জীবন। অতিশয় দুঃখের বিষয় যে, অনেকেই অযথা সময়
নষ্ট করছে, আর এতে তার কোনো চেতনা নেই।

মুসলিম ভাইগণ! সময়, সময়ের গুরুত্ব, সময়ের সদ্ব্যবহার বিষয়ে কথা বললেই, এমন একটি বিষয়ে কথা বলতে হয়, আমাদের জীবনে সম্প্রতি যে বিষয়টির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। শুধু তাই নয়, সেটি মানুষের সকল বিষয়ের সাথে একাকার হয়ে মিশে গিয়েছে আর তা হলো নেট, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম।

হে মুসলিমগণ! নেট, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসমূহ মানবতার জন্য উত্তম একটি
সৃষ্টি। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমে গিয়েছে, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। সম্পর্ক মজবুত হয়েছে, সময় বেঁচে যাচ্ছে, সহজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে।

এসব প্রযুক্তি ও মাধ্যমকে ভাল ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এটি একটি নেয়ামাত। এ নেয়ামাতের শোক্র তথা কৃতজ্ঞতা আদায় প্রয়োজন। কৃতজ্ঞতার সবচেয়ে উত্তম প্রকাশ হলো এসব মাধ্যমের উত্তম ব্যবহার। আল্লাহর বিধান মানা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নিজের ও মানুষের কল্যাণে এর থেকে উপকৃত হওয়া, সময়কে সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগানো।

এ তো গেলো একটি দিক। এসব প্রযুক্তি ও মাধ্যমের আরেকটি দিক হলো এগুলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদের উপকরণ। কী সাধারণ, কী বিশেষ সকল শ্রেণী এর চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে ঘুম থেকে চোখ খুলেই তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে দিনের শুরু,
রাতে চোখ বন্ধ হয় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার শেষে।

রাত-দিনে, আলোতে-অন্ধকারে পুরো সময়টাই কাটে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসমূহের সাথে।
এ মাধ্যমগুলো একজন মানুষকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখে। ‘সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম’ বাস্তব জীবনের অতি প্রয়োজনীয় যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত রাখে। যেমন পিতামাতার সাথে যোগাযোগ, নিকট-আত্মীয়ের সাথে যোগাযোগ।

এটি কতই না বিপদের কথা! একজন ছাত্র তথ্য-প্রযুক্তির উপকরণের সাথে এত বেশি সম্পর্ক রাখে যে, বই-কলমের সাথে এতটা সম্পর্ক রাখে না। ফলে না ভালো পড়তে পারে, আর না ভালো লিখতে পারে। আপনারা দেখে থাকবেন পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব আনন্দ ও বিনোদনের জন্য কোথাও গেলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এত ব্যস্ত থাকে যে, মনে হয় তারা নির্বাক মূর্তি। মনে হয় তাদের অন্তর থাকলেও বোধ নেই।

কান থাকলেও শোনে না, চোখ থাকলেও দৃষ্টিশক্তি নেই।
এ অবস্থাটি সবার ক্ষেত্রেই সমান। কি শিক্ষিত আর কি অশিক্ষিত। কি নারী বা কি পুরুষ ছোট আর বড় সবার একই অবস্থা! এ প্রযুক্তি আমাদের সময়, চিন্তা-চেতনা, অগ্রাধিকার পাওয়ার মতো কাজ সব ছিনিয়ে নিচ্ছে।
আমাদের মূল্যবান সময়কে বিনষ্ট করে দিচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমসমূহ কত মানুষের অনুভূতি, সুখ-শান্তি, কল্যাণকে বিনষ্ট করে দিচ্ছে।
নেটে কুরআন-হাদীস, ইসলাম বিষয়ে অনেক সাইট আছে। কিন্তু অনেকেই সেগুলো দেখছে না, অনুসরণ করছে না।
এ প্রযুক্তি অনেক জ্ঞানী ও গুণীজনকে পদস্খলন ও বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তারা নিজেদের ভাল কাজগুলো যেমন সালাত, সাদাকাহ, হজ্জ, উমরা, নিজেদের ইসলাম বিষয়ে আলোচনা, বক্তৃতা
সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করছে। এতে একদিকে রিয়া তথা প্রদর্শনেচ্ছা হচ্ছে, অন্যদিকে অনেকে এগুলোর ওপর ভাল ভাল কমেন্ট-মন্তব্য করছে, প্রশংসা করছে; আর এতে সে আত্মতৃপ্তি লাভ করছে।

এর পরিণতি হলো সে পরকালে এর প্রাপ্তি ও প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ ভালবাসেন এমন বান্দাকে যে তাকওয়া সম্পন্ন, পরিচ্ছন্ন, সচ্ছল এবং গোপনে ভাল কাজ সম্পাদনকারী।’ (মুসলিম)

মুসলিমে আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যার মূলকথা হলো জাহান্নামের আগুনে প্রথম যারা নিক্ষিপ্ত
হবে তারা হলো এমন মুজাহিদ যে বীর হিসাবে পরিচিতি লাভের জন্য জিহাদ করেছে; এমন কুরআন তিলাওয়াতকারী যার তিলাওয়াতের উদ্দেশ্য লোকেরা তার তিলাওয়াতের প্রশংসা করবে; আর এমন দানকারী যার দানের উদ্দেশ্য ছিল লোকেরা তাকে দানশীল বলবে।

তথ্য-প্রযুক্তির আরেকটি মারাত্মক ক্ষতিকর দিক হলো এর মাধ্যমে মিথ্যা, তথ্যবিহীন কথা ছড়ানো হয়। ইসলামের নামে সূত্রবিহীন অনেক মিথ্যা কথা প্রচার করা হয়। বিভ্রান্তিমূলক অনেক ফাত্ওয়া দেয়া হয়। অনেকে আবার ছদ্মনাম ব্যবহার করে অনেক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বিষয় প্রচার করে। এটি ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট হারাম।

বন্ধুগণ! আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে, আমাদের আনন্দের সময়, আমাদের
পানাহারের সময়ে এসব তথ্য-প্রযুক্তির জোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষ করে সামাজিক
যোগাযোগের মাধ্যমসমূহ আমাদের জীবনে এতবেশি প্রভাব ফেলেছে যে, এগুলো এখন বিচ্ছিন্নতার’ উকরণ, যোগাযোগের উপকরণ নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো আদম সন্তান (কিয়ামত দিবসে) পা নাড়াতে পারবে না যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে জীবনকে কিভাবে নিঃশেষ করেছে, যৌবনকে কিভাবে কাজে লাগিয়েছে, সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে আর কিভাবে ব্যয় করেছে; শিক্ষাকে কিভাবে কাজে লাগিয়েছে।’

হে মুসলিম সমাজ! যারা তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমের প্রতি আসক্ত হয়ে আছে, তারা তাদের জীবনের কত মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। কত গুরুত্বপূর্ণ কাজে অবহেলা করছে। তারা দীর্ঘ সময় ধরে চ্যাটিং করছে, এতে তাদের উপকারটা কী হচ্ছে? তার ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবনে কী কল্যাণ হচ্ছে? বরং এর মাধ্যমে তার জীবনের অতি মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।

তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমগুলোতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী ‘রূআই
বিদাহ’-র আবির্ভাব ঘটেছে, যারা মানুষের মাঝে ভিত্তিহীন কথার প্রসার ঘটাবে। দীনি বিষয়ে এমনসব কথা বলবে যার কোনো উৎস নেই। উদ্ভট ও চটকদার বিভিন্ন তথ্য ও বিষয়ের উদ্ভাবন করে তার প্রসার ঘটাবে।

তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারে যত্নশীল ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। এগুলোর ব্যবহার যেন আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে বাধা না দেয়। আমাদের ইবাদত পালনে যেন সমস্যা না করে।

আল্লাহকে ভয় করুন। আত্মসমালোচনা করুন। তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণকর ব্যবহার করুন। এগুলোর
নেতিবাচক দিকের ব্যাপারে সতর্ক ও সাবধান থাকুন। মনে রাখবেন, ‘দু’জন গ্রহণকারী (ফেরেশতা) একজন ডানে, আরেকজন বামে বসে প্রতিটি বিষয় সংরক্ষণ করেন। কেউ মুখ থেকে এমন একটি শব্দও উচ্চারণ করে না যখন তার পাশে একজন পাহারাদার নিয়োজিত না থাকে।’ (কাফ: ১৭-১৮)

অনুবাদ: অধ্যাপক আ.ন.ম. রশীদ আহমাদ


ঢাকা, ১৯ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।