মসজিদে নববীর খুতবা: 'শয়তান প্রকাশ্য শত্রু'


Published: 2018-04-23 21:52:30 BdST, Updated: 2018-08-19 06:12:31 BdST

শাইখ আবদুল মুহসিন আল-কাসিম, খুতবা, মসজিদে নববী, মদীনা মুনাওয়ারা: সকল প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তাঁরই প্রশংসা করছি। তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। তাঁর কাছেই ক্ষমাচাই। আশ্রয় চাই আমাদের নাফসের অনিষ্ট ও মন্দ কাজ থেকে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহকে ভয় করুন। প্রকাশ্য ও গোপনে তাঁর পর্যবেক্ষণকে স্মরণে রাখুন।

হে মুসলিমগণ! এ পৃথিবী আমাদের জন্য পরীক্ষাগার। সবচেয়ে ভয়াবহ পরীক্ষা হলো এমন বিষয় যারব ও তাঁর দীনের সাথে বান্দার সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। বান্দার জন্য একটি সমস্যার বিষয় হলো

শত্রু ও বন্ধু চেনা। আল্লাহর বিশেষ মেহেরবানি যে, তিনি মানুষের প্রকাশ্য শত্রুকে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন।’
শয়তান মানুষের এমন জঘন্য দুশমন যে, মানুষের বিরুদ্ধে তার দুশমনী অব্যাহতভাবে চলছে, তা কখনো বন্ধ হয় না।
সে নিজেই সকল আদম সন্তানের বিরুদ্ধে শত্রæতার ঘোষণা দিয়ে বলেছিল,‘যাদের কারণে তুমি আমাকে বিতাড়িত করলে, তাদের জন্য আমি তোমার সিরাতে মুসতাকীমের
ওপর বসে থাকবো। অতঃপর তাদের সামনের দিক থেকে আসবো, পিছনের দিক থেকে আসবো।

ডান দিক থেকে আসবো, বাম দিক থেকে আসবো। তুমি তাদের অধিকাংশকে তোমার প্রতি
কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হিসাবে পাবে না।’ (আল-আ‘রাফ: ১৬-১৭)

আদম ও তার বংশধরদের প্রতি শয়তানের শত্রুতার কারণ হলো আল্লাহ আদমকে শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি তাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, জান্নাতে তাকে থাকতে দিয়েছেন, তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। ফেরেশতাগণকে দিয়ে তার সম্মানে সিজদা করিয়েছেন। তার বংশধরকে মর্যাদা দিয়েছেন। মানুষকে দেয়া এসব মর্যাদার কারণে সে হিংসা করলো। দম্ভ ও অহংকার করে আদমকে সিজদা করা থেকে বিরত থাকলো।

শয়তান বললো, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো আগুন থেকে, আর তাকে সৃষ্টি করেছো কাদামাটি থেকে।’ (আল-আ‘রাফ: ১২) তাকে যখন জান্নাত থেকে বিতাড়িত করা হলো, তখন সে মানুষের বিরুদ্ধে তার শত্রু তার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে বললো, ‘তোমার সম্মান ও পরাক্রমশীলতার শপথ! আমি তাদের সবাইকে ভ্রান্তির
দিকে ঠেলে দিবো।’ (সা‘দ: ৮৩) শুরু হলো তার শত্রুতা। আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালামের সামনে আল্লাহর অবাধ্যতাকে কৃত্রিম কল্যাণকর হিসাবে চিত্রায়িত করলো সে। তারা প্ররোচিত হলেন, ফলে তাদেরকে জান্নাত থেকে বেরিয়ে আসতে হলো। তার এ দুশমনী ও ষড়যন্ত্র এখনো চলছে।

২. তার ষড়যন্ত্র পরিচালিত হচ্ছে মানুষের স্বচ্ছ আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদাত, শরীর, আত্মা, সন্তানসম্পদ, খাবার-পানীয়, নিদ্রা-জাগ্রত থাকাসহ সকল অবস্থা ও বিষয়ে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘শয়তান তোমাদের প্রতিটি অবস্থায়, প্রতিটি বিষয়ে তোমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়।’ (মুসলিম)

তার বিভ্রান্তকরণের প্রথম লক্ষ্যবস্তু হলো আকীদা। তার চেষ্টা হলো মানুষের বিশুদ্ধ আকীদাকে বিকৃত ও বিনষ্ট করা। আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের কাছ থেকে এ প্রতিশ্রুতি নেইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত-দাসত্ব ও গোলামী করবে না? সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (ইয়া-সীন: ৬০)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘প্রতি সকালে ইবলীস তার বাহিনীকে চার দিকে পাঠায় ও বলে, ‘আজ যে কোনো মুসলিমকে বিভ্রান্ত করবে আমি তাকে মুকুট পরাবো।’ (ইবনু হিব্বান) স্বভাবজাত তাওহীদ মানুষের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়। ইবলীস ও তার অনুগামীরা মানুষের এ স্বভাবজাত তাওহীদ-বিশ্বাসকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করে। একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,

‘আমি আমার বান্দাদেরকে তাওহীদের ওপর একনিষ্ঠ করে সৃষ্টি করেছি, শয়তান এসে তাদেরকে তাদের (তাওহীদ নির্ভর) দীন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছিলাম তাকে হারাম বানিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে আমার সাথে র্শিক করতে আদেশ করেছে। অথচ এ বিষয়ে আমি কোনো দলীল-প্রমাণ অবতীর্ণ করিনি।’ (মুসলিম)
যে-ই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব ও গোলামী করে, সে মূলতঃ শয়তানের ইবাদাত করে।
আল্লাহ বলেন, ‘তারা তো মূলত বিভ্রান্ত শয়তানের ইবাদত করছে।’ (নিসা: ১১৭)

কিয়ামত সংঘটিত হবে নিকৃষ্টতম লোকদের ওপর দিয়ে। এসব লোকরা ভালকে ভাল মনে করবে না, মন্দকে মন্দ ভাববে না। শয়তান তাদেরকে বলবে, তোমরা কি আমার আহŸানে সাড়া দিবে না? তারা বলবে, তুমি আমাদেরকে কোন বিষয়ে আদেশ করছো? সে তাদের মূর্তিপূজা করার জন্য আদেশ করবে।’ (মুসলিম) ইবাদতের ক্ষেত্রে তার ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক চেষ্টা হলো ইবাদতের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি করা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কাউকে শয়তান যদি এ প্ররোচনা দেয় যে, তোমার তো ওযু চলে গিয়েছে, সে যেন বলে, ‘তুমি মিথ্যা বলছো।’ (আহমাদ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন শয়তান এসে তার মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয়, ফলে সে জানে না সে কত রাক‘আত আদায় করেছে। (বুখারী ও মুসলিম)

সালাতের কাতারে ফাঁকা থাকলে শয়তান তাতে ঢুকে পড়ে। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা ফাঁকা বন্ধ করো। কেননা শয়তান ফাঁকার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে।(আহমাদ)

৩.মানুষের বিরুদ্ধে শয়তানের শত্রæতা ও দুশমনীর কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নেই। বরং সে মানুষের পানাহার, সন্তান, সম্পদ এমনকি দাম্পত্য জীবনেও প্রবেশ করে। সকল ক্ষেত্রে সে বিচরণ করে, তাতে তার ভাগ বসাতে চায়। এদিকে ইঙ্গিত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কেউ যখন নিজ ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম নেয়, খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহর নাম নেয়, শয়তান তখন তার শিষ্যদের বলে আজ রাতে তোমরা না এ ঘরে থাকতে পারবে, আর না রাতের খাবার পাবে।

যদি ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম না নেয়, তখন বলে তোমাদের রাতে থাকার জায়গা হলো। খাবারের সময় যদি আল্লাহর নাম না নেয়, তখন বলে, রাতে থাকার জায়গা হলো আবার খাবারও পেলে।’ (মুসলিম) সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে শয়তান-বাহিনী মানুষের ক্ষতি সাধনের জন্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সন্ধ্যা হলেই শিশুদেরকে ঘরে নিয়ে এসো, কেননা এ সময় শয়তান বাহিরে বিচরণ করে।’ (বুখারী) ঘুমানোর মাধ্যমে মানুষের ক্লান্তি দূর হয়, শরীর ও মন চাঙ্গা হয়। কাজ করার নতুন উদ্যম পায়। শয়তান তার এ ঘুমকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঘুমানোর সময় শয়তান ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘাড়ে তিনটি গিঁট দিয়ে বলে, ‘রাত অনেক দীর্ঘ, তুমি ঘুমাতে থাকো।’ আল্লাহর নাম নিয়ে ঘুম থেকে জেগে ওযূ করে সালাত আদায় করলে এ গিঁটগুলো আল্লাহ খুলে দেন।’ (বুখারী ও মুসলিম) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এমন এক ব্যক্তির কথা বলা হলো, যে সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাত কাটায়। তিনি বললেন, সে তো এমন এক লোক যার কানে শয়তান প্রস্্রাব করে। (মুসলিম)

পারস্পরিক ভালবাসা ও সম্প্রীতি সমাজ ও সমাজের ব্যক্তিদের ঐক্য ও সংহতির জন্য অতি
প্রয়োজনীয় উপকরণ। শয়তানের কাজ হলো পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উস্কিয়ে দেয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘শয়তান এ বিষয়ে পুরোপুরি নিরাশ হয়েছে যে, আরব উপদ্বীপে কেউ তার ইবাদত করবে না। তবে সে এখানের লোকদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উস্কিয়ে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে।’ (মুসলিম) শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করার জন্য মানুষের রক্তের ধমনীতেও প্রবেশ করে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একটি জিন সঙ্গী থাকে।’ (মুসলিম) শয়তান নানামুখী চক্রান্তের মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। যেমন, আল্লাহর অবাধ্যতাকে মানুষের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে, ফলে মানুষ এটিকে ভাল কাজ মনে করে।

৪. বদর দিবসে মুশরিকদের সামনে তাদের কুকর্মকে সুকর্ম হিসাবে উপস্থাপন করেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘যখন শয়তান তাদের কাজগুলোকে তাদের সামনে খুব চাকচিক্যময় করে পেশ করেছিলো এবং তাদের বলেছিলো, আজ মানুষের মধ্যে কেউই তোমাদের ওপর বিজয়ী হতে পারবে না। আমি তো তোমাদের পাশেই আছি।’ (আল-আনফাল: ৪৮)
তার একটি অপকৌশল হলো আল্লাহর নাফরমানী ও অবাধ্যতাকে চমৎকার বিশেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। যেমনটি করেছিলো আদম (আ.)-এর সাথে।

‘হে আদম! আমি তোমাকে অনন্ত জীবনদায়িনী একটি গাছের কথা বলবো (যার ফল খেলে তুমি এখানে চিরজীবন থাকতে পারবে) এবং তোমাকে কি বলবো এমন রাজত্বের কথা, যার কখনো পতন হবে না।’ (ত্বা-হা: ১২০) তার আরেকটি অপকৌশল হলো মানুষের মনে এমন বিষয় প্রবেশ করিয়ে দেয়া যেটি সে পছন্দ করে।

আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালামকে) উদ্দেশ্য করে সে বললো, ‘তোমাদের রব যে তোমাদেরকে এ গাছটির কাছে যাওয়া থেকে বারণ করেছেন, তার উদ্দেশ্য হলো সেখানে গেলে তোমরা উভয়েই ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা এর ফল খেয়ে তোমরা জান্নাতে চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।’ (আল-আ‘রাফ: ২০) শুধু তাই নয়, বরং সে তাদের কল্যাণকামী হিসাবে শপথ করে বললো, ‘আমি তো তোমাদের উভয়ের জন্য হিতাকাক্সক্ষী।’ (আল-আ‘রাফ: ২১)
শয়তান মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আল্লাহর বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য, তোমাদেরকে যেন পার্থিব জীবন ও প্রতারণাকারী (শয়তান) বিভ্রান্ত না করে।’ (ফাতির: ৫) তার আরেকটি চক্রান্ত হলো সে আল্লাহর পথে খরচে বাধা দেয়, অভাব-অনটনের ভয় দেখায়।

আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার প্রতি প্রলুব্ধ করে।’ (আল-বাকারাহ: ২৬৮) শয়তানের আরেকটি অপকর্ম হলো সে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ও হতাশা সৃষ্টি করে। এর ফলে সে ভাবে আমি যদি এমনটি করতাম, তাহলে এমনটি হতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘যদি’ বলা পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন, ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কর্মক্ষেত্রকে উন্মুক্ত করে দেয়। (মুসলিম)

শয়তান মানুষের যৌন কামনাকে উস্কিয়ে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘একজন নারী ও পুরুষ যখন একান্তে থাকে, তখন তারা আর দু’জন থাকে না; শয়তান তাদের মাঝে তৃতীয়জন হয়ে যায়।’ (তিরমিযী)
সে মানুষের লজ্জা-শরমের আবরণকে সরিয়ে দিতে সদা সচেষ্ট থাকে। তার এ চেষ্টা মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তাদের উভয়কে কুমন্ত্রণা দিল যেন সে তাদের
৫. নিজেদের লজ্জাস্থান যা তাদের পরস্পরের কাছ থেকে গোপন করে রাখা হয়েছিলো প্রকাশ করে দিতে পারে।’ (আল-আ‘রাফ: ২০) তার সকল ধরনের পদক্ষেপ মানুষকে বিভ্রান্ত করার বড় ধরনের ফাঁদ। তাই তার পদক্ষেপের অনুসরণ করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা শয়তানের পদক্ষেপসমূহের অনুসরণ করো না, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের সুস্পষ্ট দুশমন।’ (বাকারাহ: ১৬৮)

শয়তানের সকল কূট-কৌশল, ষড়যন্ত্র আর অপচেষ্টার মূল লক্ষ্য মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে বাধা দিয়ে বিপথগামী করা। সে আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলো, ‘হে আমার রব! তুমি যেভাবে আমাকে পথভ্রষ্ট করে দিলে (আমিও তোমার শপথ করে বলছি) আমি মানুষদের জন্য পৃথিবীতে (তাদের গুনাহের কাজসমূহ) শোভন করে তুলবো এবং তাদের সবাইকে আমি পথভ্রষ্ট করে ছাড়বো।’ (আল-হিজর: ৩৯)

সে আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে রাখে, তাদেরকে আল্লাহর যিক্র ভুলিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান এদের ওপর পুরোপুরি প্রভাব বিস্তার করে নিয়েছে, তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। এরা হচ্ছে শয়তানের দল। জেনে রাখো, শয়তানের দলের ধ্বংস অনিবার্য।’ (মুজাদালাহ: ১৯) শয়তান মানুষকে মন্দ ও নিকৃষ্ট কাজের দিকে ডাকে।

আল্লাহ বলেন, ‘শয়তানের কাজ হচ্ছে, সে তোমাদের পাপ ও অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়। সে চায় যেন আল্লাহর ব্যাপারে তোমরা এমনসব কথা বলো যা সম্পর্কে তোমরা কিছুই জানো না।’ (বাকারাহ: ১৬৯) শয়তানের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো মানুষের মাঝে বিরোধ-বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। স্রস্টা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান মদ ও জুয়ার মধ্যে ফেলে তোমাদের মাঝে শত্রু তা ও বিদ্বেষ
সৃষ্টি করে দিতে চায় এবং এভাবে সে তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তোমরা কি এ কাজ থেকে ফিরে আসবে না?’ (আল-মায়িদাহ: ৯১)

তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বান্দাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে জাহান্নামে প্রবেশ
করানো। এর প্রমাণে কুরআনে বলা হয়েছে. ‘সে তো তার দল-বলকে জ্বলন্ত অগ্নির সাথী হওয়ার ডাকে।’ (ফাতির: ৬) শয়তানের অনুসরণের পরিণাম হলো ব্যর্থতা ও বঞ্চনা। আল্লাহ আদম (আ.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে (ইবলীস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু ।

এমন যেন না হয় যে, সে তোমাদের জান্নাত থেকে বের করে দিবে, ফলে তুমি দারুণভাবে দুঃখ-কষ্টে পড়ে যাবে।’ (ত্বা-হা: ১১৭) যে শয়তানকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করবে, বন্ধু বানাবে, সে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিয়ামতের দিন শয়তানের সাথে তার হাশর হবে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে তার পৃষ্ঠপোষক বানাবে সে সুস্পষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হবে।’ (নিসা: ১১৯)

৬. ‘তোমার প্রভুর শপথ! আমি এদের অবশ্যই একত্রিত করবো, একত্রিত করবো শয়তানদেরও। অতঃপর এদের সবাইকে হাঁটু গাড়া অবস্থায় জাহান্নামের চারপাশে এনে জড়ো করবো।’ (মারইয়াম:৬৮) কিয়ামতের দিন শয়তান তার অনুসারীদের সাথে সকল ধরনের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়ে বলবে, ‘আল্লাহ তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছেন, তা ছিল সত্য ওয়াদা। আমিও তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছিলাম, আমি তা লঙ্ঘন করলাম।’ (ইবরাহীম: ২২) শয়তান ও তার অনুসারীদের চূড়ান্ত পরিণতি হলো জাহান্নাম। আল্লাহ শয়তানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বের হয়ে যাও এখান থেকে অপমানিত ও বিতাড়িত অবস্থায়।

যারাই তোমার অনুসরণ করবে তাদের এবং তোমাদের সবাইকে দিয়ে আমি জাহান্নাম পূর্ণ করে দেবো।’ (আল-আ‘রাফ:১৮) শয়তানের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ ও প্রতারণা থেকে কেউ বাঁচতে পারে না। পারে শুধু সত্যিকার মুমিন, যে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর উপর নির্ভর করে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনে এবং নিজেদের রবের ওপর নির্ভর করে, তাদের ওপর শয়তানের কোনো আধিপত্য নেই।’ (আন-নাহ্ল:১০০) যে আল্লাহর সাখে বন্ধুত্ব করবে, তাকে অবশ্যই শয়তানের সাথে দুশমনী করতে হবে। আর যে আল্লাহ থেকে বিমুখ হবে, শয়তান তার বন্ধু হবে।

আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। তাঁর সকল আদেশের অনুসরণ করা। তাঁর অবাধ্যতা পরিহার করা। সকল সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহর আদেশ মানার মধ্যে। আর অপমান ও লাঞ্ছনা শয়তানের ফাঁদে পড়লে। যে এমনটি করবে তার রব তার ওপর অসন্তুষ্ট হবেন। তার ওপর কঠিন শাস্তি চাপিয়ে দিবেন যা সে ঠেকাতে পারবে না।

হে মুসলিমগণ! তাক্ওয়া তথা আল্লাহর ভয় ছাড়া শয়তান থেকে বাঁচার উপায় নেই। শয়তানের কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ লোকজন হচ্ছে তারা, যারা তাওহীদপন্থী। আর এটি স্বয়ং ইবলীসের স্বীকৃতি। সে আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, ‘তোমার মর্যাদা ও ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সবাইকে বিপথগামী করে ছাড়বো, তবে তাদের মধ্যে যারা তোমার একনিষ্ঠ বান্দা তাদের ছাড়া।’ (সোয়াদ: ৮২-৮৩)

তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনায় রয়েছে নিরাপত্তা। আল্লাহর তাঁর রহমত ও
কল্যাণ নিশ্চিত করবে। আর শয়তান থেকে সুরক্ষা দিবে। যে ঘরে সূরা বাকারাহ পড়া হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালায়। রাতে ঘুমানো জন্য বিছানায় গিয়ে যে আয়াতুল করসী তিলাওয়াত করে, তার জন্য থাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন প্রহরী, আর সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারে না।

৭. যে দিনে একশত বার বলবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু; ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর’ সে ওই দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান থেকে সুরক্ষা পাবে। একজন লোক ঘরে প্রবেশ করার সময় ও খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহর যিক্র করলে তথা

‘বিসমিল্লাহ’ বললে শয়তান তার অনুসারীদেরকে বলে, ‘এ ঘরে আজ না তোমাদের থাকার জায়গা আছে, আর না আছে খাবার।’ আল্লাহর বিধান মানা, আল্লাহর নির্ধারিত সীমানায় শক্তভাবে অবস্থান করা শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচার সর্বোত্তম উপায়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহকে যারা ভয় করে, তাদের যদি কখনো শয়তানের পক্ষ থেকে কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তবে তারা (সাথে সাথেই) আত্মসচেতন হয়ে পড়ে, তৎক্ষণাত তাদের চোখ খুলে যায়।’ (আ‘রাফ: ২০০)

জামা‘আত তথা সংঘবদ্ধতার সাথে রয়েছে আল্লাহর হাত। সংঘবদ্ধতা থেকে শয়তান দূরে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে জান্নাতের অতি উত্তম স্থান অর্জন করতে চায় সে যেন জামা‘আত তথা মুসলিম সংঘবদ্ধতাকে আঁকড়ে ধরে, কেননা শয়তান একজনের সাথে থাকে, আর দু’জন থেকে দূরে থাকে।’ (আহমাদ) উত্তম কথা শয়তানের প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণা ঠেকায়। আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসূল! আমার বান্দাদের বলে দাও যেন তারা এমনসব কথা বলে যা উত্তম, কেননা শয়তান (খারাপ কথা দ্বারা) তাদের মাঝে
বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়, আর শয়তান তো হচ্ছে মানুষের প্রকাশ্য দুশমন।’ (বনী ইসরাঈল: ৫৩)

অনুবাদ: অধ্যাপক আ.ন.ম. রশীদ আহমাদ
খুতবার তারিখ: ২৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী; ১৩ এপ্রিল ২০১৮ ঈসায়ী

ঢাকা, ২৩ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।