মসজিদুল হারাম: "কাউকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান করা অত্যন্ত নিন্দনীয়"


Published: 2018-01-31 16:41:54 BdST, Updated: 2018-10-18 03:23:06 BdST

প্রফেসর আ.ন.ম. রশীদ আহমাদ: সকল প্রশংসা আল্লাহর। যিনি অতি সূক্ষ্ণ বিষয় সম্পর্কেও অবগত। যিনি অসীম অনুগ্রহশীল। কল্যাণদাতা। তাঁর অনুরূপ কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রোতা। সর্বদ্রষ্টা।

আমি তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাই, তাঁর কাছেই ক্ষমা চাই।
হে মুসলিম সমাজ! আল্লাহকে ভয় করুন। জেনে নিন যে, আল্লাহর কথাই সর্বশ্রেষ্ঠ কথা। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ-নির্দেশনাই সর্বোত্তম পথ-নির্দেশনা।
নিকৃষ্ট বিষয় হলো দীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়। এ ধরনের নতুন উদ্ভাবিত সকল বিষয়ই বিদ‘আত। আর সকল বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।

বুদ্ধিমান তো সে-ই, যে আত্মসংযমী এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য কাজ করে। আর ব্যর্থ তো সে, যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে আল্লাহর কাছ থেকে অনেক কিছু পাওয়ার আশা করে। যতটা সম্ভব আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর কথা শুনুন এবং তা মেনে চলুন।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! চরিত্র মানুষের জীবনের একটি চালিকাশক্তি এর থেকেই উৎসারিত হয় সকল কথা, আচরণ ও কর্ম। এর ভিত্তিতেই একজন মানুষ সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে পারে। চারপাশের লোকজনের স্বভাব-প্রকৃতি, আচরণের ভিন্নতা সত্বেও তাদের সাথে মানিয়ে চলতে পারে।

নীতি-নৈতিকতাহীন মানুষের আচরণ ভারসাম্যপূর্ণ হয় না। এদের সাথে মানুষের আস্থার সম্পর্ক থাকে না। নীতি-নৈতিকতা বিহীন লোক মানুষের প্রাপ্য অধিকার দিতে পারে না। ফলে তার সাথে অন্যদের ভালবাসা ও সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। সে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে না। এর ফলে তার জীবন হয়ে যায় ছন্নছাড়া। মানুষের প্রতি থাকে না তার সুধারণা। অনুরূপ তার প্রতিও থাকে না কারো ভাল ধারণা।

সে অন্যকে নানাভাবে অভিযুক্ত করে, অন্যরাও তাকে অভিযুক্ত করে। একে অপরকে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করে। পরস্পর পরস্পরের ছোট-খাট বিষয়কে অনেক বড় করে দেখে। তিলকে তাল বানায়। সমাজে এ ধরনের পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হলে এর সাথে সংশ্লিষ্টদের চরিত্র ও নৈতিকতার খোঁজ নিন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে অন্যের চরিত্রে আঘাত হানে, অভিশাপ দেয়, অশ্লীল ও নোংরা কথা বলে, সে মুমিন নয়।’ (সুনান তিরমিযী)

সুস্থ বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা একজন মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থেকে ভারসাম্যের সাথে কাজ করতে সাহায্য করে। সে ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে। সে বুঝতে পারে কোন কাজটি আগে করতে হবে, আর কোনটি পরে। সে অনুধাবন করতে পারে কোন কাজ ও বিষয়কে কম গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তাই সে অতি প্রয়োজনীয় কাজ ও বিষয়কে কম গুরুত্ব দেয় না। আবার অগুরুত্বপূর্ণ কাজ ও বিষয়কে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় না। যে কাজ ও বিষয়ের যতটুকু গুরুত্ব, ততটুকু গুরত্বই দেয়। যার যা অধিকার তাকে সে অধিকার দেয়।

যে এমনটি করে না, সে হয়তো নির্বোধ অর্থাৎ তার এসব বিষয় বোঝার ক্ষমতা নেই। অথবা সে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয় না। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দুটি বিষয়ই দূষণীয়। তবে শেষোক্ত বিষয়টি অর্থাৎ ইচ্ছা করে কোনো বিষয়কে তার দাবি অনুযায়ী গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলা ও তাচ্ছিল্য দেখানো অতি নিন্দনীয়। অজ্ঞতাবশত কোনো বিষয়ে অবহেলা ও তাচ্ছিল্য অন্যায়, আর জেনে-বুঝে তা করা মহাঅন্যায়।

জেনে বুঝে কোনো বিষয়, কাজ বা ব্যক্তিকে অবহেলা করা বা তার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন দুটি দিক থেকে নিন্দনীয়। প্রথমত, যে এ কাজটি করে সে জানে যে, সে এ ধরনের একটি মন্দ কাজ করছে। আর দ্বিতীয়টি হলো, সে এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কাজ বা ব্যক্তির প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শন করছে। আর এভাবে সে অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করছে। এটি খুবই একটি মন্দ ও নিন্দনীয় স্বভাব। কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করা মানে তাকে অপমানিত করা। আর এটি ভাতৃত্ব, ন্যায়নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার পরিপন্থী।

কাউকে হেয় করা বা তুচ্ছজ্ঞান করার অর্থ হলো তাকে অপমানিত করা, বিদ্রুপ ও উপহাস করা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। ফলে সে তার ওপর যুলম অবিচার করতে পারে না। তাকে অপমান করতে পারে না। হেয় করতে পারে না। তাকওয়া এখানে এ কথা বলে তিনি বুকের দিকে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করেছেন। একজন ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় করবে। একজন মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের রক্ত তথা জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম মর্যাদার বিষয়।’ (সহীহ মুসলিম)

মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, সে কোনো মানুষকে হেয় ও তার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করতে পারে না। যে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করে সে মূলত তার প্রতি ইনসাফ-বিরোধী আচরণ করে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! কাউকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করার অর্থ হলো এ ধারণা পোষণ করা যে, তার মধ্যে ত্রুটি ও ঘাটতি রয়েছে। যে এ কাজটি করে সে মনে করে যে, তার মধ্যে এ ঘাটতি ও ত্রুটি নেই। এটি একটি মন্দ ধারণা। এর মাধ্যমে সে মূলত: নিজকে অন্যের চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন বলে একটি কৃত্রিম ধারণা পোষণ করে। আর এটি করে এমন লোকেরাই যাদের বুদ্ধি-বিবেক ও যুক্তি খুবই নিম্নমানের।

যারা এ ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত, মানুষ তাদেরকে সম্মান করে না। তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা পছন্দ করে না। আসলে যারা অন্যকে তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করে তারা নিজেরাই এ অবস্থার শিকার হয়। অন্যদের ব্যাপারে নিজ মুখে যে কথা বলে, নিজ কানে নিজের ব্যাপারে অন্যদের মুখে সে কথাই শোনে।

কলম, জিহ্বা আর ইনসাফের আমানত ও বিশ্বস্ততা যখন অনুপস্থিত হয়ে যায়, তখন মানুষের প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য বেড়ে যায়। অবশেষে এর সাথে সংযুক্ত হয় দম্ভ ও অহঙ্কার। অহঙ্কার হলো প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার করা এবং অন্য মানুষের মর্যাদাকে অগ্রাহ্য করা।

এর মাধ্যমে মানুষ মূলত: নিজের সাথে নিজে প্রতারণা করে। অহঙ্কারের পরিণাম খুবই ভয়াবহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দম্ভ ও অহঙ্কারকারী তাদের অন্তর্ভুক্ত, কিয়ামাত দিবসে আল্লাহ যাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না, যাদের সাথে কথা বলবেন না এবং যাদের দিকে দৃষ্টি দিবেন না। সর্বোপরি তাদের জন্য রয়েছে পীড়দায়ক শাস্তি।’ (সহীহ মুসলিম)

আবদুল্লাহ বিন আল-মুবারক (রাহি.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আলেমগণকে হেয় প্রতিপন্ন করবে, তার আখিরাত ধ্বংস হবে, যে শাসকদের হেয় প্রতিপন্ন করবে, তার দুনিয়া ধ্বংস হবে, যে তার সমাজের লোকদের হেয় প্রতিপন্ন করবে, তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা ধ্বংস হয়ে যাবে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! হেয় ও তুচ্ছ প্রতিপন্ন করা একটি মন্দ কাজ। এই কাজটি একজন ব্যক্তিকে নিন্দনীয় বানায়, তার ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করে দেয়। তার দুনিয়া ও আখিরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একজন সত্যিকার মুসলিম কাউকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান করতে পারে না। কারো বংশ, পদমর্যাদা, চাকুরি, অভাব, স্বল্পশিক্ষা নিয়ে তাচ্ছিল্য করে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বহীন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয় না। যে কথা বা কাজে কোনো কল্যাণ নেই এমন কথা ও কাজ নিয়ে মাথা ঘামায় না।

সত্যিকার মুসলিম তার বিরোধী এমনকি শত্রæকেও হেয় ও তুচ্ছ প্রতিপন্ন করে না। কাউকে হেয় করা মানসিক ঘাটতি ও দীনতা। এটি একটি ব্যাধি ও অপরিণামদর্শী আচরণ।

জেনে রাখুন, উন্নত চরিত্র ও নৈতিকতা একটি আমানত। এ আমানত রক্ষায় যত্নশীল হোন। নৈতিকতার আমানত রক্ষায় অবহেলা করে নিজের ওপর যুলম অবিচার করবেন না।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার ওপর আমানত পেশ করেছিলাম, তারা এটি বহন করতে অস্বীকার করলো এবং এতে ভীত হলো। কিন্তু মানুষ তা বহন করলো। নিশ্চয়ই সে যালেম-অজ্ঞ।’ (আহযাব: ৭২)

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন সে ছাড়া অনেক লোকই অন্যকে হেয় ও তুচ্ছ করার ব্যাধিতে আক্রান্ত।

অপরাধ ও পাপকেও অবহেলা করা যাবে না। অনেকে অপরাধ ও তার ভয়াবহতাকে বড় করে দেখে না। তাকে ও তার পরিণতিকে গুরুত্ব দেয় না। আর এ ব্যাপারে তাকে ইন্ধন দেয়।

আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপারে অতি মাত্রায় প্রত্যাশা, আর তাঁর ভয়াবহ শাস্তির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকা। এ ভাবনা তাকে পাপাচারে লিপ্ত করে। বেপরোয়াভাব নিয়ে মারাত্মক ও ভয়াবহ পাপে জড়িয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে তার মনে কোনো ভয় কাজ করে না।

সচেতন ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছোট-খাট অপরাধ ও পাপকেও তুচ্ছ মনে করে না। কেননা সে এ বাস্তব সত্য উপলব্ধি করে যে, পাথরকুচির সমষ্টিই পাহাড়। বিন্দু বিন্দু ফোটার সমষ্টিতে সৃষ্টি হয় পানির স্রোত।

মনে রাখতে হবে, যে শুধু আশাবাদী হয় তার মধ্যে ভুল-ত্রুটির প্রবণতা বেশি দেখা যায়, আর যে শুধু ভয় ও আশঙ্কায় থাকে সে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ একদিকে কঠিন শস্তিদাতা অপরদিকে তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়। তাই ভয় ও আশা দুটিই থাকতে হবে। এ দুটি পাখির দু’ডানার মতো, যা তাকে মাটিতে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা ছোট ছোট অপরাধের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। ছোট অপরাধের হিসাব নেয়া হলে এগুলোই একজন ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

সত্যিকার মুমিন, অপরাধ ও পাপের ভয়াবহতাকে সবসময় মানসপটে জাগ্রত রাখে। কেননা এ পাপ তার ঈমানের ঘাটতি ও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘মুমিন অপরাধ ও পাপকে এভাবে বিবেচনা করে যে, সে পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর পাহাড়টি যে কোনো সময় তার ওপর ধসে পড়বে। আর পাপী লোক পাপকে এভাবে বিবেচনা করে যে, তার তার নাকে একটি মাছি বসে আছে, তাকে হাত দিয়ে তাড়িয়ে দিলেই হয়।’ (সহীহুল বুখারী)

আনাস (রা.) তাঁর লোকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘তোমরা এমন সব কাজ করে যাচ্ছ, তোমাদের চোখে তা চুলের চেয়েও সূক্ষ্ণ ও হালকা, অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় আমরা এগুলোকে ধ্বংসাত্মক অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করতাম।’ (সহীহুল বুখারী)

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির মাধ্যমে তাঁর ক্রোধ থেকে এবং তাঁর ক্ষমার মাধ্যমে তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।

 

শাইখ ড. সউদ বিন ইবরাহীম আল-শুরাইম
[জুম‘আর খুতবা, মসজিদুল হারাম, মক্কা মুকাররামা]

অনুবাদক: প্রফেসর আ.ন.ম. রশীদ আহমাদ

ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।