রাবির মধ্যমণি শিক্ষকরাও নগদনারায়ণে...


Published: 2019-02-06 21:18:37 BdST, Updated: 2019-04-23 08:54:02 BdST
রাশেদ রাজনঃ ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা অন্দোলন ও ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনে অবদান রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি)। কোথায় নেই রাবির অবদান। বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিটি গণ আন্দোলনে শীর্ষে অবস্থান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা, গণতন্ত্র, ছাত্র সংগঠনের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, একতা এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকাও রেখেছে উত্তর বঙ্গের এই প্রতিষ্ঠান।
 
সংশ্লিস্টরা এ প্রসঙ্গে বলেন, জাতীয় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আন্দোলন ও কর্মসূচিতে শিক্ষকরাও ছাত্রদের কৌশলগত ও মানসিক সহায়তা দিয়ে সব সময় পাশে থাকতেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে উৎসাহ ও সহযোগীতা দিয়ে সর্বদা শিক্ষার্থীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতেও তারা কাজ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্দোলনের সম্মুখভাগে থেকে নজির স্থাপন করেছেন অতীতে।
 
দেশ-জাতি এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে নিজের স্বার্থ হিসেবে দেখতেন এমনই একজন শিক্ষক ছিলেন শহীদ ড. শামসুজ্জোহা। যিনি ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন। 
 
শহীদ হওয়ার আগের রাতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শহীদ মিনারে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় ড. জোহা বলেছিলেন, ‘শুধু ছাত্ররা নয়, আমরা সবাই মিলে এই দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো। মরতে যদি হয় আমরা সবাই মরবো।’ তার পরে দিনই তিনি তার কথার প্রমাণ রেখেছিলেন।
 
৮০’র দশকে জেনারেল এরশাদের নয় বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তোলে। ছাত্র-জনতার এ গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদ গদি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। আবার গণতন্ত্র ফিরে আসে বাংলাদেশে। চর্চা শুরু হয় ভাল ভাবেই।
ফাইল ছবি
 
 
৯০’র দশকের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মাঝে গণতন্ত্রের চর্চা ও আন্দোলন প্রবণতায় ভাটা পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীরা আবার জেগে উঠতে শুরু করে। দেশের রাজনৈতিক সংকটগুলোতে তারা প্রতিবাদমুখরতা নিয়ে এগিয়ে আসে। 
 
যার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৪ সালের নাইটকোর্স ও বর্ধিত ফি বিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে। এ আন্দোলনগুলোতে ছাত্রদের স্বতঃস্ফুর্তা অংশগ্রহণে সৃষ্টি হয়েছিল গণজোয়ারের। 
 
তবে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বলেছেন, আন্দোলনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা ধারাবাহিকভাবে রেখেগেছেন বিতর্কিত ভূমিকা। এসময়গুলোতে জাতীয় বা শিক্ষার্থীদের স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ রক্ষাই ছিল তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পন্ডিত শিক্ষক হয়েও নগদনারায়ণে অন্ধ ভক্ত।
ফাইল ছবি
 
 
বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৪ সালের নাইটকোর্স ও বর্ধিত ফি বিরোধী আন্দোলনে প্রগতিশীল ছাত্রজোট, কেন্দ্রিয় সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ছাত্র সংগঠনগুলোর ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। এ আন্দোলনে প্রায় ৫,০০০ শিক্ষার্থীর এক শান্তিপূর্ণ জমায়েতে ২রা ফেব্রুয়ারি প্রশাসনের নির্দেশে ন্যাক্কারজনক হামলা চালায় পুলিশ ও ছাত্রলীগ। 
 
শিক্ষার্থীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ বুটের লাথি, রাস্তায় ফেলে পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করাসহ মাথা এবং চোখ লক্ষ্য করে গুলি করার ঘটনা ঘটে এসময়। আহতদের চিকিৎসার জন্য এম্বুলেন্সও আসতেও বাঁধা দেয় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হামলাকারীদের বদলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উল্টো মামলা ঠুকে দেয় আহত শিক্ষার্থীদের নামে।  
 
সর্বশেষ ২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া বহুল আলোচিত শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতুড়ি হামলার শিকার হয় ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম, আহত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী। এ হামলায় তরিকুলের হাত-পা ও কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে যায়। এক্ষেত্রেও   বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছিল নিরব।
ফাইল ছবি
 
 
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে রাবি শাখা বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায় ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, “আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে শিক্ষকদের শ্রেণীগত অবস্থান। জাতির বিবেক হিসেবে উনারা দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে যতখানি না শিক্ষক তার চেয়ে কোন দলের আরও বেশি অনুগামী। 
 
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র তারা তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বহন করার জন্য সে দলের পারপাস সার্ভ করছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে তাদের যে দায়িত্ব ছিল সেই ইতিবাচক ভূমিকা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছেন। শিক্ষকদের শুধু শিক্ষা লাভ করানো দায়িত্ব নয় এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা ও মৌলিক গুণাবলী বিকশিত করতে সাহায্য করা।  কিন্তু শিক্ষকরা যদি সেই জায়গা থেকে সরে আসেন তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করবে। আর যেটি দেশ এবং জাতির জন্য বিরাট সংকট।”
 
রাবি শাখা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি তাসবিরুল ইসলাম কিঞ্জল ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, “শিক্ষকদের  আন্দোলনে বিরোধীতা করা স্পষ্টতই এটি ফ্যাসিবাদী আচরণ। ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া দেশ এবং জাতির জন্য কলঙ্ক। তিনি বর্তমান প্রশাসনের কাছে পূর্বসূরীদের চালু করা বাণিজ্যিক নাইটকোর্স বন্ধ এবং তৎকালীন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানান” 
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আমজাদ হোসেন ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন,“ আমরা লক্ষ্য করেছি যারা স্বাধীনতার পরে বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি বা প্রো-ভিসি এ ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। 
 
তিনি আরও বলে, এজন্য সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং স্টক হোল্ডারদের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পায়নি। তারা বর্তমানে যে পদে আসছেন ভবিষ্যতে এর চাইতে আরো উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হতে চায় বলে সরকারকে তুষ্ট করার জন্য ব্যস্ত থাকেন। 
ফাইল ছবি
 
 
আমি মনে করি যে, সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ ধরনের মনোভাব উচ্চ শিক্ষার মিশন-ভিশন এর পুরোপুরি ব্যত্যয় ঘটায়। উচ্চশিক্ষা লাভের জায়গায় যদি বড় বড় পদে থাকার জন্য ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয় তাহলে জাতির জন্য, দেশের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য বা পরবর্তী জেনারেশন এর জন্য খুব দুঃখজনক একটা অধ্যায়। 
 
যারা প্রশাসনে আছেন তাদের এ ধরনের আচরণ পরিবর্তন করা দরকার। এই মনোভাবের পরিবর্তন না হলে মূলত যাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আমরা চলি সে সব সাধারণ মানুষের সাথে একটা প্রতারণার শামিল।” 
 
 
ঢাকা, ০৬ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।