দ্বিতীয় ফুটেজে অবরার হত্যায় ক্লিয়ার ধারণা, সেই রাতে যা ঘটে!


Published: 2019-10-09 12:25:05 BdST, Updated: 2019-10-15 02:55:13 BdST

লাইভ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার দ্বিতীয় একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। ওই ফুটেজে আবরার হত্যায় অনেকটা ক্লিয়ার ধারণা পাওয়া গেছে। হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় ৫ ঘাতক। চলুন জেনে নেয়া যাক কি ঘটেছিল শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, রাত নয়টা থেকে শুরু হয় আবরারকে মারধর। অভিযোগ ফেইসবুকে স্ট্যাটাস যেখানে বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে। গ্যাস, পানি ও বন্দর চুক্তি নিয়ে কথা বলা হয়েছে। তিন দফা পেটানো হয় আবরারকে। সূত্রমতে আবরারকে পেটাতে শুরু করেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন। পরে যোগ দেন আরও ৫জন। এরা হলেন অনিক সরকার, ইফতি মোশারফ সকাল, মেফতাতুল ইসলাম জিয়ন, মনিরুজ্জামান মনির ও মোজাহিদুল রহমান। মারধর ও নির্যাতন চলে রাত ১১ টা পর্যন্ত। এর বাইরে অমিত সাহা নামে আরেক ছাত্রলীগ নেতা আবরারকে এসে স্ট্যাম্প দিয়ে পেটায়। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার আবরারের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ফেসবুক ঘেঁটে বাছ-বিচার না করেই হকি স্টিক দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। সেখানে অবস্থান করা সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিনও আরেকটি হকি স্টিক নিয়ে আবরারকে পেটানোতে অংশ নেন। ওই সময় ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন আবরারের হাত ধরে রাখেন। আর আবরারের পায়ে পেটাতে থাকেন উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল। সদস্য মুনতাসির আল জেমি, মো. মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ইশতিয়াক মুন্নাও নির্দয়ভাবে পেটাতে শুরু করেন আবরারকে। কেউ হকি স্টিক দিয়ে, কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ বা কিল-ঘুষি দিয়ে ইচ্ছামতো আবরারকে পেটানোতে অংশ নেন। এভাবে ২২ জন অংশ নেন এই ভয়ংকর নির্যাতনে। আবরার একটু কাঁদতেও পারেননি। কারণ তখন তার মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। কান্না করলে আরো বেশি পেটানো হবে নিরবেই সইতে হয়েছে নির্মম নির্যাতন। তবে গোঙ্গানির শব্দেও কারও মন গলেনি। এরপর রাতের খাবার খাওয়ানো হয় আবরারকে। খাওয়ানো হয় ব্যাথানাশক ট্যাবলেট। দ্বিতীয় দফায় মারপিট শুরু করেন অনিক। তিনি ছিলেন সবচেয়ে মারমুখী। পেটাতে পেটাতে তিনি ক্রিকেট স্ট্যাম্পও ভেঙে ফেলেন। তবুও থামেননি অনিক, মদ্যপ অবস্থায় আরেকটি স্ট্যাম্প দিয়ে ইচ্ছামতো পেটান আবরারকে। একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন আবরার। তখন মধ্যরাত। বারবার বোমি করেন আবরার। ঘাবড়ে যান খুনিরা। আহত শরীরটাকে এবার টেনে বড়ভাই মুন্নার কক্ষে নিয়ে যান ঘাতকরা। সূত্র বলছে তৃতীয় দফায় মারপিট শুরু হয় মুন্নার কক্ষেই। বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদসহ সেখানে ৬জনের পিটুনিতে লুটিয়ে পড়ে আবরারের শরীর। এরপর নিথর দেহটিকে চাদরে মুড়িয়ে টেনে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন ঘাতকরা। মাঝ সিঁড়িতে যেতেই তারা বুঝতে পারেন আবরার মারা গেছেন। সেখানেই আবরারের লাশ রেখে পালিয়ে যায় ঘাতকরা। নিথর দেহটি পড়ে থাকে সিঁড়িতেই।

ফুটেজ অনুযায়ী পরের দৃশ্য আরো অবাক করা, নির্মম। ফুটেজে দেখা গেছে যারা অবরারকে হত্যা করেছে তারাই নির্বিঘ্নে হলের প্রভোস্ট ও ছাত্র কল্যান উপদেষ্টার সঙ্গে সময় কাটাতে থাকেন। শেরেবাংলা হল ততক্ষণে সরগরম হয়ে উঠে। শুরু হয় ছুটাছুটি। সবচেয়ে বেশি মারধর করা মাতাল অনিক দৌড়ে চলে যায় তার রুমের দিকে। এরপর ডেকে আনা হয় ডাক্তার। সাদা পাঞ্জাবি পড়া ওই ডাক্তার আবরারকে দেখেই মৃত ঘোষণা করেন। এরপর স্ট্র্যাচারে করে আবরারের লাশ বারান্দায় রাখা হয়। এরপরে হলের আসেন প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান ও ছাত্র কল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান। এসময় লাশ ঘিরে রেখে ঘটনার বিবরণ দিতে থাকেন খুনিরা। কাপড় সরিয়ে আবরারের মৃদেহ দেখেও অনেকটা নির্ভার ছিলেন প্রভোস্ট ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক। সঙ্গে ছিল খুনিরাও। যেন কিছুই হয়নি সেখানে। পরে আবরারকে শিবির আখ্যা দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলে। যদিও পরে জানা যায়, আবরারে পুরো পরিবার রাজনীতি নিরপেক্ষ হলেও আওয়ামী ঘরানার। এমনকি আবরারের বাবা দাবি করেছেন তারা সমবসময় নৌকাকেই ভোট দেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম হানিফের বাড়ির পাশেই তাদের বাসা। হানিফের সঙ্গে তাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ভিডিও ফুটেজে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৯ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক ও পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা। কিন্তু তাকে মামলার আসামি করা হয়নি। যদিও এজাহারের বাইরেও এ হত্যার ঘটনায় আরো তিনজনের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা।

তবে পুলিশের একটি সূত্র বলছে রুমের বাইরের সিসি টিভির ফুটেজ দেখে তথ্য নেয়ার চেষ্টা চলছে। প্রকৃতপক্ষে রুমে কি ঘটেছিল সেটা আসামিদের রিমান্ডে পরিষ্কার হবে।

ঢাকা, ০৯ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।