সরকারী ৭ কলেজের অধিভুক্তির বিষয়টি ঝুলছে!


Published: 2018-02-23 23:24:22 BdST, Updated: 2018-10-20 10:56:44 BdST

হাসান মাহমুদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্তি নিয়ে বছরের শুরুতেই ঘটে গেছে তুলকালাম। শুরু হয় নানান সমালোচনা ও আলোচনা। বিষয়টি শেষ অব্দি গড়িয়েছে ছাত্রীর সম্ভ্রমহানিতে। দেশ কিংবা বিদেশে এর বিপক্ষে নানান নিন্দার ঝড়ও উঠেছিল। কিন্তু সুরাহা হয়নি। বরং মার খেয়েছে সাত সরকারী কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। আরো যোগ হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। তারা অধিভুক্তির ব্যপারে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে গিয়ে জড়িয়েছে নানান ঝামেলায়। অধিভুক্তির বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে সমর্থনও এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অধিভুক্তির ব্যপারে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ এই নীতি অবলম্বন করে চলায় বিষয়টি নিয়ে নানান ঝক্কি-ঝামেলায় পড়েছেন নিজেরাই।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজধানীর সরকারী সাতটি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি করা হয়েছে। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই কলেজগুলো এ অধিভুক্তি করা হয়। এখন গলার কাটা হয়ে দাড়িছে বলে বিভিন্ন মহল অভিযোগ তুলেছেন। এই অধিভুক্তির কারণে সেশনজট বেড়ে যাওয়ায় খোদ কলেজের শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট নন। তারা জানিয়েছেন এর ফলে সমস্যা বেড়েছে। অন্যদিকে মেনে নেয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। এই দুই পক্ষের আন্দোলনকেই এখন সামাল দিতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।


ক্যাম্পাস ও অবকাঠামোর ওপর চাপ পরার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিসিকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের করে আনতে ছাত্রলীগের বল প্রয়োগ ও মারধর করার ঘটনা ক্যাম্পাসকে উত্তপ্ত করে তুলে। ভিসি অফিস ভাংচুর, শিক্ষক লাঞ্ছনা, প্রক্টর অফিস ঘেরাও ও ফটক ভাংচুরের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করেছেন।


বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় বাড়ানোর জন্য একটি বিশেষ মহল ঢাকার বড় বড় সরকারী সাত কলেজকে অধিভুক্ত করে। কিন্তু এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব একটা লাভ হয়নি। বরং অধিভুক্তির ব্যপারে আন্দোলন সংগ্রামের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ কমেছে। যদি শ্রুতি আছে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন সরকারী সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি করা হবে।

অধিভুক্তির আন্দোলন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গেল বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সরকারী ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজকে অধিভূক্তি করে নেয়। এসব কলেজে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে আসার পর তিন দফা আন্দোলনে নামতে হয় অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের। গত ২০ জুলাই ফল প্রকাশ ও পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে প্রথমে আন্দোলন শুরু করেন তারা।


এই আন্দোলনে শাহবাগে শিক্ষার্থীদের সমাবেশে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেলে দৃষ্টিশক্তি হারান তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমান। এ ঘটনায় এক হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলাও করে পুলিশ।
দ্বিতীয় দফায় গত অক্টোবরে কয়েকশ' শিক্ষার্থী চতুর্থ বর্ষের ফল প্রকাশের দাবিতে নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করে রাখে। তখন যথাসময়ে ফল প্রকাশে প্রশাসন তাদেরকে আশ্বাস দিলে আন্দোলন তুলে নেন শিক্ষার্থীরা। নভেম্বরের মধ্যে ওই শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশিত হয়। এর দুই মাস পর গত ১১ জানুয়ারি ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষের ফল প্রকাশ ও তৃতীয় বর্ষের ক্লাস শুরুর দাবিতে আবারও নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক তাদেরকে আগামী এক মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের আশ্বাস দেওয়ার পর ক্যাম্পাসে ফিরেন তারা।

 


ঢাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন:
অধিভুক্তির বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো আন্দোলনে নামেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা ভিসির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেন। পরে জানাজানি হয়ে যায় তারা সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে আন্দোলনে নামলেও আসলে তারা বাম ঘরানা সংগঠনের নেতা-কর্মী। ওই আন্দোলনকারীরা ছাত্রলীগের হাতে দু'দফা মার খেয়েছেন। চার দফা দাবি পূরণে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলো। এরপর 'নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থী'দের ব্যানারে তারা এই আন্দোলন নামেন।


আন্দোলনের সূত্রপাত:
সাত কলেজের ২০১৭-২০১৮ সেশনের ভর্তি প্রক্রিয়ার সার্বিক কাজ ঢাবি ক্যাম্পাসে করা হয়েছে। আবেদনের ফি জমা দিতে ব্যাংকে লম্বা লাইন লেগে যায়। একই অবস্থা ঘটে ডিন অফিসেও। অধিভুক্ত কলেজগুলোর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আনাগোনা ঢাবি শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এবার সাত কলেজের ৩২ হাজার আসনের বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় ৭০ হাজার ছাত্রছাত্রী আবেদন করেছিলেন।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. আআমস আরেফিস সিদ্দিক ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ ছাত্রছাত্রী ভর্তির জন্য আবেদন করেন। কই, তাদের কাউকেই তো ক্যাম্পাসে এসে ব্যাংকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিতে হয় না। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প আরও অনেক কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ রয়েছে। তাদের কাউকে তো ঢাবির অবকাঠামো ব্যবহার করতে হয় না।


এ ব্যাপারে ভিসি প্রফেসর ড. আখতারুজ্জামান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্ষুন্ন করে কখনোই কোনো কিছু করা হবে না। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে। অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের সব কার্যক্রম নিজ নিজ ক্যাম্পাস থেকেই পরিচালিত হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পরিচয়পত্র দেওয়া হবে না। তারা তাদের নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচয়পত্র নেবেন।


ভিসি বলেন, ক্যাম্পাসে অবকাঠামোগত সংকট প্রকট, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পাঠাগার প্রভৃতির কোনোটিই ব্যবহার করার সুযোগ নেই তাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শুধু এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রধারী শিক্ষার্থীদের জন্যই উন্মুক্ত।'

অধিভুক্তিদের সমস্যা :
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিক্ষার্থীরা এক বছর এগিয়ে রয়েছেন। তাদের ভাষ্য অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সাত কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। তারা সেশনজটে পড়তে চান না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট 'ক্রাশ প্রোগ্রামে'র আওতায় এখন সময়মতো পরীক্ষা হয়। ঠিক সময়ই ফল প্রকাশ হয়।


ইডেন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত করা হলেও তার ফলাফল হয়েছে বিপরীত। এক বছর আগে দ্বিতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা হলেও এখনও ফল প্রকাশিত হয়নি। আর তৃতীয় বর্ষের কোনো ক্যালেন্ডারও প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। যে কারণে পুরোদমে ক্লাসও হয়নি। অথচ একই শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলোতে চূড়ান্ত পরীক্ষার ফরম পূরণ শেষ হলেও এক বছরের সেশনজটে পড়েছি আমরা।


প্রস্তুতি ছাড়াই সাত কলেজ অধিভুক্ত: 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়ন প্রফেসর জানান, সাত কলেজের দুই লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। জনবল সংকট রয়েছে। সাত কলেজের কার্যক্রম দেখাশোনা করবে কোন শাখা, তাও এতদিন নির্ধারণ করা হয়নি। পরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে প্রশাসনের টনক নড়ে। এরপর বিষয়টি দেখভালের জন্য দুই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে লোকবল মাত্র চারজনে উন্নীত হয়েছে।


আরো জানা গেছে, অধিভুক্তির পর থেকেই কলেজগুলোকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া অধিভুক্তির কারণেই তা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে ঠিক সময়ে পরীক্ষা নেয়া, ফল তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক প্রমোশন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি সুবিধা, সময়ের অভাব এবং তথ্য-উপাত্ত না পেয়ে সাত কলেজ নিয়ে এখন চরম বিপাকে ঢাবি কর্তৃপক্ষ।


সে জন্য যথাসময়ে ফল ঘোষণা করা যাচ্ছে না। ফল না পাওয়ায় ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে একরকম স্থবিরতা বিরাজ করায় ভোগান্তিতে রয়েছেন কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরাও। ফলে সেশনজট মুক্ত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। পাশাপাশি ফল হাতে না পাওয়ায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক চাকরিতে আবেদন করতে না পারায় উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা রয়েছে শিক্ষার্থীরা।


প্রাপ্ত তথ্য মতে, এসব কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বর্তমানে এক লাখ ৬৭ হাজার ২৩৬ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এর আগে ঢাবির অধিভুক্ত কলেজ ছিল ১০৪টি। নতুন সাতটি যোগ হওয়ায় এ সংখ্যা এখন ১১১টি। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ১০৪টি কলেজ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৬৯৮ জন, শিক্ষক সাত হাজার ৫৯১ জন। ফলে নিজস্ব ৩১ হাজার ৯৫৫ জন শিার্থীর বাইরে আরো দুই লাখ আট হাজার শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।


ব্যয় হবে সাত কোটি টাকা :
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাত কলেজের অধিভুক্তি থেকে বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কোটি ২০ লাখ টাকা বাড়তি আয় হতে পারে। আর এই কলেজগুলোর জন্য নতুন সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষা আয়োজন, প্রশ্নপত্র তৈরি ও মডারেশন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা দেখাসহ একাডেমিক অন্যান্য কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় করতে হবে প্রায় সাত কোটি টাকা। অধিভুক্ত সাত কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গত এক বছরে একটি টাকাও আয় হয়নি।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনও অধিভুক্তি ফি না চাইলেও সাত কলেজের অধ্যক্ষরা ধারণা করছেন, ফি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কলেজের প্রতি বিভাগের ডিগ্রি অধিভুক্তি ফি ২০ হাজার টাকা আর অনার্সের ২৫ হাজার টাকা। সংশ্নিষ্ট বিভাগ থেকে এই টাকা নেওয়া হয়। বিভাগ প্রতি অনার্স চার বছরের অধিভুক্তি নবায়ন ফি ২৫ হাজার, ডিগ্রি ২০ হাজার, মাস্টার্স প্রথম পর্ব ৬ হাজার ২৫০ টাকা এবং মাস্টার্স দ্বিতীয় পর্বেও ৬ হাজার ২৫০ টাকা নেওয়া হয়। এ হিসাবে এই অধিভুক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুব একটা লাভজনক হয়নি।


ঢাবি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা:
রাজধানীর সাত কলেজ অধিভুক্তিতে দফায় দফায় পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলনের মধ্যে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সাত কলেজের কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হবে সে সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


ওই বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, স্বতন্ত্র লোকবল ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত/উপাদানকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হয় বিধায় এই সাতটি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও সামগ্রিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হবে না। পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় প্রায় পাঁচ মাস কোনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আর দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের টানাটানিতে ভোগান্তিতে পড়ে সাত কলেজের দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী।


বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অধিভুক্ত কলেজের ভর্তি তথ্য ও আগে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ফল যথাসময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে না পাওয়ায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে পরীক্ষার ফল ও ক্লাসের তারিখ ঘোষণার দাবিতে গত এক বছরে তিন দফা আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কলেজ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করায় সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল চেয়ে আন্দোলনে নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সাত কলেজের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে অধিভুক্ত/ উপাদানকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সম্পর্কিত বিষয়ে বিভ্রান্তি/অস্পষ্টতা দূর করতে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।


এতে আরো বলা হয়, অধিভুক্ত/উপাদানকল্প প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ কলেজ বা ইনস্টিটিউট পাঠদান ও পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে না। আগের মতো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে তারা পরিচয়পত্র সংগ্রহ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন/পরিবহন/ স্বাস্থ্যসেবা/পাঠাগার ব্যবহারের সুযোগ পাবে না তারা। তাদের ভর্তি, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম নিজ নিজ কলেজ ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষাসহায়ক কার্যক্রমও নিজ নিজ কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচালিত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই উন্মুক্ত।


এখনও যারা পাশ করে বের হয়ে যায় নি তারা সবাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইস্যু করা সনদ পাবে। অধিভুক্ত হওয়ায় এখন থেকে ওইসব কলেজের ভর্তি পরীক্ষা, শিক্ষা কার্যক্রম, একাডেমিক পরীক্ষা, ফলাফল প্রণয়ন এবং সিলেবাস প্রণয়ন সবকিছুই থাকবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা সনদও পাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষার্থী এবং অধিভুক্ত কলেজসমুহের শিক্ষার্থীদের সনদে পার্থক্য থাকবে।


বিশিষ্টজনদের বক্তব্য:
গত ২২ জানুয়ারী জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক অনির্ধারিত আলোচনায় প্রসঙ্গটি তোলেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। এর রেশ ধরে ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছাত্রদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাইকে যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ মুক্তিযুদ্ধে সবার আগে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই স্বাধীন দেশে ন্যায্য আন্দোলন করতে গিয়ে একজন ছাত্র তাঁর দুটি চোখই হারিয়েছেন। তাঁর কী অপরাধ ছিল?’


কাজী ফিরোজ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্বীকার করেছে, অপরিকল্পিতভাবে সাতটি কলেজকে অধিভুক্ত করায় অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। ছাত্ররা এখনো পরীক্ষার ফল পাননি। এটার জন্য কে দায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় দুটি, নাকি ছাত্ররা? যে সাতটি সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে, তার সব কটিই প্রথম শ্রেণির। এগুলো অধিভুক্ত করার প্রয়োজন ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক তাঁর হাত শক্তিশালী করার জন্য এগুলোকে অধিভুক্ত করেছিলেন।


শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান তার প্রতিক্রিয়ায় ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটলো,তা দুঃখজনক। অন্য কোনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিতে চাইলে, তাতে শিক্ষার্থীদের অভিমত নেয়া আবশ্যক বলে মনে করি। তা হয়নি সাতটি কলেজ অধিভুক্তকরণের ক্ষেত্রে।’


সাত কলেজের অধিভুক্তি অপরিকল্পিত বলে মন্তব্য করে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ৪০ হাজার শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। এতসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে এমনিতেই নানা চাপে থাকতে হয়। শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনও অধিভুক্তকরণ নিয়ে ভুল পরিকল্পনার কথা স্বীকার করছে। অথচ শিক্ষার্থীদের দাবি মানল না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি ন্যায্য দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে, কিন্তু প্রশাসন তা আমলেই নিল না। এ নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকা রাখল।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একেবারে নিম্নশ্রেণির আচরণ করল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল। আন্দোলনকারীদের পুলিশে দেয়া হলো। বিশেষ একটি ছাত্র সংগঠন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হলো। ’শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ আচরণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করার কথা নয়। সবার আগে শিক্ষার্থী এবং তাদের অধিকার বলে মত দেন তিনি।


কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাতটি কলেজকে আনা হলো, কেন? কী দরকার ছিল, তার ব্যাখ্যা কি? ‘সরকার শিক্ষা নিয়ে সঠিক জায়গায় দাঁড়াতে পারছে না। অস্থিরতা রয়েই যাচ্ছে। সরকারের ব্যবস্থায় আস্থা রাখতে পারছে না বলেই হয়তো সাতটি কলেজ আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসতে চাইছে। কিন্তু কীভাবে আসবে, কী মান হবে তার তো কিছুই তৈরি হয়নি। লাখো শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে তো এভাবে ছিনিমিনি খেলা যায় না।’

অধিভুক্ত শিক্ষার্থীদের বক্তব্য:
ইডেন মহিলা কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মারিয়া আক্তার মৌ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে থাকলে আমরা আরো আগে অনার্স শেষ করতে পারতাম। মাঝপথে আমাদেরকে অধিভুক্ত করা হয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চার মাস আগে রেজাল্ট পেলেও আমরা এখনো পাইনি। ফলে আমাদের নিয়ে পরিবারের চিন্তার অন্ত নেই।


ঢাকা কলেজের একই বর্ষের শিক্ষার্থী মাকছুদুর রহমান বলেন, ফল না পাওয়ায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছি না। মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা চাই আমাদের প্রতি সুবিচার করা হোক।


সরকারী তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী হোসাইন আহমাদ বলেন, পরীক্ষার ৯ মাস পরেও ফল প্রকাশ করা হয়নি। অন্য কলেজগুলোর শিার্থীরা চার মাস আগে রেজাল্ট পেয়ে মাস্টার্সে ভর্তি প্রক্রিয়ায় শুরু করলেও আমরা এখনো রেজাল্ট পাইনি। চাকরির বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও অংশ নিতে পারছি না।

 

ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।