বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও তোমাকে হারালাম!


Published: 2018-01-13 20:49:20 BdST, Updated: 2018-06-23 03:05:09 BdST

রুমেল আহমেদ : কলেজে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছিল। ব্যস্ততার মাঝেও কেমন যেন শূণ্যতা অনুভব হতো। কি যে নেই আমার জীবনে। এভাবেই কেটে গেল ৬ মাস। বাবা চাকরির সুবাদে বদলি হয়ে গেলেন ঢাকার বাইরে। আমি আর মা এই দুইজনের সংসার। হাত খরচ যেটা দেয়া হত তা দিয়ে কলেজে আসা যাওয়া আর খাবার খেয়ে চলে যেত। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম একটা টিউশনি করালে মন্দ হয় না। কিন্তু এতে মায়ের ঘোর আপত্তি।

অগত্যা মাকে না জানিয়ে একটা টিউশনি নিলাম। সুবিধাটা হল টিউশনিটা ছিল কলেজের পাশেই। তাই কলেজ থেকে বের হয়েই টিউশনি করিয়ে বাসায় ফিরতাম। দেরি হলে যানজটের বাহানা দিতাম মাকে। এভাবে টিউশনি করিয়ে ও নানা বাহানায় বাসা থেকে টাকা নিয়ে মোবাইল কিনলাম। তবে মা জানতেন না। পালিয়ে পালিয়ে মোবাইলে গেইম খেলতাম। মোবাইলে সিম কেনা হলেও কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না। আর সেসময় মোবাইলে কথা বলা মানে বিলাসিতা ছিল। তাই মিসকল দিয়েই বন্ধুদের স্মরণ করা হতো।

অবসরে বসে বসে মিসকল দিতাম কোন কোন সময় অন্যপ্রান্ত থেকেও মিসকল আসতো। অাবার কখনও কল। টিউশনির টাকা পেলে আমিও মাঝে মাঝে কল দিতাম। এরই মাঝে আসলো ডিজুস মোবাইলের যুগ। মানে রাত ১২টার পরে জমিয়ে কথা বলার সুযোগ। ওই সুযোগে প্রায়ই অপরিচিত নম্বরে কল দিতাম।

এভাবেই একদিন মিসকলের মাধ্যমে পরিচিত হলাম ফারিয়ার সঙ্গে। ওর পরিচয়টা একটু দিয়ে নেই। ফারিয়ার বাড়ি রাজশাহীতে। তার বাবা বড় ব্যবসায়ী। নিউমার্কেটে তার বাবার একটি দোকান আছে। ওই টাকায় চলে পাঁচ ভাই-বোনের সংসার। ফারিয়াও কলেজে পড়তো। ও প্রচণ্ড জেদি ও একরোখা একটি মেয়ে হওয়া সত্ত্বে তার সঙ্গে মন দেয়া নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তাকে আমি দেখিনি কিন্তু ও যখন কথা বলতো তখন আমি উন্মুখ হয়ে তার কথা শুনতাম। রাজশাহী নয় শুদ্ধ ভাষায় মিষ্টি করে কথা বলতো। মাঝে মাঝেই হাসতো। ওর হাসিটাও ছিল অসম্ভব সুন্দর। ওই হাসিটাই মনে হয় আমাকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে দিয়েছিল। সেসময় ইন্টারনেটের তেমন একটা ব্যবহার ছিল না। ফেইসবুক শব্দটা ছিল বড়ই অপরিচিত। তাই ফারিয়াকে দেখার সুযোগ পেলাম না।

তবুও রাত ১২ টা বাজলেই কখন তার সঙ্গে কথা বলবো এনিয়ে টেনশন করতাম। ফারিয়া আমাকে মিসকল দিলে তাকে কল করতাম। সেসময় রাত ১২ টার পরে ডিজুস নম্বরে কল করা কত বিড়ম্বনা ছিল তা নিশ্চই সেসময়কার মানুষ ঠিকই জানেন। যাই হোক ফারিয়ার সঙ্গে কথা হত ঘন্টার পর ঘন্টা। এভাবেই একসময় তার প্রতি প্রচণ্ড টান অনুভব করলাম। তাকে ভালোবাসার কথা কখনও বলা হয়নি। তবে কথার মাধ্যমেই ভালোবাসা প্রকাশ পেত। কি খেয়েছি, ঠিকমতো ঘুমিয়েছি কিনা, ওষুধটা খেয়েছি কিনা। এতো কথার মাঝেও ফারিয়া আমাকে বলতো পড়াশোনার যেন ক্ষতি না হয়। এই মেয়েটা বলে কী! এতো কথা বললে পড়াশোনার ক্ষতি হবে না আবার!

ফারিয়াকে আমিই মোবাইলে টাকা ভরে দিতাম। মাঝে মাঝে বিভিন্ন উপহার পাঠাতাম তার এক বন্ধুর ঠিকানায়। ওই বন্ধুই তাকে উপহার পৌঁছে দিয়ে আসতো। তবে অামি কখনও উপহার চাইতাম না। ফারিয়া এটা ওটার বায়না ধরতো। মায়ের কাছ থেকে মিথ্যা কথা বলে আবার কখনও টিউশনির টাকা থেকে ফারিয়ার বায়না পূরণ করতাম আমি। উপহার পেয়ে ফারিয়া মিষ্টি হাসি আর আদিখ্যেতা আমার মনে আনন্দের খেরাক যোগাত। আমরা একে অপরকে পড়াশোনার জন্য তাড়া দিতাম। এভাবেই কাটছিল সময়। প্রথম বর্ষ শেষে ঠিক করলাম আমরা দেখা করবো। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে পিকনিকের কথা বলে মায়ের কাছ থেকে ছুটি নিলাম।

ঢাকা থেকে ট্রেনে করে যাচ্ছি অপরিচিত শহর রাজশাহী। তবে আমার একমুহূর্তের জন্যও ভয় কাজ করেনি। আমার সঙ্গে এক বন্ধুও ছিল। বারবার মনে হতে লাগলো রাজশাহী শহরে এমন একজন আছে যে আমার জন্য সবকিছু। তার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। সকালে রাজশাহী পৌঁছলাম দুই বন্ধু। ফারিয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছিল একটি রেস্টুরেন্টে। আমরা আগেই সেখানে ছিলাম। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মিষ্টি সেই মেয়েটি আমার সামনে হাজির হল মেরুন কালারের ড্রেসে। সঙ্গে তার বান্ধবী। চিনতে ভুল হলো না। কল্পনার চেয়ে ফারিয়া বেশি সুন্দর ছিল। হাসি দিলে গালে টোল পড়ে। এতো সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটা। আমি আর তার সৌন্দর্যের ভার সইতে পারছিলাম না। বলে রাখা ভালো তার সৌন্দর্য্যের মাঝে আমি কিছুই না। তবুও পছন্দ হওয়ার মত ছেলে আমি। বন্ধুদের মধ্যমনি ছিলাম সবসময়। নিজের প্রশংসা কিভাবে করতে হয় জানিনা। নিজের প্রশংসা করাও ঠিক না। তাই অামার সম্পর্কে আর কিছুই বললাম না।

রেস্টুরেন্টে বেশিক্ষণ বসে থাকা সম্ভব হয়নি। ভয় কাজ করছিল। ফারিয়ার হাত কাঁপছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো। যেই কথা সেই কাজ। একসঙ্গে যাওয়া হল না। আমি আর আমার বন্ধু ও ফারিয়া ও তার বন্ধু আলাদা আলাদা রিকশায় করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। রাবির সবুজ চত্ত্বরে একান্তে কথা হল দুজনার।

৩ ঘন্টা সময় যেন এক মুহূর্তে চলে গেল। মনে হল যেন মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে ফারিয়ার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। বিদায়ের সময়টা এত কষ্টের ছিল কখন যে চোখের কোনে জল খেলা করেছে টের পাইনি। ভালো থেকো ফারিয়া।

ফারিয়া চলে গেছে। রাতের বাসে ঢাকায় ফিরতে হবে। এখানে সেখানে ঘুরেও যেন সময় কাটছে না। আমি ঘোরের মাঝে আছি। সবকিছু কেন জানি এলোমেলো লাগছে। ঢাকায় ফিরেছি সকালে। ফারিয়ার মিষ্টি হাসিটা আমার চোখে লেগে আছে।

আজ কলেজে যাওয়া হয়নি। সারাদিন কেটেছে ফারিয়া ঘোরে। পড়াশোনা কিছুই হয়নি। সন্ধ্যার পর বই নিয়ে বসলেও ঘোর কাটছে না। ওর মিষ্টি হাসিটা ভেসে উঠছে। রাত ১২ টার অপেক্ষা করছিলাম। ১২ টা বাজতেই ও মিসকল দিল। কথা হল সারারাত। কথা যেন শেষই হয় না। ডিজুসে কথা চিন্তা নেই। চলতে লাগলো। এভাবে এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর উপলব্ধি হল পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।

বহুকষ্টে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলাম। ফারিয়াকেও পড়াশোনায় মনোযোগি হতে বললাম। বহুকষ্টে আবেগ দমিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা আল্লাহর রহমতে ভালই হল। পরীক্ষা শেষে ফারিয়া ঢাকায় কোচিংয়ে ভর্তি হয় আমার পরামর্শে। দুজন একই কোচিংয়ে ভর্তি হলাম। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে হবে। তাই আমরা দুজনে পাল্লা দিয়ে পড়াশোনা করতাম। বলে রাখা ভালো ফারিয়া খালার বাসায় থাকতো তাই মোবাইলে বেশি কথা বলা যেত না। যা কথা হত কোচিংয়ে আসা যাওয়ার সময়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হল না আমার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হল। তাই সেখানেই ভর্তি হলাম। ফারিয়ার মন খারাপ। ফারিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে, তবে ভালো সাবজেক্ট পায়নি। আরও মন খারাপ আমিও ভালো সাবজেক্ট পাইনি। ঢাবিতে চান্স না হওয়ায় আমি অনেকটা হতাশার মাঝে ছিলাম। মনে হতে লাগলো তাহলে কী ফারিয়ার সঙ্গে ভালোবাসাই আমার জন্য কাল হল। লাইফের অনেক সময় নষ্ট করে ফেলেছি প্রেম নামের জাদুতে। আর সময় নষ্ট নয়। অনেক বড় হতে হবে আমাকে।

ধীরে ধীরে ফারিয়া আমাকে অবজ্ঞা করতে শুরু করলো। তার সঙ্গে কথা বলতে আমারও কেন জানি আগ্রহ কমতে লাগলো। ভালো সাবজেক্টে চান্স না পাওয়ার হতাশা গ্রাস করতে লাগলো। আমার পাশের বন্ধুরাও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো সাবজেক্ট পেয়েছে। এটা আমাকে বেশি পীড়া দিত। এর সঙ্গে আত্মীয় স্বজনের পীড়া আর অবজ্ঞাতো আছেই।

আলো আঁধারির মাঝে এভাবেই কাটছিল সময়। আস্তে আস্তে আবিষ্কার করতে লাগলাম ফারিয়াও দূরে চলে যাচ্ছে। যখন সম্বিত ফিরে পেলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাতছাড়া হয়ে গেছে ফারিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ৬ মাসের মাথায় আমি ফারিয়াকে হারিয়ে ফেলেছি। জানতে পারলাম রুয়েটের এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে মন দেয়া নেয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে ফারিয়া। নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারো কথায় কান না দিয়ে রাজশাহী চলে গেলাম। ক্যাম্পাসে গিয়ে ফারিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি পরখ করে এলাম।

না আমি তার মুখোমুখি দাঁড়াইনি। চুপচাপ চলে এলাম সিলেটে। আমি আর কোনদিন সম্পর্কের দাবি নিয়ে তোমার কাছে যাব না। তোমার সেই মিষ্টি হাসি এখন অন্য কারো জন্য। অামি যে বিষয়টা জানতে পেরেছি তা হয়তো ফারিয়া বুঝতে পেরেছিল। তাই একসময় তার নম্বরটাও চেইঞ্জ করে ফেললো। ওর নম্বরটা খোঁজার ইচ্ছা হলো না। ভুলে যেতে চাইলাম সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতিগুলো। একসময় ভুলে গেলাম আরেকটি নতুন স্বপ্ন শুরু হল। সেই গল্পটা না হয় আরেকদিন বলবো। জানিনা এখন ফারিয়া কোথায় আছে, কেমন আছে। ভালো থেকো ফারিয়া।

[বি:দ্র: সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। জীবনের স্বপ্ন শুরু হওয়ার আগে সম্পর্কে না জড়ানোই ভালো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো সাবজেক্ট পেয়েও আপনি মনের মত কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে পারবেন। সময়কে কাজে লাগান। কলেজ লাইফে সময় নষ্ট না করলে হয়তো আজ আমার জীবনটা অন্যরকম হতো]

রুমেল আহমেদ
সাবেক শিক্ষার্থী
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।