নর্থ সাউথের শিক্ষক সিজারকে নিয়ে রহস্য কাটেনি!


Published: 2017-11-14 22:08:33 BdST, Updated: 2017-11-23 11:14:39 BdST

 


লাইভ প্রতিবেদক: শিক্ষক সিজারকে নিয়ে রহস্য এখনও কাটেনি। রয়ে গেছে অন্তরালে। তিনি কি নিখোঁজ, নাকি অপহরণ অথবা কেউ শত্রুতা করে কিছু করেছে এবিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়।

কেউ কেউ বলছেন তাকে কি কোন সংস্থা ধরে নিয়ে গেছে, তদন্তের স্বার্থে কেউ কিছু বলছে না। নাকি অন্য কিছু। সব মিলিয়ে নিখোঁজের আজ ৭ম দিন। এখনও খোঁজ মেলেনি তার। সন্ধান চেয়ে ‘শিক্ষক, বন্ধু ও স্বজনরা’ মানববন্ধন করেছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার তাকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন। তবে বাবার নিখোঁজের কথা এখনও জানে না মোবাশ্বারের ছোট্ট মেয়েটি। বাবা খেলনা নিয়ে ফিরবে, এই আশায় রয়েছে সে।

এমন তথ্য জানা গেছে মোবাশ্বারের সাবেক স্ত্রীর ফেসবুক পোস্ট থেকে। সেই পোস্টটি নিজের ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস হিসেবে দিয়েছেন মোবাশ্বারের ছোট বোন তামান্না তাসমিন।

পাঠকদের জন্য ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো-

 

স্ট্যাটাসে তামান্না লিখেছেন,
আজ ৭ম দিন
গোটা একটা সপ্তাহ পার হয়ে গেলো! কোনো খবর নাই। আমার আর লিখতে ভালো লাগে না। মনে হয় কি হবে লিখে! টায়ার্ড লাগে সবকিছুই। সবকিছুই বৃথা মনে হয়। ভাইয়ার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে আমার সবসময়ই ভালো সম্পর্ক ছিল। ওদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরেও আমাদের প্রায়ই কথা হতো। আজকের লেখাটা ওঁর। ওর অনুরোধে সবার জন্যে দিলাম -
‘৭ই নভেম্বরের পর থেকে মোবাশ্বারের জন্যে অনেক লেখালেখি হচ্ছে, মানব-বন্ধন হচ্ছে। ওর বন্ধুরা ওকে ফেরত চায়, ওকে যারা গুম করেছে তাদের বিচার চায়। আমি শাস্তি বা বিচার চাই না।

আমি শুধু চাই আমার ছোট্ট মেয়েটার বাবা মেয়ের কাছে ফিরে আসুক। ও শুধু একবার ফিরে আসুক, আমি কথা দিচ্ছি ও আর জীবনেও কোনো কিছু লিখবে না, ওর ফেইসবুক প্রোফাইল থাকবে না ওর ব্লগ থাকবে না।

প্লিজ বিশ্বাস করেন। আমাদের একটা মেয়ে আছে। ডিভোর্সের পর আমাদের কখনো দেখা বা কথা হয় নাই। মেয়ের পিতামাতা হিসাবে আমরা সিক্রোনাইজড ছিলাম। মেয়েটাকে আমি বলেছি তার বাবা বাইরে গেছে ৭ তারিখে পড়াশুনা করতে।

ওর বাবা যেহেতু প্রায়ই বাইরে যায় তাই সে বেশি প্রশ্ন করেনি কিন্তু প্রচন্ড অভিমান করেছে। কারণ এমন কখনো হয়নি যে ওর বাবা ওকে না জানিয়ে কোথাও গেছে। ও খুব অবাক হয়ে বলেছে ‘কই, বাবা তো আমাকে বলে গেলো না’।

আমার মেয়ে জানে যে তার বাবা শুক্রবার তাকে খেলনা কিনতে নিয়ে যাবে কিন্তু বাবা তাকে না জানিয়ে বিদেশ যাবে এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না। ফুফুর সাথেও তার বেশ ভালো খাতির।

বাবার উপর অভিমান করে সে ফুফুর সাথেও কথা বলেনা এখন। মেয়েটা জানে তার বাবা বাইরে থেকে খেলনা নিয়ে আসবে অনেক। নভেম্বরেই তার জন্মদিন। প্রতি বছর তার বাবা তার জন্যে একটা বার্থে পার্টি করে আর আমি একটা করি।

এবারও সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আচ্ছা এবারও তো আমার ২ টা পার্টি হবে তাই না?’। বাবার সাথে খেলতে যাওয়া, মুভি দেখতে যাওয়ার খুব পাগল সে। আপনারা ইমোশন কতটুকু বুঝেন আমি জানি না, কিন্তু আমার মেয়ে বুঝে! এই মেয়েটাকে এভাবে মিথ্যা বলে আর কতদিন বুঝ দিয়ে রাখবো আমি?

আমার মেয়ের পছন্দের খেলনা গু খরঃঃষব চড়হু। দুনিয়ার আর কোনো খেলনা ওকে টানে না। মোবাশ্বার যখনই বাইরে গেছে, খুঁজে খুঁজে ব্যাগ ভর্তি করে এই খেলনা নিয়ে এসেছে। আমার গোটা রুম এই খেলনা দিয়ে ভর্তি। আপনাদেরও নিশ্চই বাচ্চা আছে, আপনাদের বাচ্চার কোন খেলনা পছন্দ?

আপনারা দূরে গেলে সেই বাচ্চার কি অবস্থা হয়? কার কি যায় আসে আমি জানি না কিন্তু মোবাশ্বারের বাবার গোটা দুনিয়া জুড়ে ছিল শুধু উনার ছেলে। উনাকে আমি যতটুকু চিনি, ছেলের অভাবে বেশিদিন সুস্থির থাকতে পারবেন না।

ওর মেয়ে আর বাবার দিকে তাকিয়ে হলেও ওকে ফেরত আনার ব্যবস্থা করেন প্লিজ। দরকার হলে ও সারাজীবন বাসায় বসে থাকবে ওর বাবার কাছে। দরকার হলে ও চাকরি করবে না। তবুও ওর বাবা আর মেয়ের কাছে ওকে ফেরত দিন একটাবার।

 

ছোট বোনের লেখায় ভাই>>>>>>>>>>>>>>>>
 
ছোটবেলা থেকে আব্বুর সাথে এক ধরণের চাপা অভিমানের সম্পর্ক আমার। কারণ আমাদের ২ ভাই বোনের মধ্যে, ভাইয়ার দিকে টান মারাত্মক রকম বেশি আব্বুর। আমি রাগ করে অনেকবার বলেছি "ভাইয়াই তো তোমার সব, আমি তো ঢেউটিন"! ছোটবেলা থেকে মারাত্মক দুরন্ত আমার এই ভাইয়াকে সবচেয়ে বেশি শাসন করেছে আব্বু আবার এই ভাইয়া বলতেই আব্বু মোটামুটি অন্ধ। ভাইয়া যদি বলে আজকে সূর্য পশ্চিমদিকে উঠেছে, আব্বু টেবিল চাপড়ে বলবে "অবশ্যই সূর্য আজকে পশ্চিমদিকে উঠেছে"। আব্বু কিছুটা বদমেজাজি ধরণের। একমাত্র ভাইয়ারই পারে থাকে কোনো কথা বুঝতে বা ঠান্ডা করতে। বাপ-বেটার এমন কেমিস্ট্রি দেখে আমি র আম্মু সবসময় হাসতাম। সেই বাবার ছেলেটার আজকে ৩ দিন ধরে কোনো খোঁজ নাই। ষাটোর্ধো সেই বাবার কি অবস্থা হতে পারে সেটা কি কেউ কল্পনা করতে পারেন আপনারা?

বাইরে ও একজন একাডেমিক, রিসার্চার, জার্নালিস্ট বা কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট হতে পারে, বাসায় সে শুধুই সিজার। ঘরে ঢুকে জুতা একদিকে, মোজা আরেকদিকে, ব্যাগ সোফায়, বেল্ট মেঝেতে রেখে ঘরে ঢুকে যাবে। আম্মু খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে বলবে যে "তুমি খাওয়ায় খাওয়ায় আমাকে আরো মোটা বানাচ্ছ, আমি খাবো না"। ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ঘুরেফিরে এসে বলবে "আম্মু কি খাবো?"। হটাৎ হটাৎ ওর মাথায় ডায়েটিংয়ের ভূত ঢুকে। তখনও আম্মু খাওয়ার কথা বললে বলে যে "দেখতেসো না আমি ডায়েট কন্ট্রোল করতেসি?" । কিন্তু আবার দেখা যাবে কিছুক্ষন পর খাওয়া খুজতেসে। ছুটির দিনগুলিতে বাসায় থাকলে খামাখাই চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করবে। হটাৎ করে একটা হাক দিবে বিরাট করে " আব্বাআআআআআ" । আব্বু তাড়াহুড়া করে দৌড়ে আসলে সুন্দর করে একটা হাসি দিবে । আম্মুর সাথেও একই কাজ করবে আর আম্মু কিল মারার জন্যে হাত তুল্লে হেসে দিবে।

আমি হচ্ছি ওর গিনিপিগ। সবকিছু আমাকে দিয়ে টেস্ট করতে হবে। ছোটবেলা থেকে ওর কোনো গান বা মুভি ভালো লাগলে সেটা আমাকেও দেখতে হবে। কিছুদিন আগে নেটফ্লিক্স কিনেছে ও। সেখানে আমি জানার আগেই আমার জন্যে প্রোফাইল আছে। ওর মেট্রিকের রেসাল্টের প্রাইজ ছিল বাইসাইকেল। সেটাতেও আমাকে নিয়ে উঠতে হবে। আমি ব্যালান্স রাখতে না পেরে পাথুরে মাঠে পরে গিয়ে হাঠু বাজেভাবে ছিলে ফেলেছিলাম। কলোনির বাসার লম্বা করিডোরে আমরা ক্রিকেট খেলতাম আর বিছানায় রেসলিং করতাম। যে খাট থেকে পরে যাবে সে হারবে। আমি সবসময় জিততাম। কারণ আমি পরে গেলে তো ব্যাথা পাবো! অনেকআগে আমার এক কাজিন ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল "তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড কে?" ভাইয়া আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিলো। ভাইয়ার খুব ইচ্ছা ছিল আমি আই বি এ তে পরব কিন্তু আমি জানতাম আমাকে দিয়ে হবেনা সেটা। তবুও শুধু ওর মন রাখার জন্যে এডমিশন টেস্ট দিয়েছিলাম। "ঘ" ইউনিটের পরীক্ষা দিয়েও আমার মনে হয়েছিল যে আমার চান্স পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। ভাইয়া তখন UK তে। রেসাল্টের দিন ভোর ৪টায় ফোন দিয়ে বলে যে "এই তুমি তো চান্স পাইস"। ওর সাথে মতভেদ আমার চরম ছিল। কিন্তু কোনো ব্যাপারে কনফিউসড থাকলে ওর কাছেই যাই আমি। বিশেষ করে আমার প্রফেশনাল লাইফের বেশিরভাগ ডিসিশনই ওর সাথে কনসাল্ট করে নেয়া। কখনো কোনো কিছু হলে মাথায় সবার আগে আসতো, ভাইয়া ম্যানেজ করে ফেলবে। ওর অনুপস্থিতিতে এখন নিজেকে কেমন যেন ডিফেন্সলেস মনে হচ্ছে।

যে মানুষটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খুঁতখুঁত করতো, খাওয়া নিয়ে বিলাসিতা করতো, সে কোথায় আছে, কেমন আছে আমরা জানি না। কিছু মুখে দিতে গেলে মনে হয় আমার ভাই টা কি খাচ্ছে, নরম বিছানায় শুতে গেলে মনে হয় ও কি আদৌ ঘুমাতে পারছে। আব্বু আম্মু চুপচাপ একটু পর পর একেকটা রুম ঘুরে বেড়ায়। তাদের কোনো লজিক কাজ করে না। কারণ ছাড়াই একটু পরপর রেগে যান। যে মানুষ ২টা এতগুলা বছর দাপটের সাথে সরকাররের উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন, তারা এখন একেবারেই হতাশ।

একটা পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্য একটা পিলারের মতো। আমাদের এখন একটা খুঁটি নাই। সবচেয়ে মজবুত খুঁটিটাই নাই। যে খুঁটিটা বাসাটাকে হাসিখুশি রাখতো সেই খুঁটিটাই নাই। এই খুঁটিটাকে যে খুব দরকার আমাদের। আব্বু আম্মু সবাই ওকেই বেশি আদর করুক, আমার কিচ্ছু লাগবে না, শুধু ও সুস্থভাবে বাসায় আসুক। যেভাবেই হোক আমার ভাইটা বাসায় আসুক। আমার বাবার একমাত্র সম্বল, আমার মায়ের বুকের ধন ফেরত আসুক আমি এই জীবনে আর কিছু চাইব না।

#BringBackMubashar
 
 


ঢাকা, ১৪ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।