সাংগঠনিক অস্থিরতায় পূর্ণ হলো ছাত্রলীগের দুই বছর


Published: 2020-08-01 01:25:14 BdST, Updated: 2020-08-15 10:23:57 BdST

মিজানুর রহমান, ঢাবি: সাংগঠনিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পূর্ণ হলো ছাত্রলীগের দুই বছর। নানান ঝক্কি ঝামেলা পার করতে হয়েছে এই সংগঠনকে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সাংগঠনিক অস্থিরতার মধ্যদিয়ে আজ ৩১ জুলাই দায়িত্ব গ্রহনের দুইবছর মেয়াদ পূর্ণ করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাবে ছাত্রলীগের কমিটির দায়িত্ব গ্রহনের দুই বছর পূর্ণ হলেও এখনো সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা লক্ষ করা যায় নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের শাখা কমিটি গঠনে সদিচ্ছা ও সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাব তীব্র। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের হস্তক্ষেপ, দীর্ঘদিনের গ্রুপিং মেয়াদোত্তীর্ণ শাখাগুলোতে কমিটি দিতে না পারার প্রধান কারণ। তবে সাবেক নেতাদের কয়েকজন বলেন, তাদের সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারা যদি অযাচিত হস্তক্ষেপের চেষ্টা করতেন, তখন তারা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহায়তা নিতেন। অনেক সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে পরামর্শ করে কমিটি দিতেন তারা।

এদিকে ছাত্রলীগের মোট ১১১ টি সাংগঠনিক ইউনিটের ১০৬ টি তে এখনো কমিটি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। দায়িত্ব গ্রহনের ১০ মাস পর প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রদান, ত্যাগীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতের নিয়ে কমিটি প্রদান, পদ বঞ্চিতদের মাসব্যাপী আন্দোলন, চাঁদাবাজির অভিযোগে সভাপতি- সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যহতি, শূন্য পদ পূর্ণ্য না করা ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সাংগঠনিক দায়িত্ব বুঝিয়ে না দেওয়াসহ নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দুই বছর অতিবাহিত হয়েছে।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ১১ এর 'খ'তে বলা আছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মেয়াদ দুই বছর। মেয়াদ পূর্ণ হবার পর নতুন সম্মেলন আয়োজন করতে হবে। অন্যতায় নির্বাহী সংসদের কার্যকারিতা থাকবে না। তবে জরুরী মুহূর্তে তিন মাস মেয়াদ বর্ধিত করার নিয়ম আছে। তবে বর্তমান কমিটি সংগঠনের মৌলিক কাজ এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে নতুন সম্মেলনের কোন তোড়জোড় নেই। একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছে সাংগঠনিক তৎপরতা।

সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হবে কি না জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক আসিফ তালুকদার ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গঠনতন্ত্র অনুয়ায়ী চলবে সেটা ঠিক আছে কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা আমাদের চূড়ান্ত সংবিধান। তিনি বর্তমান কমিটি দিয়েছেন এই কমিটি কতদিন দায়িত্ব পালন করবে সেটা তাঁর ইচ্ছে। এখানে আমাদের মন্তব্য অপ্রয়োজনীয়।

নেতাকর্মীরা বলছেন, কমিটি গঠনে বিলম্বের ফলে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা রাজনীতি করেন তাদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত বা নিুমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। যদি নিয়মিত কমিটি হয় সেক্ষেত্রে পদ না পেলে তারা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার সুযোগ পান। কিন্তু অনিয়মিত কমিটি হলে পদ না পেলে একদিকে পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে ছাত্রলীগের বেঁধে দেয়া ২৯ বছর বয়সের সময়সীমার কারণে পরবর্তী কমিটিতে রাজনীতি করারও আর সুযোগ থাকে না। হারিয়ে যায় সরকারি চাকরিতে যোগদানের বয়স। এতে করে পদ ছাড়া ছাত্র রাজনীতি শেষ করতে হয়। ফলে লবিং-তদবিরের পরিবর্তে যোগ্য ও মেধাবীদের দিয়ে নিয়মিত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা। স্থানীয় পর্যায়ে কমিটিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিও রয়েছে তাদের।

শোভন-রাব্বানির পদত্যাগ:

২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং একই বছরের ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি চূড়ান্ত করেন।তবে ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কিন্তু, ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক প্রায় এক বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি না দিলে কমিটি ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলে ২০১৯ সালের ১৩ মে ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগ। তবে অর্থের বিনিময়ে মূল্যায়ন, শিবির কর্মীদের কমিটিতে অনুপ্রবেশ ও ত্যাগীদের অবমূল্যায়নের বিস্তর অভিযোগ তুলে ছাত্রলীগের পদ প্রত্যাশীদের একাংশ এই কমিটির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে মাসব্যাপি আন্দোলন ও অনশন কর্মসূচি পালন করেন।

এর পর কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, নিজেদের অনুষ্ঠানে মূল সংগঠনের নেতাদের আমন্ত্রণ করে যথা সময়ে না যাওয় তথা তাদের পরে অনুষ্ঠান স্থলে উপস্থিত হওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছায়। এসব অভিযোগে তিনি প্রকাশ্যে দলীয় সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই কমিটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই কোটি টাকা চাঁদাবাজির একটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় তাদের ওপর ব্যাপক ক্ষুব্ধ হন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। এসব ঘটনার জেরে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

জয়-লেখকের দায়িত্বগ্রহন :

২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক শেষে আল নাহিয়ান খান জয়কে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লেখক ভট্টাচার্যকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পর ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সেতু ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অনুরোধের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব তুলে দেন।

নেতৃত্বের পথ রুদ্ধ করে রাখা:

ছাত্রলীগের মোট ১১১ টি সাংগঠনিক ইউনিটের ১০৬ টি তে এখনো কমিটি দিতে পারেনি ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি। এই ১০৬ টি ইউনিট এখনো সোহাগ -জাকির প্যানেলের দেওয়া কমিটিতেই চলছে। ফলে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার দ্বার বন্ধ রাখায় হতাশ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ সাংগঠনিক অপতৎপরতার মুল কারণ এসব।

বিতর্কিতদের বহিষ্কার :

আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য দায়িত্বে আসার পর কমিটি থেকে বিতর্কিতসহ মোট ৩৫ জন কে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কারের সময় দ্রুত সময়ের মধ্যে যোগ্যদের দিয়ে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার ঘোষণা দিলেও এখনো শূণ্য পদগুলো পূরণ করা হয়নি। পদ বঞ্চিতদের দাবির প্রেক্ষিতে শূন্য পদসমূহ পূরণ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে পদ বঞ্চিতদের মুখপাত্র ও ছাত্রলীগের সাবেক কর্মসূচী ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, বিতর্কিতদের বহিষ্কারের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে যোগ্যদের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য আমরা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে বলেছি। তাছাড়া বর্তমান কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে দলকে ভালোবেসে দলের মঙ্গলের জন্য শূন্যপদ পূরণ করতে অনুরোধ করে আসলেও তারা এখনো পদগুলো পূরণ করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন নি। সেটা সত্যিই হতাশাজনক। তবে আশা করছি করোনাকাল চলে গেলে তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই কমিটির কাজ সম্পন্ন করবেন।

রাকিব হোসেন আরো বলেন, শোভন-রাব্বানী ছাত্রলীগের দায়িত্বগ্রহনের পর থেকে সংগঠনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছিল। সাংগঠনিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গিয়েছিলো। চেইনঅব কমান্ড ভেঙে গিয়েছিলো। সেখানে বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছেন।

অর্থের বিনিময়ে পদ :

১১১ টি সাংগঠনিক ইউনিটের ১০৬ টি তে এখনো কমিটি না দিলেও যে কয়েকটি কমিটি দেওয়া হয়েছে সেখানেও অর্থের বিনিময়ে পদায়নের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল। শোভন-রাব্বানীর পদত্যাগের পর কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অর্থের বিনিময়ে কমিটিতে পদ দেওয়ার অভিযোগ উঠে। এদিকে শোভন-রাব্বানীকে পদচ্যুত করা হলে তাদের মনোনীত কমিটি ভেঙে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গত ৩০ জুলাই হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলা কমিটিতে পদ দেওয়ার কথা বলে এক কর্মীর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে উপজেলার এক নেতার বিরুদ্ধে। এর প্রেক্ষিতে হবিগঞ্জ জেলার সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক আসিফ তালুকদার দুই বছরে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সফলতা সম্পর্কে ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, শোভন-রাব্বানীর কমিটিকে কেন্দ্র করে যে সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে সেই সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অব্যহতি দিয়ে জয়-লেখক কে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত ও পরে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা একদম নতুন। জয়-লেখক দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে করোনা মহামারি শুরু হলো ফলে তাদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সারাদেশে যেভাবে কাজ করছে সেটা সকলের কাছে প্রশংসনীয়। করোনা কাল চলে গেলে তাঁরা যখন সাংগঠনিক কাজ করতে পারবে তারপর মূল্যায়ন করা যাবে তাঁরা সাংগঠনিক কার্যক্রমে কতটুকু সফল। ১০৬ টি সাংগঠনিক ইউনিটে দুইবছরেও কমিটি দিতে না পারা সংগঠনের অদক্ষতা কি না জানতে চাইলে আসিফ তালুকদার বলেন, এটা আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চ্চার একটা অংশ বলা যেতে পারে।

বিভিন্ন স্থানে কমিটি না দিতে পারা সেটা এই বারে প্রথম তা না। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এবারের যে করোনা বাস্তবতা এর পরেই যখন সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল হবে তখন তাঁরা এই চর্চ্চা টা থেকে বের হয়ে এসে কতটুকু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে সেটা তখন দেখা যাবে। বিস্তারিত জানার জন্য সংগঠনের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য কে অসংখ্যবার কল ও মেসেজ দিলেও কোন সাড়া দেননি তারা।

ঢাকা, ৩১ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআর// বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।