আহা বিসিএস, আহারে বিসিএস!


Published: 2017-11-20 20:53:03 BdST, Updated: 2017-12-14 04:18:19 BdST

আকাশ কুমার কুন্ডু: গল্পগুলো এভাবেই থেকে যায়। চরিত্রগুলোও একই থাকে। এক থাকে না শুধু কুশীলবরা। একেক সময় একেক চরিত্রে মানিয়ে নিতে হয় তাদের।

এই পথে একেকজন একেকভাবে প্রভাবিত হয়ে আসে। কেউ আসে জেনে বুঝে, জীবনে বড় হওয়ার উচ্চাশা নিয়ে। কেউ আসে প্রেমিকার কাছে ছ্যাকা খেয়ে, তাকে দেখিয়ে দিতে একদিন সে কি ভুলই না করেছিল ছেড়ে গিয়ে। কেউ আসে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের জবাব দিতে। কেউ কেউ আসে বিলাসী জীবন(!),

ফাইল ছবি

 

সীমাহীন ক্ষমতা(!) আর সুখের সন্ধানে। যদিও ওরা আদৌ কখনো সুখ পায় কি না জানা যায় নি। আবার কেউ আসে প্রেমিকার অসহায় সরল স্বীকারোক্তি শুনে, তুমি একটু সিরিয়াস হও, একটু ভালো করে পড়ো। বাবা বলেছে ক্যাডার না হোক নিদেনপক্ষে ভালো সরকারী চাকুরে ছাড়া বিয়ে দিবে না।"

চরিত্রগুলোও অনেক বৈচিত্রময়। কিছু চরিত্র লড়াকু। কিছু চরিত্র আছে বিজয়ী। পরাজিত চরিত্রও আছে অনেক অনেক।

গ্রাজুয়েশন শেষ হল সেই কবে অথচ চাকরি নেই, পকেটে টাকা নেই। হাতে একটা টিউশানি ছিল বলে কোনোমতে চলে যায় বেকার ছেলেটার। পর পর তিনটা বিসিএস ভাইবা দিয়েছে। একটাতেও শিকে ছিড়ল না। 'থ্রি হান্ড্রেড' উপন্যাসের সেই স্পার্টাদের মত তাও সে হাল ছাড়ে নি। বিশ্ববিদ্যালয় হলের একটুকরো অর্ধসেদ্ধ বয়লার মুরগী আর হাত ধোয়া পানির মত ডাল খেয়েও সে দিনরাত পড়ার টেবিলে মাথা গুজে থাকে। আবারও একটা বিসিএসের সার্কুলার দিয়েছে যে।

আয়েশি জীবনে অভ্যস্ত ছেলেটি ভাবত একদিন কবি হবে। বড় চুল রেখেছিল, শ্মশ্রুমন্ডিড হয়ে ঘুরে বেড়াত ক্যাম্পাসের অলি-গলিতে। মাস্টার্স শেষেও তার ভাবাবেগ নেই। ইদানিং অবশ্য তার বাবার খুব চিন্তা তাকে নিয়ে, "অমুকের ছেলে বিসিএস ক্যাডার হল, তমুকের মেয়েটা এবার জাজ হল তুই এখনো কিছুই করতে পারলি না।" কবি কবি চেহারার ছেলেটিও আজকাল তাই নীলক্ষেত থেকে বুদ্ধদেব বসু কিংবা পেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার বই না কিনে বিসিএস গাইড কেনে। সামনে নাকি প্রিলিমিনারি পরীক্ষা।

যে ছেলেটির ফোনে কদাচিৎ কল আসত, আজ তার ফোনেই আসছিল একটার পর একটা কল । টেক্সট জমা হচ্ছিল ভুরি-ভুরি। অভিনন্দনের পর অভিনন্দন এসেছিল। আসবেই তো। সেবার বিসিএস রেজাল্টে সে ম্যাজিস্ট্রেট ( কিংবা এ এস পি বা সহকারী প্রকৌশলী কিংবা সহকারী সার্জন....) হয়েছিল যে। কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা দেশটা এবার সে পাল্টে দিবে। জীবনটাও এবার বোধ হয় পাল্টেই গেল।

এবার তাহলে সুখের অধ্যায় শুরু। এক বছরেরও বেশি হয়েছে তার চাকুরীর বয়স। ঘটনাবহুল ট্রেনিং শেষ হয়েছে। অফিসে একটা সাজানো গুছানো আলাদা কক্ষও পেয়েছে সে। তবে সেই কাঙ্ক্ষিত সুখের দেখা পেয়েছে কি না জানা যায় নি।

পরাজিত চরিত্রগুলোর কথা বললে কেউ কেউ আশাহত হবে নিশ্চিত। তাদের সংখ্যাও অনেক বেশি। কারো চাকুরীর বয়স শেষ। ৩০ পেরোলো এবার।সমাজে প্রচলিত অমোঘ ধারণানুসারে তার জীবনীশক্তি, মেধা সম্ভাবনা সবই শেষ। তাই আর সে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে কাধের ব্যাগ দিয়ে জায়গা রাখে না। কোম্পানিতে এবার একটা চাকুরি জুটলেই বেচে যায়।

কেউ কেউ বারংবার চেষ্টা করেছে, প্রতিবারই হেরে গিয়েছে। টিএসসিতে বন্ধুদের আড্ডায় মধ্যমণি হয়ে জমিয়ে রাখা সে ইদানিং সে কারো বেশি কথা বলে না। একা একা দেশ, জাতি-সমাজ নিয়ে কথা বলে। বন্ধুদের ভাষায় সে মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলেছে।

এভাবেই একটার পর একটা বিসিএস সার্কুলার হয়। এভাবেই ওরা পঙ্গপালের মত ঝাপিয়ে পড়ে গাইড বই আর রেফারেন্স বইয়ের অথৈ সাগরে। একটার পর একটা ব্যাচ ক্যাডার হয়। কেউ কেউ না পেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। কেউ অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব মিলায়।

কেউ ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে ভোর পাচটায় পাগলা ঘণ্টা শুনে যন্ত্রের মত হাটে, বিশিষ্ট গেস্ট স্পিকারের ক্লাসে নাক ডেকে ঘুমায়। কেউ অক্লান্ত শ্রম দিয়ে দায়িত্ব পালন করে যায়। আবার হয়ত কাঙ্ক্ষিত প্রমোশন, পোস্টিং না পেয়ে হতাশ হয়। কেউ তদবির করে। কেউ সততার যষ্টি আঁকড়ে ধরে থাকে।

বিসিএস যেন বহমান পদ্মা নদীর ই একটি স্রোতধারা। বয়ে চলে। কেউ কেউ স্রোতে ভেসে যায়। কেউ খুজে পায় তীরদেশ।

লেখক:
আকাশ কুমার কুন্ডু
সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
৩৫ তম বিসিএস (প্রশাসন)
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জামালপুর।

পড়াশোনা:
সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং,
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


ঢাকা, ২০ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।