পাটকল ধ্বংস: পর্দার আড়ালে কি?


Published: 2021-01-07 20:59:51 BdST, Updated: 2021-04-17 05:34:33 BdST

সজীব ওয়াফিঃ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এগিয়ে নিতে পাটকল শ্রমিকদের লড়াই অনেক। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতীকও এই পাট এবং পাটশিল্প। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার পাটকল চোখের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গেল ক্রমে ক্রমে। অথচ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ছিলো পটশিল্প কে বেসরকারিকরণ বন্ধ ও লাভজনক করার কথা। যার কারণে ২০০৯ সালে বন্ধ দুই পাটকল চালু এবং বেসরকারিকরণ তিনটি পাটকল ফিরিয়েও আনে পরবর্তীতে। কিন্তু লোকসানের অজুহাতে এবার একসাথে বন্ধ করা হল ২৫ টি পাটকল।

দেশের বেশিরভাগ পাটকল নারায়ণগঞ্জ, খুলনা এবং চট্টগ্রামে। স্বাধীনতা আন্দোলনে পাটকল শ্রমিকেরা ব্যাপক অংশগ্রহণ করছেন; এমন কোন কর্মসূচি নাই যেখানে পাট শ্রমিকদের উপর নির্ভর করতে হয়নি। পাটকল কলোনি থেকেই বেরিয়ে এসেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কিছু ছাত্রও। সেই পাটকল বাঁচাতে কিছুদিন আগে দু'জন শ্রমিক মারা গেলেন অনশনরত অবস্থায়। আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো দ্রুত খুলে দেয়া হবে।

৬ মাস ধরে পাটকলগুলো বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ। চাকরিচ্যুত হয়েছে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী এবং প্রায় ২৬ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক। বকেয়া পাওনা না দিয়েই খুলনার খালিশপুর সহ দেশের বিভিন্ন মিল গুলোতে হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। যেখানে শ্রম আইনের ৩২ ধারায় উল্লেখই আছে- পাওনা পরিশোধ না করে কোনভাবেই শ্রমিক কে তার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না, সেখানে সরকার নিজেই আইনের তোয়াক্কা করলো না!

স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রপতির এক আদেশে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকলসহ সাবেক ইষ্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন(EPIDC) এর ৬৭ টি পাটকল নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন(বিজেএমসি)। ১৯৮১ তে বেড়ে হয় ৮২ টি পাটকলে।

সামরিক স্বৈরশাসক ৩৫ টি পাটকল বেসরকারিতে ছেড়ে দেয়, ৮ মিলের পুঁজি প্রত্যাহার এবং বনানী পাটকল ময়মনসিংহ পাটকলের সাথে একীভূত করে। বিশ্বব্যাংকের পাট খাত সংস্কারের আওতায় ১৯৯০ সালের পর ১১ টি পাটকল বন্ধ, বিক্রি এবং একীভূত করা হয়। খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে ২০০২ সালের জুনে বন্ধ করা হয় পৃথিবীর বৃহত্তম আদমজী জুট মিল। ২০২০ সালে এসে ২৬ টি পাটকলের ২৫ টি চালু ছিলো; এরমধ্যে ২২ টি পাটকল এবং ৩ টি নন-জুট কারখানা।

বিজেএমসি'র বিগত দশ বছরের লোকসান ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা এবং পুঞ্জীভূত লোকসান ১০ হাজার কোটি টাকা প্রায়। ৪৮ বছরের ভিতরে ৪৪ বছর লোকসান হওয়ায় সরকার পাটকল সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। লোকসানের সমস্ত দায় দেয়া হয়েছে শ্রমিকদের উপর। অথচ পাটকল লোকসানের অন্যতম কারণ সঠিক সময়ে পাট মন্ত্রণালয় থেকে কাঁচা পাট কেনার বরাদ্দ না পাওয়া।

তখন বেসরকারি মালিকেরা কম দামে পাট কিনে গুদামজাত করে। মৌসুম চলে গেলে তাদের কাছ থেকে ইচ্ছাকৃত বেশি দামে বালু ও পানি দিয়ে ওজন বাড়ানো শত শত বেল নিম্ন মানের পঁচা পাট কেনে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন। যে পাট কলের ভিতরে প্রবেশ করলেই ধূলো হয়ে যায়। বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সাথে প্রকল্প প্রধান থেকে শুরু করে জুট ম্যানেজার, জুট হেড, পাট চেজার ও পাট সাপ্লাইয়ারের মত একটা বড় অংশও দুর্নীতিতে জড়িত। দুর্নীতির কারণে খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবছর লোকসানও বেড়েছে লাগামহীন।

আমাদের পাটকল গুলোর যন্ত্রপাতি ৪৯-৬৭ সালের পুরোনো। যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দুই থেকে তিনগুণ বেশি দেখানো হয়েছে সব সময়; কাগজে কলমে থাকলেও কখনো আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফলে উৎপাদন ক্ষমতা ৪০-৪৫ ভাগ কমে যায়। সে কারণে এক টন উৎপাদন করতে বেসরকারি মিলে যেখানে ২৫-২৮ জন শ্রমিক লাগে, সেখানে সরকারি মিলে প্রয়োজন হয় ৬৫-৭০ জন শ্রমিক। পাট ক্রয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অব্যবস্থাপনা, কাগুজে উৎপাদন-বিপণয়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, অনভিজ্ঞ আমলাদের দিয়ে বিজেএমসি পরিচালনাও পাটকল ধ্বংসে কম দায়ী নয়।

পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের(পিপিপি) আওতায় বেসরকারিকরণে পাট শিল্পের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বাড়বে বলা হলেও বাস্তবতা ঠিক বিপরীতে। বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি খাতে দেয়ার অর্ধেক বেসরকারি কারখানা আর চালানো সম্ভব হয়নি। বরঞ্চ সস্তায় জমি ও যন্ত্রপাতি লুট হয়ে গেছে, পরিত্যক্ত জমি দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ব্যাংকঋণ হাতিয়ে নিয়েছে ব্যক্তিমালিকেরা। এবারে ৫০ হাজার পাট শ্রমিকের ভাগ্যেও দুর্দশার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে।

বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হলে শ্রমিকেরা আবাসিক সুবিধা পাবেন না। বর্তমান বেসরকারি মিলগুলোর মত অল্প মজুরি পাবেন। সিপিডি'র এক গবেষণায় উঠে এসেছে 'একজন শ্রমিকের মাসিক খরচ মেটাতে নূন্যতম ১৭ হাজার ৮৩৭ টাকা প্রয়োজন।' অথচ আমাদের সরকারি মিলে কাজ করে প্রায় ১৫ হাজার টাকা মজুরি ওঠাতে পারেন। বেসরকারিকরণে তখন এর চেয়েও কম কম মজুরিতে শ্রমিকেরা বাধ্য হবেন মানবেতর জীবনযাপনে।

গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের নামে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ না দিয়ে, ১০০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকা দিয়ে পাটকল আধুনিকায়ন করা হলে উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণে বেড়ে যেত। ফলাফলে স্থায়ী ব্যয় ইউনিট প্রতি কমে গিয়ে উৎপাদিত পণ্যের দামও কম পরতো। বছরের পর বছর একেই পণ্য উৎপাদন না করে আনা যেত নতুন নতুন বৈচিত্র্য। ব্যবস্থা করা যেত দক্ষ স্পিনার ও তাঁতি তৈরীতে প্রশিক্ষণের। সুতরাং এটা অর্থের সংকট কোন মতেই নয়। বরং সদিচ্ছার অভাব।

পাটের অভাবে কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পাটকলগুলির করুণ দশা। বাংলাদেশের মত উন্নতমানের পাট নেই তাদের, দামও চড়া। পাটের উৎপাদন কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে পশ্চিমবঙ্গে পাটকল বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী যোগানের ঘাটতি ছিলো সবসময়। বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাট দিয়েই উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায় তাদের। তাহলে কি দেশের শ্রমিকদের পেটে লাথি মেরে, বাংলাদেশের পাটশিল্প ধ্বংস করে, পশ্চিমবঙ্গের পাটশিল্প সম্প্রসারণ করতেই আমাদের পাটের বাজার ভারতের হাতে তুলে দিতে এই সাজানো লাভলোকসান চোর-পুলিশ খেলা?

গ্রাম বাংলার বৃহত্তর ফরিদপুর জুড়ে সবচেয়ে বেশি পাট চাষ হয়। পাট চাষীরা ভবিষ্যতে ভারতে পাট রপ্তানি নির্ভরশীল হলে বেসরকারি পাটকল ও রপ্তানিকারকদের জন্য পাটের বাজার চলে যাবে সিন্ডিকেটের দখলে। ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবে পাট চাষী। অনিশ্চয়তায় পরবে সোনালী আঁশের অর্থনীতি। যেখানে করোনার সময়েও পাট ও পাটজাত পন্য রপ্তানিতে তুলনামূলক বৈদিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ বেড়েছে। বেসরকারিকরণে টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইচ্ছেমতো পাট পণ্যের দাম বাড়াতে দ্বিধা করবে না। যদি সত্যিই পাটশিল্পের উন্নয়নে সরকার মরিয়া হয়ে থাকে তবে কেন শ্রমিকদের অনশনে-আন্দোলনে কোন সহানুভূতি আসলো না! পাটকল চালু করতে শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলনে টিয়ারসেল মেরে কিসের উন্নয়ন হচ্ছে? শ্রমিক নেতাদের নামে কেন মামলা দেয়া হল? কেন হয়রানি করা হচ্ছে!

শ্রমিকের পাওনা পরিশোধের কথা বলা হলেও, মিল বন্ধের ছ'মাস পরে এসেও স্থায়ী শ্রমিকদের একাংশ পাওনার অর্ধেক পেয়েছে। একচতুর্থাংশ এখনো টাকা পাননি। তারা জানেও না টাকা পাবেন কিনা! অস্থায়ী শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে দেয়া হয়নি কোন আশ্বাসবাণী। পাটের জীবন রহস্য, পাটের পলিব্যাগ আবিস্কার ঘটিয়ে অর্থনীতি সামনের দিকে আগানোর সময়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হল না! এটা কি দুর্নীতি কে উৎসাহ দিয়ে শ্রমিক কে শাস্তি দেয়া নয়? ইচ্ছে হলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা নতুন নতুন পাটকল স্থাপন করতে পারেন। জনগণের কষ্টের ট্যাক্সের পয়সায় গড়ে ওঠা পাটকল কেন তাদের হাতে তুলে দিতে হবে? কার স্বার্থে?

পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে শুধুমাত্র পাট শ্রমিকেরাই বিপদগ্রস্ত হবেন এমনটা না। পটকল কেন্দ্র করে চলে ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন, মুদি দোকান, ভাতের হোটেল, আসবাবপত্র-কাপরের দোকান। পাটকল নির্ভর একটা জনপদের পুরো অর্থনীতি। ছ'মাস ধরে বন্ধ করে দেয়ায় ইতোমধ্যে প্রান্তিক এই মানুষেরা হুমকির মুখেও পরেছেন। সুতরাং বাধ্য হয়ে বলতে হয় এই সরকার শ্রমিকের না। এই সরকার লুটেরা ব্যবসায়ীর, পুঁজিপতিদের, বিদেশি প্রভুর। বিদেশি প্রভুর থেকে আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এখন সময়ের দাবি। কাজ করতে শ্রমিকেরা তর্জনী হারিয়েছে, তবু স্বপ্নের পাটকল ছাড়েনি। কৃষক শ্রমিক রক্ষায় সকলের বোধদয় হোক।

সজীব ওয়াফি
রাজনৈতিক কর্মী ও বিশ্লেষক

ঢাকা, ০৭ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//আরআর//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।